“স্লামডগ মিলিয়নিয়ার” সিনেমার কথা কি আপনার মনে আছে? সিনেমাটির মূল গল্প ছিল একটি দরিদ্র কিশোরের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াই নিয়ে। কিন্তু গল্পের এক অংশ ছিল এমন, যা হৃদয়ে বিঁধে থাকে—শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার নির্মম বাস্তবতা। জামাল মালিক, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দেব প্যাটেল, মায়ের মৃত্যু এবং জীবনের এক নির্মম অধ্যায় পার করে রাস্তার জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়। সেখানে সে এবং তার ভাই এক গ্যাংস্টারের হাতে পড়ে, যে শিশুদের শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দেয় যাতে তারা ভিক্ষা করতে আরও বেশি উপযোগী হয়। এই শিশুদের সংগ্রহ করা অর্থ তাদের হাতে থাকত না।
কিন্তু সিনেমার সেই নির্মম চিত্র কোনো কল্পকাহিনি নয়। দক্ষিণ এশিয়ার হাজার হাজার শিশু প্রতিদিন এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যায়। আমাদের শহরের ব্যস্ত সড়কে, ফেরিঘাটে কিংবা মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যেসব শিশুর দিকে আমরা অবহেলার দৃষ্টিতে তাকাই, তাদের অনেকে এ ধরনের অমানবিক নির্যাতনের শিকার।
মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা—খুলনার রূপসা ফেরিঘাটে ছয় বছরের একটি শিশুকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এক পুরুষ ভিক্ষুকের পাশে। শিশুটির আঙুল ভেঙে ফেলা হয়েছিল, নির্যাতন করা হয়েছিল, যাতে তার প্রতি সহানুভূতি জাগিয়ে বেশি ভিক্ষা তোলা যায়। ছয় মাস আগে তার নিজের বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর এই অবর্ণনীয় নির্যাতনের মধ্যে তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
প্রশ্ন হলো, আমাদের সমাজ আর কত শিশুদের এমনভাবে ভেঙে গড়বে, আর কতদিন চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আমরা নীরবে মেনে নেব? দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শিশুদের অপহরণ করে পাচার করা হয়, পঙ্গু করা হয়, মাদক খাইয়ে ভিক্ষায় নামানো হয়। আর এ থেকে লাভবান হয় একটি সুসংগঠিত অপরাধী চক্র। আমাদের অনেকে হয়তো ভাবি, শিশুটির দুঃখ লাঘব করতে কয়েকটা টাকা দিলাম। কিন্তু জানি না, সেই টাকা দিয়ে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে এক নির্মম শোষণ ব্যবস্থাকে।
এই অবস্থা চলতে থাকার পিছনে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ—প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং আমাদের সামাজিক উদাসীনতা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনেক সময় অদক্ষ, আবার অনেক সময় দুর্নীতিতে জড়িত। অপরাধী চক্রগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় কাজ করে। অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে রাখেন। সমাজও সহজেই ভিখারি শিশুদের দুঃখজনক পরিণতি বলে মেনে নেয়, গভীরে না গিয়ে বুঝতে চায় না তারা আসলে অপরাধের শিকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধকে ব্যবহার করে এই অপরাধীরা তাদের ফাঁদ বিস্তার করে। দানের মহত্ত্বের সুযোগ নিয়ে মসজিদ, মন্দির, বা গাড়ির জানালার কাছে শিশুদের সাজিয়ে রাখা হয়। তাদেরকে কোমায় থাকা অবস্থায় মাদক খাইয়ে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো হয়, যেন সহানুভূতির জোয়ার উঠে। সাধারণ মানুষ দানের মাধ্যমে মনে করে পুণ্য অর্জন করছে, অথচ না জেনে অমানবিক একটি অপরাধকে মদত দিয়ে ফেলছে।
বাংলাদেশে “মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন” আছে, ভারতে আছে “জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট”, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাতেও শিশু সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, আইন থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, ভুক্তভোগী শিশুরা হারিয়ে যায় প্রশাসনিক জটিলতার ভেতর, আর অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। কারণ আমাদের ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত, অবহেলাপূর্ণ এবং শিশুদের জীবনের প্রতি সংবেদনশীল নয়।
এই চিত্র পরিবর্তন করা একান্ত জরুরি। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শিশুরা যেখানে ভিক্ষা করছে, সেখানে প্রশাসনের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ জরুরি। তাদের উদ্ধার করে মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসা দিতে হবে। তাদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা শিক্ষা পেয়ে সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।
শিশু পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে একক দেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। আন্তঃদেশীয় গোয়েন্দা সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং সম্মিলিত অভিযান চালাতে হবে। আমরা যদি একত্রে কাজ না করি, তাহলে এই চক্র কখনও ভাঙা সম্ভব হবে না।
জনগণের মধ্যেও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের জানতে হবে যে, পথশিশুকে কয়েন দিলে তা হয়তো তার সমস্যা সমাধান করে না, বরং অপরাধীদের ব্যবসা আরো বড় করে তোলে। মানুষকে প্রশিক্ষিত করতে হবে কীভাবে শিশুপাচারের লক্ষণ বুঝবে, কোথায় রিপোর্ট করবে। চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কোনো সমাধান নয়।
আজ আমাদের প্রতিটি নির্যাতিত শিশুর জন্য, প্রতিটি ভাঙা স্বপ্নের জন্য দায়িত্ব নিতে হবে। মানবতা কেবল বক্তৃতায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। এই লড়াই কেবল দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে নয়, এটা আমাদের বিবেকের জন্য, আমাদের আত্মার জন্য। যদি এখনই না জাগি, তাহলে আমরাও সেই অপরাধীদের মতোই অপরাধী থেকে যাবো, যারা শিশুদের জীবন ধ্বংস করে নিজেদের লাভের খেলায় মত্ত। সূত্র- ডেইলি স্টার

