এডওয়ার্ড সাঈদ (১৯৭৮) ও মিশেল ফুকো (১৯৭৫) যেমন দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায়ই ‘আমরা বনাম ওরা’ (Us vs Them) মডেলকে ব্যবহার করে বৈষম্যমূলক নীতিকে ন্যায়সঙ্গত করে তোলে এবং ক্ষমতার কাঠামোকে দৃঢ় করে। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বাস্তবতায় ভারতের ‘পুশ-ইন’ নীতি এই দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
সম্প্রতি বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমান, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক সীমান্ত অতিক্রম করানোর মাধ্যমে ভারত এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং হস্তক্ষেপহীনতার নীতির ওপর ভিত্তি করে গঠিত।
তবে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনাবিহীনভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের ঠেলে দেওয়া এই নীতিগত ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। চোখ বেঁধে, নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই, যেভাবে কথিত ’অবৈধ’ অনুপ্রবেশকারীদের বিশেষত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে, তা এক ধরনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিফলন।
এই মানুষদের অনেকেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম কিংবা রাজস্থানের নাগরিক, যাদের কাছে বৈধ ভোটার আইডি, আধার কার্ড এবং দীর্ঘদিনের বসবাসের প্রমাণ রয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও এই পুশ-ইনের শিকার হচ্ছেন। এই ধরনের আচরণ শুধু বেআইনি নয়, এটি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের অভ্যন্তরীণ সংকট এড়াতে একটি দুর্বল গোষ্ঠীকে ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের স্থানচ্যুত করে নিজেদের রাজনৈতিক দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। ভারতে এনআরসি ও সিএএ আইন পাশ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের মাধ্যমে এ ধরনের ‘অন্যকরণ’ এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং সাম্প্রতিক পুশ-ইন নীতি একটি ভয়াবহ নজির তৈরি করছে। মায়ানমার যেভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল, ভারতের বর্তমান নীতি সেই একই বিপজ্জনক ধারাকে অনুসরণ করছে। এর ফলে বাংলাদেশকে এখন রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি নতুন এক প্রকার উচ্ছেদ হওয়া জনগোষ্ঠীর চাপ সামলাতে হচ্ছে, যা সীমান্ত অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া এখনো সীমিত। এই সংকটে বাংলাদেশের করণীয় শুধু আত্মরক্ষা নয়, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। সীমান্তে নজরদারি জোরদার, অনুপ্রবেশকারীদের নিরপেক্ষ যাচাই, অবৈধ ভারতীয় শ্রমিকদের তালিকাভুক্তকরণ এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ যে কোনো রাজনৈতিক বলির পাঁঠা নয় এই বার্তা পরিষ্কারভাবে দিতে হবে এছাড়া এখন প্রয়োজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কূটনীতি, দৃঢ় অবস্থান এবং সাহসিকতা। অন্যথায় দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যা রাজনীতির চাপে বাংলাদেশই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় বলি।
লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ // সূত্র: যুগান্তর

