২৫ কোটি গাছ লাগানো, নদী ও খাল পুনঃখনন এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। কিন্তু ড্যাপ সংশোধন, জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রেণি এবং জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্যে নীতি, সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের সমন্বয় কতটা জরুরি, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
পরিবেশ রক্ষা এখন আর সৌন্দর্যবর্ধন বা বৃক্ষরোপণের বিষয় নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। অক্টোবরজুড়ে ঢাকার বাতাস বেশির ভাগ দিনই ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’। ১০ অক্টোবর বায়ুমান সূচক ছিল ১৮১, ঢাকা ছিল বিশ্বের চতুর্থ দূষিত শহর। ৩০ অক্টোবরও ১৬১ নিয়ে অবস্থান ছিল পঞ্চম। আগস্টে এই সূচক ছিল ৮৭ থেকে ৯৭, অর্থাৎ ‘মাঝারি’। শীত আসার আগেই এই চিত্র উদ্বেগজনক।
বৃক্ষরোপণ: সংখ্যার চেয়ে বেঁচে থাকার হিসাব জরুরি
বিএনপি তাদের ইশতেহারে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ৭ অক্টোবরের বৈঠকের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ চারা রোপণ হয়েছে।
চলতি বছরের ৫ কোটি ১৫ লাখের লক্ষ্যে অগ্রগতি ৬৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বলেছেন, স্কুল কলেজে পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনাও আছে। এগুলো ইতিবাচক। তবে মার্চে একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একদিকে চারা রোপণের ঘোষণা হচ্ছে, অন্যদিকে শতবর্ষী গাছে করাত চলছে। রোপণের সংখ্যা প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু কয়টি চারা বেঁচে আছে, তার হিসাব নেই। পুরোনো গাছ কাটা না থামলে নতুন চারা সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেবে না।
ড্যাপ সংশোধন: বুড়িগঙ্গার তীরে ভারী শিল্প?
জলাবদ্ধতা ঢাকার বড় সংকট। ড্যাপ ২০২২ থেকে ২০৩৫ প্রণীত হয়েছিল পরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষা এবং বন্যাপ্রবাহের পথ সংরক্ষণের জন্য। সাম্প্রতিক সংশোধনে তিনটি বিধান বদলেছে: আবাসিক প্লটে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও, তিনটি প্লটের শ্রেণি পরিবর্তন এবং পানিপ্রবাহ এলাকার বিধিমালা। গেজেট অনুযায়ী শ্যামপুর ও কদমতলীর আইলবাহার মৌজার ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর প্লট এখন ‘উন্মুক্ত স্থান’ নয়, ‘ভারী শিল্প এলাকা’।
বুড়িগঙ্গার ওই অংশ আগে থেকেই দূষিত। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে শ্যামপুর ও কদমতলী এলাকায় ডাইং, ওয়াশিং ও রাসায়নিক কারখানা আছে ৪৯টি। এই বাস্তবতায় নদীর তীরে ভারী শিল্পের সুযোগ বাড়ানো মানে আরও দূষণের ঝুঁকি। প্রশ্ন শিল্পায়নের বিরোধিতার নয়। প্রশ্ন হলো কোথায় হবে, কী ধরনের শিল্প হবে এবং পরিবেশগত মূল্য কে দেবে।
জাহাজভাঙা শিল্প: শ্রেণি নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
জাহাজভাঙা শিল্প বিষাক্ত বর্জ্য, তেল, ভারী ধাতু, অ্যাসবেস্টস ও শ্রমিকের নিরাপত্তার ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। শিল্পটিকে লাল থেকে কমলা শ্রেণিতে নামানোর বিতর্ক নতুন নয়। ২০২১ সালে এমন সিদ্ধান্তের পর ইয়ার্ড স্থাপনে পরিবেশগত সমীক্ষা বা ইআইএ বাধ্যতামূলক ছিল না। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) তখন আদেশ বাতিল চেয়ে আইনি নোটিশ দেয়। পরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি শিল্পটিকে আবার লাল তালিকায় ফেরানোর সুপারিশ করে।
মালিকদের যুক্তি, লাল তালিকায় থাকলে ব্যাংক সুবিধা ও অনুমোদন কঠিন হয়। আগস্টের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ পাওয়ার পরও চট্টগ্রামে দুর্ঘটনা থামেনি। এক গবেষকের ভাষায়, সনদ থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, নীতি মানতে হয়। অর্থাৎ শ্রেণি যা-ই হোক, আসল পরীক্ষা মাঠের তদারকিতে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও সুন্দরবন
জ্বালানি সংকট বাস্তব। আগস্টের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে প্রায় দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। নতুন অর্থবছরের দুই মাসেরও কম সময়ে এ খাতে ভর্তুকি ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ১৪ অক্টোবর ক্রয় কমিটি মহেশখালীর কুতুবজোম ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনইইর দর প্রস্তাব প্রত্যাহার করেছে। ব্যয় ধরা ছিল ১৫ বছরে প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি এবং ২০ বছরে প্রায় ১৩ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এ ঘটনা দেখায়, পরিবেশের পাশাপাশি প্রকল্পের আর্থিক যৌক্তিকতাও যাচাই জরুরি।
