মানুষ, পরিবার, সমাজ, জাতি, অঞ্চল, দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত পরিচয় এবং অতীত সম্পর্কে ইতিহাস অবহিত করে। একই সঙ্গে ইতিহাস উন্নয়নের দিকনির্দেশনা দেয় এবং উন্নয়নের ভিত মজবুত করে। আমি ছাত্রজীবনে ইতিহাস পড়ার সুযোগ না পেয়ে বলতে গেলে কিছুটা দিকনির্ণয়হীনভাবে চলেছি। শিক্ষাজীবনে মন দিয়ে, দরদ দিয়ে উদ্ভিদবিদ্যা রপ্ত করে দেড় দশক সরকারি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় রত ছিলাম। সে সময় জীবনের মরণসন্ধিক্ষণে মহান সৃষ্টিকর্তা তথা প্রকৃতির প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমাকে শঙ্কিত ও ভীতসন্ত্রস্ত করত। ফলে সরাসরি মানবসেবায় আত্মনিয়োগের তাগিদ অনুভব করি। সেই তাগিদ থেকেই ১৯৬৪ সালে ভূমিহীন ভিখারিদের দ্বারা জন্ম নেওয়া টিএমএসএসের ১৯৮০ সালে হাল ধরি। তখন যা পেয়েছিলাম, তা হলো অদম্য আশা-আকাঙ্ক্ষা, মানবিক শক্তি, অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি এবং সীমাহীন দারিদ্র্য ও সম্পদহীনতা। সেই অবস্থা থেকেই উত্তরবঙ্গের কেন্দ্রস্থল বগুড়ার এই বেসরকারি সংস্থার সম্ভাবনা নিয়ে আমি আশাবাদী ছিলাম। বর্তমানে সংস্থার কার্যক্রম সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংস্থার কার্যক্রম এবং স্টেকহোল্ডারদের অবদানকে অগ্রাহ্য করা অন্যায় হবে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বগুড়া জেলাতেই আমার জন্ম। জন্মভূমিকে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। তাই ইতিহাস না জানলেও বগুড়ার উন্নয়নের প্রতি আকুতি থেকেই অতীত আবৃত্তি করতেই হয়।
১৮২১ সালে দিল্লির মসনদপুষ্ট সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পুত্র নাসিরুদ্দিন বগরা খানের নাম স্মরণে বগুড়ার নামকরণ করা হয়। মহাস্থানগড়ের প্রাচীন পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রবর্ধন ছিল এক অভাবনীয় সভ্যতার লীলাভূমি। সেখানে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ ও তৃতীয় শতক থেকেই সভ্যতা তথা নগরজীবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন ছিল অবিভক্ত বাংলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কৃষি ও কারখানায় অভাবনীয় উৎপাদনের কারণে সে কাল থেকেই এই জনপদ ছিল উর্বর। প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন সভ্যতা থেকে শুরু করে মৌর্য ও গুপ্ত যুগ, পাল রাজবংশ, সেন রাজবংশ, সুলতানি শাসন, মোগল শাসন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানের বঞ্চনামূলক শাসন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা—সবকিছু বিবেচনায় বগুড়ার ইতিহাস বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য, প্রাচীন ও ঘটনাবহুল। অথচ বগুড়ার জনপদের ন্যায্য অধিকার এখনও উপেক্ষিত।
ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস) নামের জাতীয় পর্যায়ের সংস্থা পরিচালনা করতে গিয়ে অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে বঞ্চনাকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি বৈষম্যের শিকার মানুষদের অবস্থার উন্নয়নে কাজ করে চলেছি। বগুড়ার ইতিহাস, জনবহুলতা, জনআকাঙ্ক্ষা ও জনগণের পারঙ্গমতার বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় অপার সম্ভাবনাময় মহানগর হিসেবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরেই বগুড়ার স্থান। ৬৪টি জেলা ঘুরে দেখেছি, বগুড়ার মানুষকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হয় না। অন্য জেলার মানুষকে অন্তহীনভাবে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেও অনেক সময় উদ্যোক্তা বানানো যায় না।
