দেখা যায়, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইন্দ্রপ্রস্থ ইনস্টিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি, দিল্লি (IIIT-Delhi) তার পিএইচডি ফেলোশিপ বাড়িয়ে প্রতি মাসে ৬০,০০০ রুপি করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৩,০০০ টাকার সমান এবং এটি ভারতের সর্বোচ্চ পিএইচডি ফেলোশিপ। এর আগে এটি ছিল ৫০,০০০ রুপি ও এই বৃদ্ধি ভারতের গবেষণা এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়াও IIIT-Delhi-র পিএইচডি ছাত্রদের স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টও প্রদান করা হয়, যা তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করছে।
তবে ভারতের গবেষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা এখানেই শেষ নয়। তাদেরকে আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে ভ্রমণের জন্য ১,৫০,০০০ রুপি প্রদান করা হয়, যা গবেষকদের বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা অর্জন এবং শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের সাথে সহযোগিতা করার সুযোগ করে দেয়। আরো একটি পেশাদার উন্নয়ন ভাতা (PDA) ২,৫০,০০০ রুপি বরাদ্দ করা হয়, যা গবেষকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, যাতে তারা তাদের কাজকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করতে পারে। গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি গবেষণা কন্টিনজেন্সি গ্রান্ট এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য এককালীন ল্যাপটপ গ্রান্টও রয়েছে। এছাড়াও ভারতীয় প্রতিষ্টিত আইআইটি, আইআইএসসি এবং আইআইইআর-এ নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ রুপি পর্যন্ত গবেষণা স্টার্টআপ ফান্ড পেয়ে থাকেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫-৪০ লাখ টাকার সমান।
অন্যদিকে বাংলাদেশে পিএইচডি ছাত্রদের জন্য কত টাকা দেওয়া হয়? অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রতি মাসে ১৫,০০০-২৫,০০০ টাকা প্রদান করে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (NSTU) সর্বোচ্চ পিএইচডি ফেলোশিপ ৪০,০০০ টাকা ঘোষণা করেছে, যা ভারতের পিএইচডি ছাত্রদের তুলনায় অর্ধেক। একদিকে বাংলাদেশের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসে প্রায় ৩৫,০০০ টাকা এবং একজন সহযোগী অধ্যাপক প্রায় ৮০,০০০ টাকা উপার্জন করেন। এর মানে হলো, ভারতীয় একটি পিএইচডি ছাত্র এখন বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে বেশি আয় করছেন।
বাংলাদেশে পিএইচডি ছাত্রদের ১৫,০০০-২৫,০০০ টাকা মাসিক সহায়তা দেওয়া নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উঠছে, যা দেশের বৃহত্তর একাডেমিক বেতন কাঠামোর দুর্বলতাকেও ইঙ্গিত করছে। বর্তমান বেতন কাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের একাডেমিক যোগ্যতা ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করছে না, যার ফলে শিক্ষক মহলে হতাশা এবং অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে।
২০,০০০-৫০,০০০ টাকা বেতন পিএইচডি ছাত্রদের জন্য যথেষ্ট নয়, যা তাদের উচ্চমানের গবেষণা বা আন্তর্জাতিক মানের উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে সক্ষম নয়। ভারতের ৬০,০০০ রুপি বেতনের ক্রয়শক্তি বাংলাদেশে ১,০০,০০০ টাকারও বেশি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের একজন অধ্যাপক- যিনি পিএইচডি করছেন, গবেষণা করছেন এবং শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিচ্ছেন- মাসে প্রায় ১,০০,০০০ টাকা উপার্জন করেন। ভারতীয় একটি পোস্টডক্টরাল ফেলো বাংলাদেশের একজন অধ্যাপকের থেকেও বেশি উপার্জন করছেন, ক্রয়শক্তি সমন্বয় না করেই।
বাংলাদেশ কিভাবে আশা করতে পারে যে, তার শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলি দেশে থাকবে এমন পরিস্থিতিতে? কম বেতন শিক্ষকদেরকে একাধিক পার্টটাইম কাজ করতে বাধ্য করে, যা তাদের গবেষণা এবং শিক্ষাদানের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা তাদের আয় বাড়ানোর জন্য পার্টটাইম কাজ বা পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। কেউ ঢাকার যানজট এবং অতিরিক্ত কাজ মেনে নেবেন না, যদি না তাদের অন্য কোনো বিকল্প না থাকে।