মহেশখালীর এই টার্মিনাল সরাসরি সুন্দরবনসংলগ্ন নয়। তবে পায়রা ও মোংলা বা দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলে ভবিষ্যতে জ্বালানি অবকাঠামো হলে জাহাজ চলাচল, ড্রেজিং, তেল ও রাসায়নিক নিঃসরণের প্রভাব আগেই মূল্যায়ন করতে হবে।
ঘোষণা ও বাস্তবতার ব্যবধানের কিছু কারণ
সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ ও জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮ অনুযায়ী পরিবেশ রক্ষা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তবু ব্যবধান থাকছে, কারণ:
- মন্ত্রণালয়গুলো আলাদা পথে চলে: শিল্প, গৃহায়ণ ও জ্বালানি বিভাগের লক্ষ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য প্রায়ই সাংঘর্ষিক।
- ইআইএ আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকে: স্থান নির্বাচন, বিকল্প প্রযুক্তি ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার বিষয়টি শুরুতে বিবেচিত হয় না।
- প্রয়োগের সক্ষমতা কম: জনবল, পরীক্ষাগার ও নিয়মিত পরিদর্শনের ঘাটতি আইনকে কাগজে আটকে রাখে।
- ক্ষতির হিসাব হয় না: কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ গোনা হয়, কিন্তু নদীদূষণ, জলাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যক্ষতির আর্থিক মূল্য গোনা হয় না।
এর ফল ভোগ করবে কারা?
নদী দূষিত হলে ক্ষতি হয় মৎস্য, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের। জলাধার হারালে বাড়ে জলাবদ্ধতা। শিল্পবর্জ্য ও বায়ুদূষণের বোঝা বইতে হয় সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, উৎপাদনক্ষমতা কমে। আজকের মুনাফার দাম হয়তো আগামী কয়েক দশক ধরে জনগণকেই দিতে হবে।
সরকারের করণীয়
- সমন্বিত জবাবদিহি: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিবেশ ও জলবায়ু সমন্বয় কাঠামো গড়া এবং বড় প্রকল্পের অনুমোদনে পরিবেশগত প্রভাবকে বাধ্যতামূলক করা।
- ড্যাপে স্বচ্ছতা: বুড়িগঙ্গার তীরের জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও পানিপ্রবাহ বিধির কারিগরি ভিত্তি প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন।
- স্বাধীন ইআইএ: বড় প্রকল্পে বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন, স্থানীয় মতামত গ্রহণ ও প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
- জাহাজভাঙায় কঠোর শর্ত: বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত ও স্বচ্ছ পরিদর্শন।
- সুন্দরবনে সতর্কতা: সংবেদনশীল এলাকায় অবকাঠামোর আগে বিকল্প স্থান, জীববৈচিত্র্য ও জাহাজ চলাচলের প্রভাব যাচাই।
- ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন: চারার প্রজাতি, পরিচর্যা ও বেঁচে থাকার হার প্রকাশ করা এবং নদী খননে পানিপ্রবাহ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও দখলমুক্তিকে মাপকাঠি করা।
- পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা: জনবল, পরীক্ষাগার ও নজরদারি বাড়ানো এবং প্রভাবশালীদের চাপমুক্ত আইন প্রয়োগ।
অঙ্গীকারের প্রকৃত পরীক্ষা
বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিবেশ ও উন্নয়নকে প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তা জরুরি, কিন্তু নদী, বন, জলাভূমি ও মানুষের স্বাস্থ্যের বিনিময়ে নয়। ২৫ কোটি গাছের প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন নির্বিচারে বৃক্ষনিধন থামবে। নদী পুনঃখনন তখনই সফল হবে, যখন দখল ও দূষণ বন্ধ হবে। পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের কথা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন শ্রমিকের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে।
উন্নয়ন কত সড়ক, সেতু বা কারখানা হলো তা দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ হলো, নদী কতটা বাঁচল এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা বাসযোগ্য পরিবেশ রইল, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অঙ্গীকার ও সিদ্ধান্তের দূরত্ব যত কমবে, উন্নয়নের ভিত্তি তত টেকসই হবে।

