বাংলাদেশে আর যা কিছুরই অভাব থাক না কেন রাজনৈতিক দলের কোনো অভাব নেই। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলে শতাধিক রাজনৈতিক দল আছে। সব দলের নাম যেমন সবার জানা নেই, তেমনি সব দলের নেতাদের নামও বেশির ভাগ মানুষের কাছে অজানা। ছোট দেশ, কিন্তু মানুষের সংখ্যা অনেক। সব মানুষ আবার এক চিন্তার নয়। তাই ১৭-১৮ কোটি মানুষের দেশে রাজনৈতিক দল শতাধিক থাকতেই পারে। সব দলের নাম সবাই না জানলেও ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন জন্ম নেওয়া একটি দলের নাম এর মধ্যে অনেকেই জেনে গেছেন। দলটির নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।
মূলত জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একাংশ নিয়ে গঠিত এই দলটি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে কৌতূহল আছে, আলোচনা আছে, সমালোচনাও আছে। প্রচারেই প্রসার বলে একটি কথা আমাদের দেশে চালু আছে। এনসিপি নিয়ে যেহেতু প্রচার আছে, সেহেতু এর প্রসারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শাসক দল হওয়ার আশা নিয়েই দলটি যাত্রা শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে। এর আগে জন্ম নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে শাসক দল হওয়ার গৌরব অর্জন করার সৌভাগ্য হয়েছিল বিএনপি ও জাতীয় পার্টির। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান আর জাতীয় পার্টির জনক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দুজনই সামরিক বাহিনী থেকে রাজনীতিতে আসা মানুষ, সেনাশাসক হিসেবে পরিচিত।
প্রথমেই বলা দরকার, ৪০০ আসনের প্রস্তাব এখনো অনুমোদিত নয়, এটি রয়েছে কেবল কমিশনের সুপারিশ পর্যায়ে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে ৩০০টি সাধারণ এবং ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। এই কাঠামো পরিবর্তনের কোনো আইনি বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে একটি অনিবন্ধিত নবীন রাজনৈতিক দল যদি দাবি করে যে তারা ৪০০ আসনের মধ্যে ৩০০টি আসন পাবে, তাহলে তা কারও কাছে অবান্তর বলে বিবেচিত হতে পারে। যে দলের এখনো দেশজুড়ে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠেনি, মাঠপর্যায়ের তৎপরতা নগণ্য এবং এখনো কোনো নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি, সেই দলের একজন নেতার এমন উচ্চারণ বাত কা বাত ভাবার কোনো কারণ নেই। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ হলো ‘সব সম্ভবের দেশ’।
আগের নির্বাচনগুলোতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় যাওয়ার মতো অবস্থায় না থাকলেও এবার তারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার বাসনা নিয়েই রাজনীতির মাঠে আছে। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির ৩০০ আসনে জয়ী হওয়ার আশাকে নিছক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বললে ভুল হবে। এর ভেতর আরেকটি বার্তা নিহিত—এনসিপি নিজেকে শুধু একটি নতুন দল নয়, বরং বিকল্প সরকার হিসেবে ভাবছে। তারা হয়তো ধরেই নিচ্ছে যে আওয়ামী লীগ গত আগস্টে হঠাৎ ‘নাই’ হওয়া, জাতীয় পার্টির বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো- এই ফাঁকে তারা সেই ‘শূন্যস্থানে’ জায়গা করে নেবে। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন, বর্তমানে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় সবচেয়ে বড় দল বিএনপিকে কেন গণনার বাইরে রাখছে এনসিপি? বিএনপিকে দেখেও না দেখার কি কোনো বিশেষ মাজেজা আছে? অথচ লন্ডন বৈঠকে ইউনূস-তারেক সমঝোতার খুশির জোয়ারে ভাসছে বিএনপি।
এখানেই আরেকটি প্রশ্ন বড় হয়ে সামনে আসে- আগামী নির্বাচন কি তাহলে ১৯৭৯ বা ১৯৮৬ সালের মডেলে হতে যাচ্ছে? যেমন জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বিএনপিকে বিজয়ী করেছিলেন। এরশাদ তাঁর সময়েও একই কৌশলে জাতীয় পার্টিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন এবং নির্বাচনী বৈধতা নিশ্চিত করেছিলেন। এখন যদি ক্ষমতার আশপাশে অবস্থানরত কোনো মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় এনসিপি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কি তৃতীয় শক্তির নামান্তর? প্রশ্নগুলো অমূলক নয়। ইতিহাস বলছে- নতুন দল হঠাৎ করেই ২০০ বা ৩০০ আসন জেতার নজির কেবল স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরেই সংঘটিত হয়েছে।
