বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে লেখা আছে, রাষ্ট্র গণিকাবৃত্তি ও জুয়া রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। এই কথা পড়লে মনে হয়, দেশে এই পেশার কোনো জায়গা নেই। অনেকে সেভাবেই বোঝেন। সমাজে যৌনকর্মীদের দিকে তাকানোর দৃষ্টিও সেই বোঝাপড়া থেকে আসে।
তবে অনুচ্ছেদটি সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে আছে। এই ভাগের নীতিগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। ৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এগুলো আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায় না। অর্থাৎ এটি রাষ্ট্রের জন্য নির্দেশনা, কোনো নাগরিকের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নয়। এই পার্থক্য অনেকের চোখ এড়িয়ে যায়।
বাস্তবে আরেক ছবি
এবার আইনের দিকে তাকানো যাক। দেশে পতিতাপল্লি আছে এবং সেখানে নারীরা কাজ করছেন। প্রাপ্তবয়স্ক নারী ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিকের সামনে হলফনামা দিয়ে এই পেশায় আসার ঘোষণা দিতে পারেন। ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এই পেশায় আসার ঘোষণা দিতে পারেন। আরেকটি সূত্র বলছে, হলফনামা পেলে পেশাটি চালানো আইনসম্মত বলে ধরা হয়।
কোনো কোনো সূত্র একে আধা বৈধ ব্যবস্থা বলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, নিবন্ধিত হওয়ার পর নারী পল্লিতে কাজ শুরু করতে পারেন। সরকারি ব্যবস্থার কিছু জায়গাও এই বাস্তবতা মেনে চলে। ফরিদপুরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যৌনকর্মীদের সন্তানের জন্মনিবন্ধন ডিজিটালভাবে হচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র তাদের অস্তিত্ব মেনে নিয়েই কাজ করছে।
দুই কথার সংঘাত
এখানেই সমস্যার গোড়া। সংবিধান বলছে প্রতিরোধ করো। হলফনামার ব্যবস্থা বলছে কাজ করার সুযোগ আছে। এক হাতে নিষেধের সুর, অন্য হাতে অনুমতির কাগজ। এই দুইয়ের মাঝখানে যে নারী দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি জানেন না কোন কথাটি তার জন্য সত্য।
এই দোটানার দাম দিতে হয় নারীকেই। অস্পষ্ট আইনের সুযোগে উচ্ছেদ হয়, হয়রানি হয়, অবৈধ আদায় চলে। নিবন্ধন থাকলেও পল্লি থেকে বেআইনি উচ্ছেদের ঝুঁকি থেকে যায়, বলছে একটি প্রতিবেদন। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকই বলেছেন, পেশাটি আইনি না বেআইনি, তা তিনি নিশ্চিত নন। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও যখন নিশ্চিত নন, তখন সাধারণ নারী কীভাবে নিজের অধিকার চাইবেন?
আদালত যা বলেছে
এই প্রশ্ন আদালতেও উঠেছিল। ১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার ও নিমতলী থেকে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করা হয়। ২০০০ সালের ১৪ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী আদালত তাদের ভবঘুরে আবাসনে আটক রাখা বেআইনি বলেছে এবং জীবন, জীবিকা ও চলাফেরার অধিকার স্বীকার করেছে। রায়টি ৫৩ ডিএলআর (২০০১) এ প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু আদালত উচ্ছেদ ও আটকের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছে। পেশাটির জন্য পূর্ণাঙ্গ আইন দেওয়া আদালতের কাজ নয়। সেই কাজ সংসদের। রায়ের পঁচিশ বছর পরেও আইনের ফাঁক আগের মতোই খোলা। আদালত দরজায় আলো ফেলেছে, কিন্তু ঘরের ভেতর আলো জ্বালানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
কেন একটি শক্ত আইন দরকার
প্রথমে এই কাজকে একটি পেশা হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। এই ফাঁক ভরাতে একটি আলাদা ও শক্ত আইন দরকার। আজ আমরা পুরোনো আইন, আদালতের রায় আর প্রশাসনের রীতি জোড়া দিয়ে কাজ চালাচ্ছি। কোথাও নিষেধ আছে, কোথাও সুরক্ষা আছে, কোথাও কোনো কথাই নেই। এভাবে একটি পুরো সম্প্রদায়ের জীবন চলতে পারে না।
নতুন আইনে পেশার স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকতে হবে। নুন্যতম মজুরির কথা থাকতে হবে। কাজের জায়গার নিবন্ধন, মালিকের দায়, নারীর অধিকার এবং অভিযোগ জানানোর পথ, সবই লিখিত থাকতে হবে। হলফনামার মতো অলিখিত রীতির ওপর ভরসা করলে আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। আইন লিখিত হলে উচ্ছেদ করা কঠিন হবে। আইন লিখিত হলে অন্যায় করলে জবাবদিহিও করতে হবে।
আইন পেশাটিকে স্বীকৃতি দিলে মজুরির প্রশ্ন আসবেই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ইচ্ছায় এই কাজ করলে সেটি তার শ্রম। অন্য সব শ্রমিকের মতো তিনিও ন্যায্য পাওনা পাবেন, এটাই স্বাভাবিক দাবি। আজ অনেক নারীর আয়ের বড় অংশ চলে যায় মালিক বা সর্দারনির পকেটে। যা থাকে, তা দিয়ে সংসার চলে না।
