গতকাল শুক্রবার, ২৮ মার্চ, মিয়ানমারে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.৭, এবং ১২ মিনিটের মধ্যে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ছিল ৬.৪। এই দুটি ভূমিকম্প মিয়ানমারের মান্দালয়ের সাগাইং শহরের কাছাকাছি অঞ্চলে উৎপত্তি হয়েছিল। এটি একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে, যা ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোন’ নামে পরিচিত। এই সাবডাকশন জোনটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ থেকে শুরু করে মিয়ানমার, ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল এবং আন্দামান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই অঞ্চলে ১৮৫ বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৩৯ সালে ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্প ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্থান থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরে ব্যাংকক শহরের বহু তলা ভবন এবং বিভিন্ন রাস্তা ও অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। মিয়ানমারে, বিশেষত সাগাইং অঞ্চলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভূমিকম্পের ফলে চীন ও ভারতের বিহার অংশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।
এ ধরনের ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় সাবডাকশন জোনে, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের দিকে ধাক্কা দেয় এবং একটির নিচে অন্যটি তলিয়ে যায়। এই ধরনের ভূমিকম্প ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী হয়, এবং এর প্রভাব বিস্তৃত হয় অনেক দূর পর্যন্ত। ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ জোন রয়েছে: লকড জোন এবং স্লো-স্লিপ জোন। লকড জোন এমন একটি স্থান যেখানে ভূমিকম্পের শক্তি সঞ্চিত থাকে এবং তা একসময় খুব বড় আঘাত হিসেবে প্রকাশ পায়। এটি বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে বা সাবডাকশন জোনের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এখানে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, যেটি একটি বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, গতকাল যে ভূমিকম্প ঘটেছে, তা ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনের মধ্যে হলেও, এটি আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের লকড জোনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তবুও, এই ভূমিকম্পের প্রভাব থেকে একটি বড় সতর্কতামূলক বার্তা আসে, কারণ এটি আমাদের অঞ্চলের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার শক্তির সঞ্চয়ের ওপর আরও চাপ ফেলতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের ভূমিকম্পের মোকাবিলা কিভাবে করা যাবে? আমাদের ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ তৈরি করতে পারে। সুতরাং, এখনই সময় প্রস্তুতি নেওয়ার। এই প্রস্তুতি হতে হবে স্বল্প, মধ্য, ও দীর্ঘমেয়াদি। জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করা, তাদের প্রশিক্ষিত করা এবং নিয়মিত মহড়া আয়োজনের মাধ্যমে, বিপদ মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
এছাড়া, আমাদের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও উন্নতি করতে হবে। বিশেষ করে, যে অঞ্চলে লকড জোন রয়েছে, সেখানে ভূমিকম্পের শক্তি সঞ্চিত হওয়ার ফলে, যে কোনো সময় বড় আঘাতের আশঙ্কা থাকতে পারে। এই বিপদ মোকাবিলায় যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বিকল্প নেই।
তাহলে, যদিও গতকালকের ভূমিকম্প আমাদের এলাকায় হয়নি, তবে এর মাধ্যমে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়। আমরা যদি সময়মতো প্রস্তুতি নি, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব হবে