এনসিপির বক্তব্যের আরও একটি দিক নজর কাড়ে- তাদের প্রতীকপ্রীতি। তারা নির্বাচন কমিশনে ‘শাপলা’ প্রতীক চেয়ে আবেদন করেছে। দলটির নেতারা বলছেন, শাপলা নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতীক, গ্রামীণ জনজীবনের প্রতিচ্ছবি এবং গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতীক। তাঁরা দাবি করেছেন, ‘জাতীয় প্রতীক হলেও আইনগতভাবে শাপলা গ্রহণে বাধা নেই।’ অথচ সংবিধান ও ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ১৩০ নম্বর আদেশ অনুযায়ী, শাপলা ফুল বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক। এই প্রতীকের কোনো অবমাননা, বিকৃতি বা রাজনৈতিক ব্যবহারে আইনি নিষেধ রয়েছে। আইনের ভাষায়, কেউ যদি জাতীয় প্রতীক অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এক বছরের জেল বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে এনসিপি যদি ‘শাপলা’ প্রতীক চায়, তাহলে তা সরাসরি জাতীয় প্রতীক ব্যবহারের চেষ্টার মধ্যে পড়ে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক শাহদীন মালিক স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘জাতীয় প্রতীক হিসেবে যেহেতু শাপলা আইন করে নির্ধারিত, সেহেতু রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে এর ব্যবহার বেআইনি।’ এনসিপির পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তি এসেছে- জাতীয় ফল কাঁঠাল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক, ধানের শীষও কোনো না কোনোভাবে জাতীয় পর্যায়ের প্রতীক। কিন্তু এখানে রয়েছে একটি বড় পার্থক্য। কাঁঠাল বা ধানের শীষ জাতীয় প্রতীক হলেও তা রাষ্ট্রীয় সিলমোহর নয়, কিন্তু শাপলা ফুল বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকের কেন্দ্রে রয়েছে- জাতীয় পতাকার পাশে এই প্রতীক ব্যবহৃত হয়, সরকারি দলিল ও কাগজপত্রে তার ছাপ থাকে। অতএব এর ব্যবহার একেবারে সীমিত, তা রাজনৈতিক প্রতীক হতে পারে না।
প্রসঙ্গত, নাগরিক ঐক্য নামক একটি ছোট দলও একই প্রতীক চেয়ে পায়নি। এখন যদি শাপলা প্রতীক এনসিপিকে দেওয়া হয়, তাহলে তা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে এবং সেটি অবৈধ ঘোষণা হলে নতুন করে বিতর্ক জন্ম নেবে। তবে এনসিপির নেতারা কৌশলগতভাবে বলছেন, ‘শাপলা না পেলে অন্য প্রতীক নেব, তবে শাপলাই আমাদের প্রধান পছন্দ।’ এর পেছনেও রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে। প্রতীকের মাধ্যমে গ্রামীণ ভোটারদের মনোযোগ পাওয়া সহজ। শাপলা ফুল প্রতীক হিসেবে পেলে রাজনৈতিকভাবে আবেগ তৈরি করতে পারে।
একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ- এনসিপি আসলে কারা? কারা এই দলটির পেছনে? এত আত্মবিশ্বাস, সংবাদমাধ্যমে এত সাড়া- এসব কি কেবল উৎসাহপ্রাপ্ত কিছু নাগরিকের উদ্যোগের ফল? নাকি এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক সুবিধাভোগীদের একাংশ বা এটা ক্ষমতার একাংশের কোনো বিশেষ প্রজেক্ট? বাংলাদেশে এমন ‘প্রজেক্ট দল’-এর অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তবে সব ‘প্রজেক্ট দল’ আবার সফল হয় না। অতীতেও দেখা গেছে, হঠাৎ তৈরি হওয়া দল কিছুদিন পরে হারিয়ে গেছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত বিকল্প শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণকারী দলও শেষ পর্যন্ত বড় দুই পুরোনো দলের সঙ্গে মিতালি করতে গিয়ে মরুপথে হারিয়েছে দিশা। জনগণ যদি প্রকৃত অর্থে বিকল্প রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে, তবে সেই দলকে অবশ্যই মাঠে, পাড়ায়, ইউনিয়নে, রাস্তায়, ক্যানভাসে প্রমাণ করতে হয়। কেবল টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিলে দল বড় হয় না।
এনসিপির এই আত্মবিশ্বাস যদি বাস্তব হয়, তাহলে তাকে মাঠে প্রমাণ দিতে হবে। যদি অলীক হয়, তবে সেটি জনতার চোখে ধরা পড়বে। দলটির পক্ষ থেকে যদি বলা হয়, ‘৩০০ আসন আমাদের ঘরে থাকবে’- তবে সেই ঘরের দরজা খুলে দেখতে হবে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে কী রসদ জমা আছে!
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় বা বিকল্প শক্তির প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি সেই শক্তির গ্রহণযোগ্যতা অর্জন একটি দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য যাত্রা। এনসিপি যদি সত্যিই জনগণের শক্তি হতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে বাস্তববাদী রাজনীতি, সক্রিয় সাংগঠনিক বিস্তার এবং স্বচ্ছ রাজনৈতিক নীতিমালা নিয়ে এগিয়ে আসা। বক্তৃতা আর প্রতীক দিয়ে রাজনীতি হয় না, লাগে ত্যাগ, লাগে পথচলা, লাগে জনগণের হৃদয় জয় করার সাহস। ৩০০ আসনের দাবি তখনই অর্থবহ হবে, যখন জনগণ সত্যি হাত তুলে এগিয়ে যাবে এনসিপির দিকে। আর যদি জনগণ না চায়, তবে হাজার বক্তব্য দিয়েও তা সম্ভব হবে না। কারণ প্রকৃত গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে জনগণ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা (সূত্র)