এই হেরকালের অর্থাৎ স্বাধীনতাপূর্ব বগুড়ার শিল্প-সংস্কৃতি, উন্নয়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার উৎপাদনের মধ্যে ছিল কসকো সাবান, জানেসাবা সাবান, বিশ্বখ্যাত সেন্টেড সিগারেট, কটন স্পিনিং মিলের কাপড় ও কম্বল, যা ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি হতো। তাজমা সিরামিক, গ্লাস, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতুর তৈজসপত্র, নানা আকারের গার্মেন্টস, বৃহৎ আকারের চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ট্যানারি শিল্প, দুগ্ধ ও খাদ্যশিল্প এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পও সে কাল থেকেই বগুড়ায় ছিল। বর্তমানে সেই অনুপাতে বিভিন্ন শাসকের বগুড়াকে বর্জন করার নীতি শুধু বগুড়াকেই নয়, বাংলাদেশকেও বর্জন করেছে। বুঝে বা না বুঝে কোনো শাসকগোষ্ঠী যদি কোনো জনপদের প্রতি বৈষম্য করে, তাহলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাতারেই তাদের মূল্যায়ন হবে। সমগ্র দেশকে উন্নত করতে হলে বিভিন্ন জনপদের উন্নয়নের সম্ভাবনা, উর্বরতা ও উন্নয়ন-উপযোগিতা বিবেচনায় নিতে হবে। সে অনুযায়ী বরাদ্দ, ব্যাকআপ সাপোর্ট ও ব্রেকথ্রুর ব্যবস্থা করতে হবে। ফরোয়ার্ড লিংকেজ এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজকে সহায়তা দিতে হবে। এর ফলে অপেক্ষাকৃত অনুপযোগী জনপদগুলোও প্রদর্শনীমূলক শিক্ষা তথা ডেমোনস্ট্রেশন, এডুকেশন এবং উন্নয়নের প্রভাবের মাধ্যমে আলোকিত হবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাব মোহাম্মদ আলী বগুড়ার সন্তান। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বগুড়ার অভিজাত সন্তান। তিনিই আমাদের বর্তমান প্রিয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাঁর সুবিধা, স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্পদ ইত্যাদি বিসর্জন দিয়ে অত্যন্ত সাশ্রয়ী জীবনযাপনের মাধ্যমে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চনাগ্রস্ত জনপদের সমস্যা এবং দলের অভ্যন্তরীণ দলাদলি সামাল দিচ্ছেন। একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে যেভাবে ঠান্ডা মাথায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এসব ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার তুলনায় আমাদের ন্যূনতম আনুপাতিক আগ্রহ ও ত্যাগটুকুও কি আছে? তাঁর শাসনকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে দল ও জাতি হিসেবে আমাদের ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে।
তিন দশক পর তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে একজন ব্যক্তি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। অপার সম্ভাবনাময় বগুড়ার উন্নয়নে প্রাকৃতিক আবেগ থেকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে রেখে তিনি যেসব উন্নয়ন প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে আমাদের সমালোচনার সীমা নেই। তবে বগুড়ার জনপদের আত্মসমালোচনামূলক এই গুণবাচক বাক্যবাণ হিসেবে বিষয়টিকে বিবেচনা করলে এটিও বগুড়ার জন্য শুধু ইতিবাচকই নয়, বরং অনেক ইতিবাচক।
দীর্ঘ কয়েক যুগ পর একজন মাত্র প্রতিমন্ত্রী পেয়ে তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বগুড়া বিভাগের পথচিত্র (রোডম্যাপ) এবং বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জ—এই পাঁচ জেলার সমন্বয়ে বিভাগ গঠনের সংবাদে কেউ কেউ ভ্রু কুঁচকান। তাঁরা ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে জানবেন, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর বিভাগের বিভিন্ন থানা নিয়ে একসময় বগুড়া জেলা গঠিত হয়েছিল। সেদিন পূর্ববঙ্গের কয়েকজন ডাকসাইটে আমলা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য বৃহৎ অঙ্কের বরাদ্দের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলছিলেন, রংপুর বিভাগীয় শহর হওয়ায় তার সঙ্গে বগুড়াকে তুলনা করা যায় না। যে বিভাগগুলোর অংশবিশেষের জনপদ এককালে বৃহত্তর বগুড়া জেলার সীমানাভুক্ত ছিল, সেই বগুড়াকে বিভাগ ঘোষণা করে এর বিকাশের জন্য সরকারিভাবে রেলপথ, আকাশপথ, শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদন খাতকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বিকাশের জন্যই বগুড়ার গুরুত্ব অপরিহার্য।
অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস।
লেখাটি সম্পূর্ণ লেখিকার নিজস্ব মতামত, যা সিটিজেন্স ভয়েসের সম্পাদকীয় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।

