গাজা সংকট ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ক্রমেই জটিল ও দ্ব্যর্থপূর্ণ রূপ নিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের গণহারে উচ্ছেদের পক্ষে সরব, অন্যদিকে গোপনে হামাসের সঙ্গে যোগাযোগে লিপ্ত হচ্ছেন তার বিশেষ দূত।
গত সপ্তাহে গাজার জনগণের প্রতি সরাসরি হুমকি দেন ট্রাম্প। ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি না দিলে গাজাবাসীরা “মৃত” হবে- এমন ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ছড়ায়। যদিও গাজার জনসংখ্যার এই বিষয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তবু প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য সরাসরি গণহত্যার ইঙ্গিত বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
এই অবস্থানে আরো বিশ্বাস জোগাতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে অতিরিক্ত ৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুততর করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ২০০০ পাউন্ড ওজনের বোমা- যা ইতোমধ্যেই গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছে।
একই সময়ে হোয়াইট হাউস ইসরায়েলের অবরোধকে পুনরায় সমর্থন করেছে। যার ফলে খাদ্য, পানি এবং জ্বালানির প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। বিশ্লেষকরা এটিকে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ মিত্র অ্যাডাম বোহলারকে মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ দূত হিসেবে পাঠান। তাকে অনুমতি দেওয়া হয় হামাসের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের- যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জানা যায়, ইসরায়েলের অজান্তেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সিএনএনের প্রতিবেদন মতে এক সাক্ষাৎকারে বোহলার বলেন, তাদের মাথা থেকে শিং বের হচ্ছে না। তারা আমাদের মতোই মানুষ- ভালো ছেলেরা। এ ধরনের মন্তব্য ইসরায়েলে ক্ষোভ তৈরি করলেও, ট্রাম্পের ভয়ে মুখ খুলছে না কেউ।
বোহলার আরো জানান, হামাস পাঁচ থেকে দশ বছরের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে, সেই সঙ্গে গাজায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছাড়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি এটিকে “খারাপ প্রস্তাব নয়” বলে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ট্রাম্পের আরেক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বর্তমানে দোহায় অবস্থান করছেন, যেখানে তিনি গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। আলোচনা সফল হলে ইসরায়েলি বাহিনীকে গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং তৃতীয় ধাপে ছিটমহলের পুনর্গঠনের পথ খুলে যাবে।
তবে ইসরায়েল এই প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপ মানতে নারাজ। তারা বন্দী বিনিময়ের পরই হামলা চালাতে স্বাধীন হতে চায়- এই সন্দেহ স্পষ্ট।
উইটকফ জানান, হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি হলে আলোচনার দরজা খোলা থাকবে। বোহলারও বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের এজেন্ট নয়”- যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, অতীতের মতো এবারও আমেরিকা নিজেই দ্বৈত ভূমিকা পালন করছে।
এদিকে, গাজায় ইসরায়েলের অভিযানের সমালোচনা করায় যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হচ্ছেন শিক্ষার্থী ও ভিসাধারীরা। সম্প্রতি, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ, ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে তিনি “হামাস-সম্পৃক্ত কার্যকলাপে” যুক্ত ছিলেন- যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এটাই “প্রথম গ্রেপ্তার” এবং “সন্ত্রাসবাদী বা ইসরায়েলবিরোধী কার্যকলাপে” জড়িতদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে।
এই অবস্থানের অংশ হিসেবে, হোয়াইট হাউস প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের সরকারি অনুদান বাতিল করেছে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, “ইহুদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার” অভিযোগে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও নতিস্বীকার করে জানায়, বিক্ষোভকারী ছাত্রদের বহিষ্কার ও ডিগ্রি বাতিল করা হবে।
একই ধরনের সতর্কতা পাঠানো হয়েছে আরও ৬০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে- যারা ইসরায়েলের সমালোচনাকে সহ্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই দ্বিমুখী অবস্থান কেবল বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করছে না বরং এটি একটি সচেতন কৌশলের অংশ। জাতিসংঘের অধিকৃত অঞ্চলবিষয়ক বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ একে ‘চিত্রনাট্য নিয়ন্ত্রণের’ কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষায়, প্রতিদিন বিভ্রান্তিকর বাগাড়ম্বর ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিশ্বকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে।
এই কৌশল ইউক্রেন সংকটেও স্পষ্ট। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভের প্রতি সমর্থন দেখায়, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইউক্রেনের নেতাদের প্রকাশ্যে অপমানও করছে।
গাজার প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধানধারার সংবাদমাধ্যমও নীরবতা বা বিকৃত প্রতিবেদন দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ট্রাম্প যখন গাজাবাসীকে সরাসরি গণহত্যার হুমকি দেন, তখন অনেক সংবাদমাধ্যম দাবি করে বসে- তিনি কেবল হামাস নেতৃত্বকে লক্ষ্য করেই কথা বলছেন।
এই ধারা নতুন নয়। বাইডেন প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর গণমাধ্যম বেশি সমালোচনা করেছে ‘যুদ্ধের অবসান’-এর জন্য, ২০ বছরের ধ্বংসযজ্ঞ নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে পশ্চিমা ঐতিহ্যবাহী নীতিকেই অনুসরণ করছে- যেখানে ফিলিস্তিনিদের চিরকাল অবৈধতার ফাঁদে আটকে রাখা হয়। সশস্ত্র প্রতিরোধ করলে তারা সন্ত্রাসী, না করলে তাদের সংগ্রাম অস্বীকার করা হয়।
হামাসের নিরস্ত্রীকরণের দাবিকে কেন্দ্র করেই ‘শান্তি আলোচনা’ এগোতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু গাজা থেকে জাতিগত নির্মূলনের মুখে কোনো প্রতিরোধের পথ খোলা নেই বলেই মনে করছে ফিলিস্তিনি জনগণ।
ট্রাম্প প্রশাসনের জটিল, দ্বৈতমুখী এবং আগ্রাসী এই কূটনীতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়ের প্রশ্ন আর কতটা গুরুত্ব পাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
- সূত্র: Middle East Eye. ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

