বঙ্গোপসাগর অঞ্চল ঘিরে ভারত, চীন ও মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পরবিরোধী স্বার্থ রয়েছে। প্রথমেই কার কী স্বার্থ রয়েছে, তা জানা জরুরি।
প্রথমেই চীনের কথায় আসা যাক। চায়না পাওয়ারের তথ্য মতে, চীন তার সামগ্রিক বাণিজ্যের ৬০ শতাংশ সম্পন্ন করে থাকে মালাক্কা প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগর দিয়ে। আর তার জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে এই রুট দিয়ে। সম্প্রতি গত কয়েক বছরে এই রুটে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে প্রায়ই দ্বন্দ্ব হচ্ছে। সুতরাং চীন তার বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তার জন্য একটি বিকল্প রুটের প্রয়োজন।
সেই জন্য চায়না তার BRI (Belt and Road Initiative) ও CMEC (China Myanmar Economic Corridor) প্রকল্পের আওতায় বঙ্গোপসাগর উপকূলে Kyaukphyu deep-sea port এবং the Shwe gas pipeline স্থাপনের কাজ করছে, যেটা চীনকে দক্ষিণ চীন সাগর ও মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প দেবে।
এইবার আসা যাক ভারতের কথায়। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য, যা সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত, সেটা মূল ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রয়েছে। এবং সেখানে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত সরু একটি পথ হচ্ছে, যা শিলিগুড়ি পয়েন্ট, যা চিকেন নেক নামে পরিচিত। চিকেন নেকের এক পাশে রয়েছে ভারতের শত্রু চীন। অপর পাশে রয়েছে শত্রুভাবাপন্ন বাংলাদেশ। এখানে কোনো ধরনের গোলযোগ ভারতের অখণ্ডতার জন্য ব্যাপক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
কাজেই ভারত বহু আগে থেকেই বিকল্প রুটের সন্ধান করছে। তারই একটি রুট হচ্ছে Kolkata Port হয়ে বঙ্গোপসাগরের উপকণ্ঠে অরাকানের Setway Port, সেখান হতে Kaladan নদী হয়ে মিজোরামে পৌঁছানো। তার জন্য ভারত সরকারের একটি প্রকল্প Kaladan Multi-Modal Transit Transport Project (KMTTP), যা ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয়ে এই প্রকল্প এখন শেষের দিকে। এর ফলে ভারত এই প্রকল্পের মাধ্যমে তার সেভেন সিস্টার্সে বিভিন্ন বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং চায়নার প্রভাবও মোকাবেলা করতে পারবে।
আমেরিকা কী চায়?
এই অঞ্চলে আমেরিকা মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থীদের ক্ষমতায় আনতে বেপরোয়া। এ জন্য জান্তা সরকারকে আমেরিকা বিভিন্ন ধরনের অবরোধ দিয়ে রেখেছে। তবে সর্বশেষে মিয়ানমারে ২০২১ সাল হতে চলা গৃহযুদ্ধে, যার একপক্ষে গণতন্ত্রপন্থীরা আর অপর পক্ষে রয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার, চলমান এই যুদ্ধে কার্যত জান্তা সরকার পর্যুদস্ত। এই সুযোগে আমেরিকা বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ করে চলেছে।
আমেরিকা কী চায়? এই বিষয়ে অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান বলেন, আমেরিকা এখানে স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র চায়। যাতে এই অঞ্চলে আমেরিকার একটি শক্ত প্রেজেন্স নিশ্চিত করা যায়।
সে কেন তার প্রেজেন্স নিশ্চিত করতে চায়, এ ব্যাপারে বর্তমান সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদুর রহমান বলেছিলেন, আমেরিকা এখানে আসতে চায় মূলত কনটেইনিং চায়না। তাছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত National Security Strategy-2025-এ বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনকে তার অঞ্চলে আবদ্ধ করে রাখতে চায়।
এখন যদি আরাকান স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়, তখন ভারত ও আমেরিকা উভয়েই চায়নাকে কনটেইন করতে পারবে, যেটা তাদের কমন উদ্দেশ্য।
তার মানে আমরা বঙ্গোপসাগর উপকণ্ঠে চীন-মিয়ানমার ও যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের একটি বিপরীতমুখী অবস্থান দেখতে পাচ্ছি।
আপনারা জানেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আরাকানে মানবিক করিডোর দেওয়ার ব্যাপারে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন অনেকেই বলেছিল, এর উদ্দেশ্য হলো আরাকান স্বাধীন করা। অনেকেই ইসলামিক আরাকানের কথা বলেছিল। তখন মিয়ানমার জান্তা সরকার এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল এবং তারা একে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে দেখেছিল। তার মানে আমরা কিছু বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। এখন এই অবস্থায় যেকোনো পক্ষের জন্য অবস্থান নিলে তা আমাদের ঝুঁকি বাড়াবে।
মো. জোবায়ের হোসেন
শিক্ষক
নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ, ঢাকা।

