মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে বৈধ ওষুধের আমদানি ও সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় সাধারণ রোগীদের। প্রয়োজন আইনের স্পষ্টতা, প্রশাসনিক সমন্বয় ও বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
আইনি জটিলতায় আমদানি কার্যক্রম
চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এই সেবা নিশ্চিত করতে যেমন প্রয়োজন আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, তেমনি আইনের প্রয়োগ হতে হবে বাস্তবসম্মত, সমন্বিত ও জনস্বার্থের অনুকূলে। কিন্তু বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা বর্তমানে এমন এক প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি, যার প্রভাব পড়ছে ওষুধ আমদানি, সরবরাহ ও চিকিৎসার ধারাবাহিকতায়। দীর্ঘদিন ধরে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে আমদানি হয়ে আসা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ফিনিশড ডোজেজ ডাইলিউশন বা প্রস্তুতকৃত তরল ওষুধের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পৃথক লাইসেন্স গ্রহণের নির্দেশনা নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের অভিযোগ, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন নীতিমালা না থাকায় লাইসেন্স গ্রহণ, রাজস্ব নির্ধারণ ও আমদানি প্রক্রিয়ায় অসংগতি দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও একই ধরনের কার্যক্রমের জন্য ভিন্ন পরিমাণ রাজস্ব দিতে হচ্ছে। ফলে আমদানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বাজারে ওষুধের সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অ্যালকোহল: ওষুধের উপাদান নাকি নিয়ন্ত্রিত মাদক?
এই জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে ইথাইল অ্যালকোহল বা ইথানল। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের নির্দিষ্ট কিছু প্রস্তুতপ্রণালিতে এটি দ্রাবক, উপাদান মিশ্রণ ও সংরক্ষণকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে অ্যালকোহলের অপব্যবহার, অবৈধ উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ করা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অন্যতম দায়িত্ব। ফলে অ্যালকোহলযুক্ত কোনো পণ্য আমদানি বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ওষুধে নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহৃত অ্যালকোহল এবং নেশার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত অ্যালকোহলকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করলে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে অসংগতি তৈরি হতে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো পণ্যে অ্যালকোহলের উপস্থিতি থাকলেই তার ব্যবহার, মাত্রা, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনা না করে সব ধরনের পণ্যের জন্য অভিন্ন ব্যবস্থা কার্যকর করা কতটা যৌক্তিক।
আইনের বিধান ও প্রয়োগের অস্পষ্টতা
বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-তে অ্যালকোহলের সংজ্ঞা, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিধান রয়েছে। আইনের ২(৫) ধারায় অ্যালকোহল বলতে হাইড্রোক্সিল (OH) মূলকসম্বলিত যেকোনো জৈব যৌগকে বোঝানো হয়েছে, ফলে সংজ্ঞাটি অত্যন্ত বিস্তৃত। ১০ ধারায় লাইসেন্স, পারমিট বা পাস ছাড়া অ্যালকোহল আমদানি, মজুদ, সরবরাহ এবং অ্যালকোহলজাত ওষুধ প্রস্তুতের উপাদান হিসেবে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটিই আমদানিকৃত হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স চাওয়ার মূল আইনি ভিত্তি। ১১ ধারায় অ্যালকোহল পানের ক্ষেত্রে পারমিটের বিধান এবং ১৩ ধারায় লাইসেন্স, পারমিট ও পাস প্রদানের কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে। আইনের ২(১২) ধারায় ‘চিকিৎসক’ সংজ্ঞায় নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকও অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ চিকিৎসা ও ওষুধসংক্রান্ত ব্যবহারের বাস্তবতা আইনে স্বীকৃত। বিস্তারিত লাইসেন্স, পারমিট ও ফি-এর কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২২-এ।
এমনকি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত চিকিৎসকের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৪০ লিটার প্রুফ রেক্টিফায়েড স্পিরিট ব্যবহারের একটি বিশেষ বিধানও তফসিলে রয়েছে। অর্থাৎ আইনেই চিকিৎসা ও ওষুধসংক্রান্ত ব্যবহারের বিশেষ বাস্তবতা স্বীকার করা হয়েছে। সুতরাং আইনে নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি স্পষ্ট; অস্পষ্টতা মূলত প্রয়োগে। আমদানিকৃত ফিনিশড ডোজেজ ডাইলিউশন, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত ইথানল এবং চিকিৎসকের ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে কোন কর্তৃপক্ষ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও কার্যকর নির্দেশনা প্রয়োজন।

দুই অধিদপ্তরের দায়িত্বের সীমারেখা
এখানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এখতিয়ার ও দায়িত্বের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠান ওষুধের নিবন্ধন, গুণগত মান, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করবে, অন্য প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ ব্যবস্থাপনা প্রতিরোধ করবে। দুই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পরস্পরের পরিপূরক হওয়ার কথা। কিন্তু দায়িত্বের সীমারেখা, লাইসেন্সের শর্ত, রাজস্ব নির্ধারণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া স্পষ্ট না থাকলে একই পণ্যের ক্ষেত্রে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। কোনো আমদানিকারক যদি একটি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাহলে অন্য কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা, শর্ত ও প্রক্রিয়াও লিখিত ও অভিন্ন নীতিমালায় নির্ধারিত থাকা উচিত। এতে একদিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীরা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাবেন। উল্লেখ্য, ২০১৮ আইনের ৩ ধারায় এই আইনের বিধান অন্য আইনের ওপর প্রাধান্য পায়। তাই সমন্বয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স-শর্ত ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন-প্রক্রিয়ার মধ্যে দ্বৈততা থেকেই যাবে।
ওষুধ সংকটে চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা
এই জটিলতার প্রভাব ইতোমধ্যে চিকিৎসাসেবার ওপর পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে প্রতিদিন চার শতাধিক রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন বলে জানা গেছে। প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিভিন্ন ওষুধের দোকানে ঘুরেও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি শুধু একটি হাসপাতাল বা কয়েকজন আমদানিকারকের সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণকারী মানুষের জন্য ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে সরবরাহের অনিশ্চয়তা চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে।

কার্যকারিতা ও রোগীর নিরাপত্তার প্রশ্ন
তবে এই সংকটের সমাধান করতে গিয়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কিংবা মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হলেই তার সব চিকিৎসাগত দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিতর্ক রয়েছে। তাই রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওষুধের উপাদান, প্রস্তুতপ্রণালি, অ্যালকোহলের মাত্রা, গুণগত মান, দূষণমুক্ততা ও সঠিক লেবেলিং যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসার পরিবর্তে কেবল হোমিওপ্যাথির ওপর নির্ভর করে যেন রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব না করেন, সে বিষয়ে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। রোগীর পছন্দের চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপদ ও তথ্যভিত্তিক চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আইন আছে, সমন্বিত নীতিমালা কোথায়?
বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা ও পেশাগত কাঠামো নিয়ন্ত্রণে ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন, ২০২৩ প্রণীত হয়। এটি ১৯৮৩ সালের পুরোনো অধ্যাদেশের পরিবর্তে নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসকদের নিবন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি এবং পেশাগত যোগ্যতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আইনের ৪৩ ও ৪৪ ধারায় বিধি ও প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। এখানে একটি আইনি অসংগতিও লক্ষণীয়: ২০১৮ আইনের ‘চিকিৎসক’ সংজ্ঞায় এখনো ১৯৮৩ সালের হোমিওপ্যাথিক অধ্যাদেশের উল্লেখ রয়েছে, অথচ সেটি ২০২৩ আইনে রহিত হয়েছে। এ ধরনের আনুষঙ্গিক সংশোধন না হলে দুই আইনের মধ্যে ব্যাখ্যাগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২০ ও ২০২৬ সালে সংশোধিত হয়েছে, তাই সর্বশেষ সংশোধিত পাঠ অনুসরণ করা জরুরি। কিন্তু চিকিৎসা শিক্ষা ও পেশাগত নিবন্ধনের কাঠামো থাকলেই ওষুধের আমদানি, উৎপাদন, বিপণন ও মান নিয়ন্ত্রণের সব সমস্যা সমাধান হয় না। এসব ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের নিবন্ধন, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য পৃথক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০০১/৮৩/ইসি নির্দেশনায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধের জন্য বিশেষ নিবন্ধন কাঠামোর বিধান রাখা হয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট শ্রেণির হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ক্ষেত্রে সরলীকৃত নিবন্ধন পদ্ধতি থাকলেও উৎপাদন, মান, নিরাপত্তা ও লেবেলিংয়ের শর্ত অনুসরণ করতে হয়। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশেও হোমিওপ্যাথিক পণ্যের নিবন্ধন ও বিপণনের ক্ষেত্রে পৃথক নিয়ন্ত্রক কাঠামো রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মূল শিক্ষা হলো, কোনো পণ্যকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা নয়; বরং পণ্যের প্রকৃতি ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য অনুযায়ী উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
সংকট উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথম প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর মধ্যে জরুরি সমন্বয় সভা। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল এবং আমদানিকারক ও চিকিৎসকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটির মাধ্যমে আমদানিকৃত ওষুধে অ্যালকোহলের মাত্রা, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা, রাজস্বের হার এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে দেশজুড়ে একই নিয়ম ও ফি কার্যকর করা জরুরি। পাশাপাশি আমদানিকারকদের নিবন্ধন, পণ্যের ব্যাচভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ, উপাদানের সঠিক ঘোষণা, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই এবং বাজার তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সময়ে বৈধভাবে অনুমোদিত ও নিবন্ধিত ওষুধের আমদানি যেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে না যায়। প্রয়োজনীয় যাচাই ও শর্তসাপেক্ষে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যাতে একদিকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধ হয়, অন্যদিকে রোগীদের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকে। তবে এ সুযোগকে কোনোভাবেই অনিবন্ধিত, মানহীন কিংবা অনিরাপদ ওষুধ আমদানির ছাড়পত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা, দুটিই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
জনস্বার্থই হোক আইন প্রয়োগের মূল বিবেচনা
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইন প্রণয়ন কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইন যেন নাগরিকের জীবন ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে কঠোরতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই কঠোরতা যেন বৈধ চিকিৎসাসেবার প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়। একইভাবে চিকিৎসাসেবার নামে মানহীন ওষুধের অবাধ বাণিজ্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যেখানে জনস্বাস্থ্য, রোগীর অধিকার, ওষুধের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন একসঙ্গে সুরক্ষিত থাকবে। প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে যদি প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানি ব্যাহত হয়, তাহলে তার দায় শুধু আমদানিকারকের নয়; সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। আইনের উদ্দেশ্য মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানুষের প্রয়োজনকে আইনি জটিলতার মধ্যে আটকে রাখা নয়।

