গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে ধীরে ধীরে সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির বিস্তৃতি ঘটেছে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) এই ধরনের কর্মসূচিকে নীতিগতভাবে সমর্থন করে বলে দাবি করে।
২০০৮ সালে পিপিপি-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা কর্মসূচি হিসেবে চালু করে ‘বেনজির ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম (বিআইএসপি)’। ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি কৃষকদের জন্য ভর্তুকি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তিসহ নতুন কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দেয়। এছাড়া সিন্ধু সরকার বিশ্বব্যাংক-সহায়িত ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড সাপোর্ট প্রোগ্রাম’ চালু করেছে, যেখানে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও মায়েদের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের শর্তে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।
এই ধরনের কর্মসূচির বিস্তৃতি বিশ্বব্যাপী একটি ইতিবাচক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ১২০টি উন্নয়নশীল দেশ প্রায় ২৫০ কোটি মানুষের জন্য নগদ সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
তবে এসব কর্মসূচির সম্প্রসারণের পেছনে থাকা নীতিগত উদ্দেশ্য এবং প্রভাব নিয়ে কিছু সতর্কতা রয়েছে। অনেক সরকারই জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে নগদ অর্থ বিতরণে মনোনিবেশ করছে। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও সাশ্রয়ী জনসেবাগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে।
আরেকটি উদ্বেগ হলো, নগদ সহায়তা কর্মসূচি নাগরিকদের মধ্যে নির্ভরশীলতার মনোভাব তৈরি করতে পারে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা বিস্তারের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। ভারতের প্রসঙ্গে উন্নয়ন বিশ্লেষক ইয়ামিনি আইয়ার এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের সহায়তা নাগরিকদের সক্রিয় অধিকার দাবি করার জায়গা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় দান গ্রহণকারী বানিয়ে ফেলে।
এই সমস্যাগুলোর সমাধানে ‘অধিকারভিত্তিক আইন’ অনুসারে সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের আইন নাগরিকদের তাদের অধিকার হিসেবে সেবা দাবি করতে সক্ষম করে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে এসব কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগও দেয়, যাতে তারা যৌথভাবে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।
দুঃখজনকভাবে, সিন্ধুতে বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো ‘অধিকারভিত্তিক প্রাপ্তি’ হিসেবে কার্যকর হয়নি। ২০১৮ সালে গৃহভিত্তিক নারী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় একটি আইন পাস করা হলেও, বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগ দেখা যায়নি। একইভাবে ২০১৯ সালে কৃষি খাতে কর্মরত নারীদের সুরক্ষা দিতে ‘সিন্ধ অ্যাগ্রিকালচারাল উইমেন ওয়ার্কার্স অ্যাক্ট’ পাস করা হলেও- নারী শ্রমিকদের নিবন্ধন, ইউনিয়ন গঠন ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
প্রজনন ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রেও সরকার দ্বৈত নীতি অনুসরণ করছে। ২০১৯ সালে পাস হওয়া ‘সিন্ধ রিপ্রোডাকটিভ হেলথকেয়ার রাইটস অ্যাক্ট’ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, কোনো কার্যপ্রণালী বা পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়নি। যদিও মাদার অ্যান্ড চাইল্ড সাপোর্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে কিছুটা সাড়া মিলছে, তা দীর্ঘমেয়াদি ও সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গঠনের বিকল্প হতে পারে না।
নগদ সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাত্ত্বিকভাবে সহজ হলেও- অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। লিগ্যাল এইড সোসাইটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিআইএসপি বাস্তবায়নে নানা রকমের অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে।
অনেক নারী অভিযোগ করেন, অর্থ গ্রহণের অভিজ্ঞতা তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর ও অসম্মানজনক। তদ্ব্যতীত, সুশৃঙ্খল অর্থ বিতরণ না থাকায় তারা অসহায় হয়ে পড়েন এবং তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, যারা প্রাপকের অর্থ থেকে অংশ কেটে নেয়।
যদি পিপিপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়, তবে তাদের সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সিন্ধু সরকারকে নগদ সহায়তা কর্মসূচিকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে না দেখে সেবাদান ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- পাস করা আইনগুলোকে ধুলায় ঢেকে ফেলে না রেখে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে- যাতে নাগরিকরা নিজেদের অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
- লেখক- মালকানি সারা; আইনজীবী। সূত্র: DAWN. ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

