বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটার বলেশ্বর নদীর তীরঘেঁষা রুহিতা গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় ভিন্ন এক প্রস্তুতি। দিনভর নদীতে মাছ ধরার ব্যস্ততা শেষে হাতে কলসি, বালতি কিংবা পানির জার নিয়ে দল বেঁধে অন্ধকার পথে বের হন গ্রামের নারীরা। গন্তব্য বাড়ির কাছের কোনো নলকূপ নয়, প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরের একটি পুকুর। কারণ, ঘরে খাওয়ার পানি নেই। বছরের পর বছর ধরে সুপেয় পানির এই সংকটে ভুগছেন গ্রামের বাসিন্দারা।
গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বলেশ্বর নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে দিনের পর দিন বাইরে থাকেন। ফলে সংসারের পানি সংগ্রহের দায়িত্ব মূলত নারীদের কাঁধেই পড়ে। কিন্তু কাছাকাছি কোনো নিরাপদ উৎস না থাকায় এই দায়িত্ব পালন তাঁদের জন্য প্রতিদিনের কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
দিনের আলোয় ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পানি আনা অনেকের পক্ষেই কঠিন। তার ওপর নদী, খাল ও নির্জন পথের কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই সন্ধ্যার পর কিংবা রাতে দলবদ্ধ হয়ে পানি আনতে যান নারীরা। কেউ মাথায় কলসি নেন, কেউ হাতে বালতি বা জার বহন করেন। পুকুরে পৌঁছে পানি সংগ্রহ করে আবার একই পথে বাড়ি ফিরতে হয়। দল বেঁধে চললেও রাতের অন্ধকারে তাঁদের উৎকণ্ঠা কাটে না। এভাবে পানি আনতে সময়, শ্রম ও নিরাপত্তার দুশ্চিন্তা একসঙ্গে যুক্ত হয়।
রুহিতা গ্রামের বহু পরিবারের জীবিকা মাছ ধরাকে ঘিরেই আবর্তিত। বলেশ্বর নদী থেকে বঙ্গোপসাগর, এই জলপথই তাঁদের আয়ের প্রধান ভরসা। পুরুষেরা মাছ ধরতে গেলে ঘরে থাকা নারী, শিশু ও বয়স্কদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সংসার চালাতে হয়। এর মধ্যেই পানি সংগ্রহ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিনের অন্যতম বড় কাজ।
এক জেলে পরিবারের নারী আমেনা বেগম বলেন, তাঁর স্বামী সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে সাত থেকে ১০ দিন থাকেন। এ সময় পানি আনার দায়িত্ব তাঁদের ওপরই পড়ে। জীবন বাঁচাতে পানি তো আনতেই হবে। কিন্তু ছয় কিলোমিটার পথ যাতায়াতে যে সময় চলে যায়, তা ঘরের অন্য কাজ কিংবা আয়ের কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। শিশুদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
গ্রামের শিশু জুয়েনা আক্তার বলে, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর মায়ের সঙ্গে খাবার ও রান্নার পানি আনতে যেতে হয়। অথচ সন্ধ্যার পরই পড়ার টেবিলে বসার সময়। ঠিক তখনই পানির জন্য বের হতে হওয়ায় লেখাপড়ার আগ্রহ কমে যায়, সময়ও নষ্ট হয়।
উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট নতুন নয়। লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নিরাপদ পানির উৎসের স্বল্পতা অনেক উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছে। রুহিতার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এই সংকটে থাকলেও তাঁরা এর কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি।
একটি গ্রামের জন্য নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা শুধু পান করার পানির নিশ্চয়তা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর নিরাপত্তা, সময় ও মর্যাদার প্রশ্নও। রুহিতার নারীদের কাছে তাই নিরাপদ পানির উৎস মানে শুধু বাড়ির পাশে একটি নলকূপ বা সংরক্ষিত পুকুর নয়, এর অর্থ রাতের অন্ধকারে ছয় কিলোমিটার পথ হাঁটার অবসান। যে নারীরা দিনের আলোয় সংসারের নানা কাজ সামলান, রাত নামলে তাঁদেরই আবার কলসি হাতে বের হতে হয় পানির সন্ধানে।
পাথরঘাটা উপজেলা পানি কমিটির সভাপতি এরফান আহমেদ সোয়েন বলেন, এ অঞ্চলে নিরাপদ পানির হাহাকার চলছে। চিফ হুইপ তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন যে নিরাপদ পানি সংরক্ষণের জন্য পাথরঘাটা উপজেলায় দুই হাজার ট্যাংকি বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৫০০টি দেওয়া হবে।
পাথরঘাটা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সগির আলম বলেন, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীসংলগ্ন হলেও এখানে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। সুপেয় পানির অভাবে মানুষ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। তাই তিনি নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পাথরঘাটা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান জানান, সুপেয় পানির জন্য পুকুর খনন ও ফিল্টার স্থাপনের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে অনেক পানির ট্যাংকি বরাদ্দও হয়েছে।
পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেহেদী হাসান বলেন, সুস্বাস্থ্যের অন্যতম উপাদান নিরাপদ পানি। এ এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। হাসপাতাল চত্বরে একটি অত্যাধুনিক ফিল্টার ছিল, যা আড়াই বছর ধরে নষ্ট হয়ে আছে। সেটি দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে নদী ও সাগরের কোলে থেকেও সুপেয় পানির অভাবে ভুগছে রুহিতা। ট্যাংকি বরাদ্দ, পুকুর খনন ও ফিল্টার স্থাপনের উদ্যোগ কাগজে-কলমে এগোলেও বাস্তবে কবে এই গ্রামের নারীদের রাতের অন্ধকারে ছয় কিলোমিটার হাঁটার অবসান হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

