সস্তা ভিউ, তারকাখ্যাতির উন্মাদনা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন….
আদালত কোনো তারকার ব্যক্তিগত মঞ্চ নয়। সেখানে মানুষ আসেন বিচার চাইতে, নিজেদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। অথচ আদালত প্রাঙ্গণেই যদি ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের দাপট, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং সাধারণ বিচারপ্রার্থীর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে ‘আইনের শাসন ও আদালতের নিরাপত্তা কোথায়’?
সমকালের সাংবাদিক রবিউল হোসাইন রাজুর সঙ্গে অভিনেত্রী পরীমণির সাম্প্রতিক বিরোধ সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। পরীমণির অভিযোগ, ওই সাংবাদিক তাঁর শরীরে স্পর্শ করেছিলেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও সাংবাদিকদের বক্তব্যে ঘটনাটির ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে যথাযথ তদন্ত। তবে অভিযোগের পর সাংবাদিককে প্রকাশ্যে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘাতের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
সাংবাদিকের হাতে ক্যামেরা বা মোবাইল থাকা অপরাধ নয়। আদালত প্রাঙ্গণে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে তারকাদের বিরোধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের আচরণ আপত্তিকর মনে হলে তার প্রতিকার আইনসম্মত উপায়ে হতে পারে। প্রকাশ্যে অপমান, গালিগালাজ কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে শারীরিকভাবে নাজেহাল করার কোনো অধিকার কারও নেই।
আদালতে তারকাখ্যাতির প্রদর্শনী

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালত প্রাঙ্গণে পরীমণির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিকদের পাশাপাশি একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থীর আহত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আগামীর সময়ের সাংবাদিক সিয়াম হোসেন এবং জাগো নিউজের সাংবাদিকদের বক্তব্যেও হামলা ও নাজেহালের অভিযোগ উঠে এসেছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থী কেন এমন পরিস্থিতির শিকার হবেন? তিনি তো কোনো তারকার সংবাদ সংগ্রহ করতে যাননি। আদালতে এসেছিলেন নিজের প্রয়োজনেই। তাঁর মাথা ফেটে যাওয়ার অভিযোগ সত্য হলে, দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুসারে হামলা বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, অপরাধমূলক ভয়ভীতি প্রদর্শনের দায়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এটি শুধু তারকা-সাংবাদিক বিরোধ নয়; বরং আদালতের নিরাপত্তা ও নাগরিকের অধিকার রক্ষায় গুরুতর ব্যর্থতার প্রশ্ন।
একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে আসবেন, তাঁর সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী থাকতে পারেন। কিন্তু সেই নিরাপত্তা যেন অন্যের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়। আদালত প্রাঙ্গণ ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা নয়।
সাংবাদিকতা বনাম সস্তা ফুটেজে গা ভাসানো
সাংবাদিকদেরও পেশাগত দায়িত্ব ও আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। কারও ব্যক্তিগত পরিসর, নিরাপত্তা কিংবা মর্যাদা লঙ্ঘন করে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহের স্বাভাবিক কাজকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে পরিণত করাও গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা জরুরি।
একইভাবে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান কিংবা শারীরিকভাবে নাজেহাল করার লাইসেন্স তৈরি হয় না। সাংবাদিকের অপরাধ থাকলে আইনের আশ্রয় নিতে হবে, ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে বিচার তুলে দেওয়া যাবে না।

এখানে আরেকটি প্রবণতা চোখে পড়ে। তারকাদের ব্যক্তিগত বিরোধ, উত্তেজনা, গালিগালাজ কিংবা আদালতে নাটকীয় উপস্থিতি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের একটি অংশও এসব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করে। ফলে প্রকৃত সংবাদ, বিচারপ্রক্রিয়া ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যায়।
এটি কি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, নাকি সস্তা ভিউ ও ক্লিকের প্রতিযোগিতা?
পুরোনো বিতর্ক, নতুন প্রশ্ন
পরীমণির সঙ্গে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বোটক্লাবের ঘটনাও অতীতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই মামলার অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, তদন্ত ও আদালত-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে জনপরিসরে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে। তবে পুরোনো কোনো মামলার অভিযোগ বা বিতর্ককে বর্তমান ঘটনার সত্যতা প্রমাণের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
একইভাবে, কোনো ব্যক্তির অতীত বিতর্কিত হলেই তাঁর বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য হয়ে যায় না। বর্তমান ঘটনার বিচার করতে হবে বর্তমান ঘটনার প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু অতীতের বিতর্ক যদি বারবার আলোচনায় আসে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ, জনপরিসরে তাঁর দায়বদ্ধতা এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সংবাদমাধ্যমেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন
জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যখন একজন অভিনেত্রী বা তারকার ব্যক্তিগত জীবনকে দিনের পর দিন প্রধান সংবাদ হিসেবে তুলে ধরে, তখন সংবাদমূল্যের প্রশ্নটি সামনে আসে। দেশের অর্থনীতি, শ্রমিকের অধিকার, ব্যাংকিং সংকট, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা নাগরিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর তুলনায় তারকাদের ব্যক্তিগত বিরোধ কেন বেশি প্রচার পায়?
জনপ্রিয়তা সংবাদমূল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল মানুষের আগ্রহ মেটানো নয়, বরং জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা।
বিনোদন সাংবাদিকতাও থাকবে কিন্ত তার লক্ষ্য হবে অস্তিত্ব সংকটে থাকা চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা, মানসম্মত চলচ্চিত্র কে প্রমোট করা যা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি কে ধারণ করে।

অনেক সাংবাদিক পরী মণির সংবাদ বয়কট করার আহ্বান জানাবে হয়তো আবেগের জায়গা থেকে, আবার অনেকেই সাংবাদিকের ভূমিকা বিচার করতে বলবে। তবে সংবাদ বয়কটের চেয়ে দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন, যাচাই-বাছাই এবং অপ্রয়োজনীয় প্রচার থেকে বিরত থাকাই অধিক কার্যকর। কোনো ব্যক্তির সংবাদ প্রকাশ করা হবে কি না, তা নির্ধারণের মানদণ্ড হওয়া উচিত জনস্বার্থ ও সংবাদমূল্য, ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়।
আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়
তারকাখ্যাতি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের অধিকার থাকলেও তাঁদের দিয়ে সাংবাদিক কিংবা সাধারণ নাগরিককে নাজেহাল করার অধিকার নেই। আদালতের দায়িত্ব সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আর সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
সস্তা ভিউয়ের প্রতিযোগিতা, তারকাদের ব্যক্তিগত নাটক এবং ক্ষমতার প্রদর্শনী যদি সংবাদজগতের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে, তাহলে প্রকৃত সাংবাদিকতা ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়বে।
আদালত কোনো তারকার শোডাউনের জায়গা নয়। সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত আক্রোশের লক্ষ্য নয়। আর সাধারণ বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা কোনোভাবেই তারকাখ্যাতির কাছে জিম্মি হতে পারে না।

