আইন পেশাকে যুগে যুগে সমাজের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ, বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রভাবশালী ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কালো গাউন, টাই, এজলাসের ক্ষুরধার যুক্তি-তর্ক আর দৃশ্যমান সামাজিক মর্যাদা-বাইরে থেকে দেখলে এটি যেকোনো তরুণের জন্য এক পরম আকর্ষণীয় স্বপ্ন। কিন্তু এই বাহ্যিক গ্ল্যামার ও আভিজাত্যের আড়ালে যে মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা ও চরম অনিশ্চয়তা পেশাজীবীদের প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খায়, তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব কমই হয়।
আইন পেশার এই জটিলতার ভেতর একজন মানুষ কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্য অটুট রেখে একটি অর্থপূর্ণ ও সুখী জীবন গড়ে তুলতে পারেন, তা ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা করেছেন অধ্যাপক ন্যান্সি লেভিট ও ডগলাস ও. লিন্ডার তাঁদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য হ্যাপি লয়ার: মেকিং আ গুড লাইফ ইন দ্য ল’ (The Happy Lawyer: Making a Good Life in the Law)-এ। লেখকেরা বইয়ের শুরুতেই একটি অপ্রিয় সত্য সামনে এনেছেন: আইনজীবীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি উপার্জন করলেও সামগ্রিকভাবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অসুখী। পশ্চিমা গবেষণার আলোকে চিহ্নিত এই সংকটটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানকার আইনজীবীদের বাস্তব লড়াই আরও বহুগুণ বেশি নির্মম ও বহুমাত্রিক।
বাংলাদেশের আইন শিক্ষার কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সংকটের বীজ শুরুতেই রোপিত হয়। দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইনের পাঠ্যক্রম মূলত সেকেলে ধারা মুখস্থনির্ভর। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেতে হবে; কিন্তু কোনো আদালতকক্ষে কীভাবে ক্লায়েন্টের মানবিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে, সহকর্মীদের সাথে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক গড়তে হবে কিংবা তীব্র পেশাগত মানসিক চাপ কীভাবে সামাল দিতে হবে-তার কোনো মানসিক বা প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ সেখানে থাকে না। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো, বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও লিগ্যাল-টেক যখন আইনি গবেষণা ও মামলা পরিচালনার গতিপথ বদলে দিচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণার কোনো ধারণাই পাচ্ছে না। ফলে হাজার হাজার আইন গ্র্যাজুয়েট যখন সনাতনী জ্ঞান নিয়ে আদালতে নামেন, তখন শ্রেণিকক্ষের তত্ত্বের সাথে রূঢ় বাস্তবতার আকাশ-পাতাল ব্যবধানে তাল মেলাতে গিয়ে চরমভাবে হিমশিম খান।
আদালত প্রাঙ্গণে পা রেখেই একজন নবীন আইনজীবীকে এক কঠিন মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। কর্পোরেট ল ফার্মের জীবন বাইরে থেকে যতটা চাকচিক্যময়, ভেতরের বাস্তবতা ঠিক ততটাই নিঃশ্বাসরুদ্ধকর। সকাল ৯টায় চেম্বারে ঢোকা, ঠিক ১০টায় কোর্টে শুনানি, আর ফিরে এসে ড্রাফটিং ও ক্লায়েন্ট সামলাতে গিয়ে রাত ১০টা বাজা নিত্যদিনের চিত্র। প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা ও লিগ্যাল-টেক ব্যবহারে অদক্ষতার কারণে যে ড্রাফটিং বা কেস অ্যানালাইসিস আধুনিক এআই টুলের মাধ্যমে কয়েক মিনিটে সুচারুভাবে করা সম্ভব, সনাতনী ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তা করতে গিয়েই তরুণ আইনজীবীদের দিনের পর দিন বিপুল সময় ও শক্তি অপচয় হচ্ছে। টানা ১৩-১৪ ঘণ্টার এই ক্লান্তিহীন লড়াই কেবল তাঁদের কর্মক্ষমতাই নষ্ট করছে না, বরং মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে জেলা বার কিংবা সুপ্রিম কোর্টে অধিকাংশ তরুণ আইনজীবীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আরও