বাংলাদেশে একটি পণ্য আমদানির পর তা খালাস করতে যেখানে গড়ে সাত থেকে আট দিন সময় লেগে যায়, সেখানে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামে এই কাজ সম্পন্ন হয় মাত্র একদিনেই। এমন বৈসাদৃশ্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, বাংলাদেশে একটি পণ্য খালাস করতে প্রায় ১৭টি সংস্থার অনুমোদন ও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, শুল্ক বিভাগ, কাস্টমস, কেমিক্যাল পরীক্ষাগার, সিএন্ডএফ এজেন্ট, বন্দরের নানা দপ্তর এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। প্রতিটি ধাপে রয়েছে জটিল কাগজপত্র, অফলাইনে দৌড়ঝাঁপ এবং সময়ক্ষেপণ।
ভিয়েতনামের সাফল্যের গোপন রহস্য: ডিজিটাল কাস্টমস সিস্টেম
প্রশ্ন উঠতে পারে, ভিয়েতনাম কিভাবে মাত্র একদিনে পণ্য খালাস করছে?
এর পেছনে রয়েছে ভিয়েতনামের সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড কাস্টমস ব্যবস্থা — VNACCS/VCIS (Vietnam Automated Cargo Clearance System / Vietnam Customs Intelligence System)। জাপানের সহায়তায় ২০১৪ সালে চালু হওয়া এই ব্যবস্থা দেশটির বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে।
ভিয়েতনামে এখন যেসব সুবিধা মিলছে:
- আমদানি-রপ্তানির প্রায় সব প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হয়।
- একাধিক সংস্থা একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করে, সমন্বয় সহজ হয়।
- Green Channel ব্যবহারের ফলে কম ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন ছাড়াই খালাস হয়।
- Pre-Arrival Processing ব্যবস্থায় পণ্য পৌঁছানোর আগেই ডকুমেন্ট চেক ও প্রসেসিং শুরু হয়।
ফলে একদিনে পণ্য খালাস হওয়া এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তবতা।

বাংলাদেশে কেন এত ধাপ?
বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। প্রতিটি আমদানিকৃত পণ্য খালাসে অন্তত ১৫-১৭টি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধাপগুলো হলো:
- ব্যাংক: এলসি/টিটি নথি প্রস্তুত ও যাচাই
- বীমা কোম্পানি: ইন্স্যুরেন্স সার্টিফিকেট
- শুল্ক বিভাগ: কাস্টমস এসেসমেন্ট ও এইচএস কোড যাচাই
- বন্ড শাখা (যদি থাকে)
- ইন্সপেকশন এজেন্সি: প্রি-শিপমেন্ট ও ইম্পোর্ট ইন্সপেকশন
- কেমিক্যাল টেস্টিং: যদি প্রয়োজন হয়
- কৃষি, মৎস্য বা পশুসম্পদ বিভাগ
- সিএন্ডএফ এজেন্ট
- বন্দর কর্তৃপক্ষ: আনলোডিং, স্টোরেজ, পোর্ট এন্ট্রি
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, গাড়ি চালকের পরিচয় যাচাই ইত্যাদি
এছাড়াও রয়েছে ম্যানুয়াল গেট পাশ, ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন এবং ভেরিফিকেশন।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, এই সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনও সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নেই। প্রত্যেকটি কাজ করতে হয় একে একে, আলাদা আলাদা দপ্তরে ঘুরে। ফলত, একটি পণ্য খালাসে পুরো সপ্তাহ পার হয়ে যায়।
সমাধান কোন পথে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ না করা পর্যন্ত এই সময়ক্ষেপণ ও জটিলতা কমানো সম্ভব নয়। সমন্বিত একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, প্রি-প্রসেসিং সুবিধা এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে গ্রীন চ্যানেল চালু করা এখন সময়ের দাবি।
ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য হতে পারে একটি কার্যকর রোডম্যাপ — যদি আমরা সত্যিই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চাই।
(হাবিবুর রহমানের লিংকডইন প্রফাইল থেকে সংগৃহীত )