তাই আইনে ন্যূনতম মজুরি বা নিশ্চিত পাওনার একটি ব্যবস্থা থাকতে হবে। মালিক কত কেটে নিতে পারবেন, তার সীমা ঠিক করে দিতে হবে। মজুরির সঙ্গে থাকবে সাপ্তাহিক ছুটি, নিরাপদ কাজের জায়গা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা। কোনো নারী কাজ করতে না চাইলে ফিরিয়ে দেওয়ার অধিকারও আইনে লিখতে হবে। এই অধিকার ছাড়া মজুরির কথা কাগজেই থাকে।
১৮ বছরের নিচে কেউ নয়
এই আইনের সবচেয়ে অনড় শর্ত হবে বয়স। ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ে এই পেশায় থাকতে পারবে না। সে রাজি হোক বা না হোক, কোনো ব্যতিক্রম চলবে না। একটি শিশু কখনো পুরোপুরি বুঝে সম্মতি দিতে পারে না। যে মেয়ে বলে সে নিজের ইচ্ছায় এসেছে, সে অনেক সময় দারিদ্র্য, ভয় বা প্রতারণার শিকার।
আইন আগেই এই দিকে কিছুটা এগিয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় ১৮ বছরের নিচের মেয়েকে পতিতাবৃত্তির জন্য কেনাবেচা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নতুন আইনে এই নিষেধ আরও শক্ত করতে হবে। দালাল, মালিক ও ক্রেতা, সবাই সমান দায়ী হবেন। হলফনামার সঙ্গে জন্মনিবন্ধন বা সরকারি নথি দিয়ে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর উদ্ধার হওয়া শিশুকে অপরাধী নয়, ভুক্তভোগী হিসেবে দেখতে হবে।
সুরক্ষার আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়
অনেকে বলবেন, সুরক্ষার আইন তো আছেই। কথাটি ঠিক। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে জোর করে যৌনকাজে নামানো অপরাধ। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ পাচারকারীদের শাস্তি দিতে চায়। সমস্যা আইনের সংখ্যায় নয়। সমস্যা হলো, এই আইন মাঠে কাজ করে না।
যে নারী নির্যাতনের শিকার হন, তিনি মামলা করতে সাহস পান না তার পরিচয়ের জন্য। মামলা করতে গেলে তার পেশাই তাকে লজ্জায় ফেলে। থানায় অনেক সময় অভিযোগ নেওয়া হয় না। তদন্ত ঢিলে হয়। সাক্ষী ভয়ে সরে যায়। সাজা কম হলে অপরাধীর ভয়ও কমে। তাই নতুন আইনে অভিযোগ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা, দ্রুত তদন্ত এবং সাক্ষী সুরক্ষা থাকতে হবে।
পাচার চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই
গ্রামের গরিব মেয়েকে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে শহরে বা সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার খবর আমরা বহুবার পড়েছি। এই চক্র টিকে থাকে অস্পষ্টতার ওপর। যেখানে নিবন্ধন নেই, নজরদারি নেই, সেখানে পাচারকারী সবচেয়ে নিরাপদ। তাই পাচার ঠেকাতে হলে আগে অন্ধকার কমাতে হবে।
স্বচ্ছ ব্যবস্থায় কে কোথায় কাজ করছেন, তা জানা যায়। অবৈধ আস্তানা সহজে চোখে পড়ে। পুলিশ, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও বেসরকারি সংস্থা একসঙ্গে কাজ করলে উদ্ধার দ্রুত হয়। উদ্ধার হওয়া নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন লাগবে। শুধু গ্রেপ্তার করলে চক্র ভাঙে না। ভুক্তভোগী নতুন জীবন না পেলে চক্র আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
যারা ছেড়ে আসতে চান
আইন মানে এই নয় যে সবাইকে এই পেশায় থাকতে হবে। অনেক নারী সুযোগ পেলে অন্য কাজে যেতে চান। তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, ঋণসুবিধা ও কাজ পাওয়ার সহায়তা রাখতে হবে। সন্তানদের জন্য স্কুলে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এই পথ খোলা না থাকলে স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া আর বাধ্য হয়ে থাকার পার্থক্য মুছে যায়।
কেউ কেউ বলবেন, এটি নৈতিকতার প্রশ্ন। ধর্ম ও সমাজের মূল্যবোধ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই আপত্তি হালকা করে দেখা যায় না। তবে বছরের পর বছর কঠোর কথা বলেও এই পেশা বন্ধ হয়নি। শুধু নারীরা আরও অরক্ষিত হয়েছেন। বাস্তবতা মেনে না নিলে সুরক্ষার পথ খোলে না।
সংবিধান বলে, আইনের চোখে সবাই সমান। এই কথার মান তখনই থাকবে, যখন সবচেয়ে অবহেলিত নারীটিও নিজের অধিকার চাইতে পারবেন। যেহেতু সংবিধানে বলা আছে রাষ্ট্র সকল প্রকার নাগরিক কে সমান মর্যাদা দিবে আর রক্ষা করবে, সে ক্ষেত্রে সবার সাথে যৌনকর্মীদেরও সমান মর্যাদা দিতে বাধ্য। কারন, এক জন যৌনকর্মী, তিনি কারও মা, কারও মেয়ে, কারও বোন। আমাদের তাই একটি স্পষ্ট আইন চাই। সেই আইনে থাকবে সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি এবং ১৮ বছরের নিচে কারও জন্য কোনো জায়গা নয়। এটুকুই মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