রুঢ়। সেখানে বিদ্যমান ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ ব্যবস্থার তীব্র স্তরবিন্যাস, যেখানে বছরের পর বছর নামমাত্র বা প্রায় বিনাবেতনে জুনিয়র হিসেবে ফাইল টানা, হাজিরা দেওয়া বা ড্রাফটিংয়ের কাজ করে যেতে হয়। একে তো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও টিকে থাকার লড়াই, তার ওপর যোগ হয় এজলাসের উপচে পড়া ভিড়, মামলার দীর্ঘ জট, পেশাগত অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং আদালতের অবকাঠামোগত চরম সীমাবদ্ধতা। যে আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সেবার স্বপ্ন নিয়ে একজন তরুণ আইন পেশায় এসেছিলেন, দিনশেষে আদালতের টানাপোড়েনে সেই মূল্যবোধই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে।
‘দ্য হ্যাপি লয়ার’ গ্রন্থে লেখকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের সুখের প্রায় ৪০ শতাংশ নির্ভর করে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, পছন্দ ও সিদ্ধান্তের ওপর। পেশাগত ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে তৃপ্তি বজায় রাখার জন্য ছয়টি স্তম্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা, কাজের স্বাধীনতা (Autonomy), আত্ম-সততা (Authenticity), সুস্থ সামাজিক যোগাযোগ, কাজের দক্ষতা এবং আত্মমর্যাদা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও এই সূত্রগুলো গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, জুনিয়র আইনজীবীদের জন্য শুধুমাত্র অন্ধভাবে সিনিয়রের মর্জির ওপর নির্ভর না করে কাজের নিজস্ব ক্ষেত্র (Niche) তৈরি করা প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক অর্থ উপার্জনের চেয়ে যদি নিজের কাজের দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান ও ক্লায়েন্টের প্রতি আস্থার সম্পর্ক গড়ায় নজর দেওয়া যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা আত্মমর্যাদা ও আর্থিক স্বস্তি দুটোই নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়ত, আইনজীবী মানেই যে নিজেকে পরিবার ও সামাজিক জীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে সার্বক্ষণিক মামলার ফাইলে ডুবে থাকতে হবে-এই অসুস্থ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।একই সাথে দেশের সিনিয়র আইনজীবী ও বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর নেতৃত্বের দিক থেকেও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। জুনিয়রদের কেবল সস্তা শ্রমের মাধ্যম না ভেবে তাঁদের জন্য উপযুক্ত কাজের পরিবেশ, সম্মানজনক পেশাগত ভাতা এবং মেন্টরশিপের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন অনুষদ ও বার কাউন্সিলে প্রচলিত শিক্ষার সাথে ক্লায়েন্ট কাউন্সেলিং, পেশাগত নীতি, লিগ্যাল এআই টুলসের প্রায়োগিক ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তিকে আপন করে নিলে কাজের গতি যেমন বাড়বে, তেমনই অযথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিরিক্ত খাটুনি কমে গিয়ে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের চমৎকার ভারসাম্য তৈরি হবে।আইন পেশা কোনো বন্দিশালা নয়; এটি সমাজে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি ব্যক্তিমানুষটির ভেতরের আনন্দ, মানবিক মূল্যবোধ ও পরিবারই ধ্বংস হয়ে যায়, তবে সেই সাফল্যের মূল্য কোথায়? ‘দ্য হ্যাপি লয়ার’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন তুখোড় ও বিজয়ী আইনজীবী হওয়ার চেয়েও বড় সার্থকতা হলো একজন পূর্ণাঙ্গ ও সুখী মানুষ হিসেবে বাঁচা। ক্যারিয়ারকে জীবনের একমাত্র সত্তা না বানিয়ে, জীবনেরই একটি সুন্দর অংশ করে তোলার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে পেশাগত জীবনের আসল মুক্তি।
- মো. হায়দার তানভীরুজ্জামান,
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