এছাড়াও অপ্রতুল বেতন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে অস্বচ্ছলতা বা অনৈতিক কার্যকলাপের প্রসার ঘটতে পারে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগের পূর্ণ অভাব একটি উদ্বেগজনক বিষয়। ঢাকার মতো প্রতিষ্ঠানেও পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই, যা আজকের একাডেমিক দুনিয়ায় অবিশ্বাস্য। এমন সুযোগের অভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশ থেকে উচ্চমানের গবেষকদের আকর্ষণ করতে এবং স্বদেশী মেধাবীদের ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। প্রতিযোগিতামূলক ফেলোশিপ সিস্টেম নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি, যা গবেষণা ক্ষেত্র এবং শীর্ষ গবেষকদের জন্য দরকার।
শিক্ষায় বিনিয়োগ করা মানে দেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করা এবং প্রতিযোগিতামূলক বেতন ছাড়া দেশের একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক স্তরে টিকে থাকতে হবে না।
বাংলাদেশ যদি উচ্চমানের গবেষণা এবং বিশ্বমানের পিএইচডি প্রোগ্রাম তৈরি করতে আগ্রহী হয়, তবে এটি এমন প্রতিযোগিতামূলক ফেলোশিপ প্রদান করতে হবে যা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের আকৃষ্ট করবে। পিএইচডি ফেলোশিপ কমপক্ষে ৭০,০০০-৮০,০০০ টাকা প্রতি মাসে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে গবেষণায় পুরোপুরি নিবেদিত থাকা সম্ভব হয়। পাশাপাশি পোস্টডক্টরাল ফেলোদের জন্য কমপক্ষে ১,০০,০০০ টাকা এবং পিএইচডি ধরা একজন সহকারী অধ্যাপককে ১,২০,০০০ টাকার কম বেতন দেওয়া উচিত। এছাড়া একজন পূর্ণ অধ্যাপককে ৩,০০,০০০ টাকার কম বেতন দেওয়া উচিত, কারণ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে এই পরিমাণ বেতন প্রদান করছে। সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনের মধ্যে বৈষম্য অযৌক্তিক এবং তা ত্বরিতভাবে নির্মূল করতে হবে।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা জন্য একটি আলাদা এবং সুসংগঠিত বেতন স্কেল প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এটি না করলে, দেশটি মেধা-বিদ্বেষ, গবেষণার মানে পতন এবং উচ্চশিক্ষায় স্থবিরতা অব্যাহত রাখবে। এই সমস্যা চিহ্নিত করা ও এর সমাধান করা একাডেমিয়ার ভবিষ্যৎ এবং দেশের সামগ্রিক উন্নতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিভার্স ব্রেইন ড্রেনের ব্যাপারটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় একাডেমিকরা দেশে ফিরে আসছেন, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রিভার্স ব্রেইন ড্রেনের ট্রেন্ডের অংশ। বেশ কিছু শীর্ষ ভারতীয় বিজ্ঞানী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পদগুলি ছেড়ে ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে যোগ দিয়েছেন। এটি একটি চিহ্ন যে, দেশগুলো প্রকৃত অর্থে তাদের নিজস্ব মেধাবী প্রবাসী সম্প্রদায়কে আকর্ষণ করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।
এখন কল্পনা করুন যদি বাংলাদেশি একজন গবেষক প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশে ফিরে আসেন। সম্ভাব্য ফলাফল কী হবে? তার গবেষণা ক্যারিয়ার নিঃশেষ হয়ে যাবে। হয়তো তিনি কোনো পজিশনও পাবেন না এবং যদি পানও- তবে তাকে গবেষণার জন্য তেমন কোনো অর্থ সাহায্য পাওয়া যাবে না, যার কারণে উচ্চ-স্তরের গবেষণা করা বা পিএইচডি এবং পোস্টডক্টোরাল ফেলোদের পরামর্শ দেয়া সম্ভব হবে না। এই হতাশাজনক বাস্তবতা বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থা এবং বেতন কাঠামোর সংস্কারের তাগিদ তুলে ধরে।
যদি বাংলাদেশ সত্যিই উন্নতির জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, তবে এখনই উচ্চশিক্ষা, গবেষণার তহবিল বৃদ্ধি এবং একাডেমিক ক্যারিয়ার একটি টেকসই পথে পরিণত করার মাধ্যমে কাজ করতে হবে।
- ড. কামরুল হাসান মামুন
ফিজিক্স বিভাগের অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: khassan@du.ac.bd // সূত্র: ডেইলি স্টার

