দেশের সাংবিধানিক যাত্রা বারবার বিশ্বাসঘাতকতা, আপস ও সীমালঙ্ঘনের সাক্ষী হয়েছে। বিশেষ করে, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে একে অপরকে দুর্বল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। এটি ক্ষমতার এক শূন্য-অঙ্কের খেলা, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধা প্রাধান্য পাচ্ছে।

বিচার বিভাগের দায়-
বিচার বিভাগকে তার বর্তমান দুরবস্থার জন্য অনেকেই দায়ী করছেন। এর পেছনে তিনটি মূল কারণ উঠে এসেছে: অদক্ষতা, অনৈক্য ও অতিরঞ্জন।
অদক্ষতা:
বিচার ব্যবস্থার ধীর গতি, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় ও উচ্চ ব্যয় বিচার বিভাগের অদক্ষতার প্রমাণ দেয়। বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
আইনি ব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্য শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; বরং একটি সুসংহত সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থের কারণে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়িত হয়নি।
অনৈক্য:
বিচার বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে বিভাজনের শিকার। সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং মতানৈক্য বিচার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে।
দেশের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ভারত, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুরোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর বিচার বিভাগও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছে। কিন্তু সেসব দেশে সাংবিধানিক কাঠামো শক্তিশালী থাকায় সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আমাদের বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও সাহসী ও নীতিবান বিচারকদের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অতিরঞ্জন:
বিচার বিভাগের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, কখনো প্রশাসনিক কার্যক্রমে অপ্রত্যাশিত প্রবেশ এবং কখনো রাজনৈতিক ইস্যুতে অতিসক্রিয়তা তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অতীতে কিছু বিচারক স্বেচ্ছাচারিতা দেখিয়েছেন, যা তাদের নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বর্তমানেও এমনটাই ঘটছে।
তবে শুধু বিচার বিভাগের ওপর দোষ চাপিয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করেছে।
নিষ্কর্ষ-
বর্তমানে বিচার বিভাগ সাংবিধানিক ভারসাম্যের সংকটের মুখোমুখি। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চাহিদা হলো ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি হুমকির মুখে। বিচার বিভাগের একমাত্র শক্তি তার নৈতিক কর্তৃত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে, এই নৈতিক শক্তিই কি বিচার বিভাগকে টিকিয়ে রাখতে পারবে?
লেখক– আইনজীবী; shahabusto@hotmail.com সূত্র: DAWN. ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

