শিশুদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা মানবসভ্যতার অন্যতম মৌলিক বিষয়। বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনিয়াছে। একসময় নানা প্রাণঘাতী রোগে শিশু মৃত্যুহার ছিল উদ্বেগজনক। সরকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলির সমন্বিত প্রচেষ্টায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলাইয়াছে; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ৩০টি জেলায় টিকাসংকটের যেই চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে- তাহা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, টিকাসংকটের কারণে শিশুদের মধ্যে মারাত্মক সংক্রামক রোগ পুনরায় ছড়াইবার আশঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশে হাম, পোলিও, ধনুষ্টংকারের মতো প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে সফল টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হইয়াছে। ১৯৭৯ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চালু হইবার পর হইতে দেশে শিশুদের জীবনরক্ষা কার্যক্রম এক অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করিয়াছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বলিয়া থাকেন, টিকাদান কার্যক্রমের পূর্বে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লক্ষ শিশু ছয়টি প্রধান সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুবরণ করিত; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিতেছে, টিকার সংকট চলমান থাকিলে এই অর্জন বিপন্ন হইতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ হইতে বলা হইয়াছে যে, টিকার সংকট হইবার কারণ নাই বরং সরবরাহ কিছুটা বিলম্বিত হইয়াছে। তবে বাস্তব চিত্র বলিতেছে, অনেক জেলায় গত জানুয়ারি মাস হইতে টিকার ঘাটতি চলিতেছে।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, যশোর, ঝিনাইদহসহ ৩০টির অধিক জেলায় পিসিভি, আইপিভি, পেন্টাভ্যালেন্ট, এমআরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিকার ঘাটতি লক্ষ করা গিয়াছে। অনেক অভিভাবক বারবার টিকাকেন্দ্রে গিয়া ব্যর্থ হইয়াছেন, ফলে শিশুরা নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাইবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার সংকটের তিনটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। প্রথমত: সরকারি অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাস্তবায়নে বিলম্ব হইয়াছে, যাহার ফলে টিকা ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিয়াছে। দ্বিতীয়ত: টিকা পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন ও লোকবলের অভাব রহিয়াছে, যাহার ফলে সময়মতো টিকা বিতরণ সম্ভব হইতেছে না। তৃতীয়ত: গ্যাভি এবং কোভ্যাকসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় টিকার সরবরাহ কমিয়া গিয়াছে, ফলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয়সংখ্যক টিকা সংগ্রহ করিতে পারিতেছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা বা অনিয়ম অনেক সংক্রামক রোগের পুনরুত্থানের কারণ হইতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা দেখাইতেছে যে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে টিকা প্রদানে ব্যত্যয় ঘটিলে সেইখানে নানা রোগের প্রকোপ বাড়িয়া যায়। চট্টগ্রামে পূর্বে হামের টিকা যথাসময়ে না দেওয়ায় শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছিল। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ডিপথেরিয়ার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছিল, কারণ তাহাদের মিয়ানমারে থাকাকালীন সময়ে টিকা প্রদান করা হয় নাই। অতএব বাংলাদেশে টিকাসংকট চলিতে থাকিলে সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান ঘটিতে পারে- যাহা শুধু শিশুদের জন্য নহে বরং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি।
এই সংকটের পেছনে যেই সকল কারণ বিদ্যমান, তাহার মধ্যে অন্যতম হইল টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকা, অর্থ বরাদ্দের দেরি এবং ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি। বাংলাদেশ সরকার কিছু টিকা নিজের অর্থায়নে সংগ্রহ করিলেও অনেক টিকা আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাভি নামক সংস্থা শিশুদের জন্য যে টিকা সরবরাহ করে, তাহা চাহিদার তুলনায় কম থাকায় সারা দেশে টিকার সংকট চলমান।
সুতরাং সরকারের উচিত- অবিলম্বে টিকাসংকট নিরসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। জরুরি ভিত্তিতে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহে টিকার মজুত পর্যবেক্ষণ করা আবশ্যক। ইপিআই কর্মসূচি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এক গৌরবময় সাফল্য, ইহা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। যেহেতু শিশুরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সেই জন্য তাহাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জাতির নৈতিক দায়িত্ব। সূত্র: ইত্তেফাক

