দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো ধরনের চাপের মধ্যে নেই এবং স্বাধীনভাবেই কাজ করবে বলে জানিয়েছেন কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দুদকের কাজে সময় দেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, কাজ শুরু হলে কমিশনের অগ্রগতি সবাই দেখতে পারবেন।
বুধবার দুদকের প্রথম কার্যদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আজকে আমাদের প্রথম কার্যদিবস ছিল। আমরা কাজ শুরু করেছি। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের জন্য কাজ করতে পারি এবং দুদকের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারি। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’
অতীতে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। এবার কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ। আমরা কোনো চাপের মধ্যে নেই। স্বাধীনভাবে কাজ করছি।’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া বিভিন্ন অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা কাজগুলোর বিষয়ে কমিশনের অবস্থান জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের সামনে এখনো কোনো ফাইল আসেনি। আমরা কেবল বসেছি। ফাইল আসুক, আমরা কাজ করব। কী করছি, আপনারা নিজেরাই দেখতে পারবেন। আগাম কোনো বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একটা কথা বললাম, কিন্তু কাজ করতে পারলাম না, তখন আপনারা আমাদের প্রশ্ন করবেন। অতএব, আমাদের কাজ শুরু করতে দিন। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করছি। সামনে যে সমস্যাই আসুক, সেগুলোর সঠিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব।’
দুদকের আগের কমিশনের করা মামলা, তদন্ত ও চার্জশিট দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান জানান, এসব বিষয়ে এখনো তিনি কোনো ফাইল হাতে পাননি। ফাইল হাতে পাওয়ার পর কমিশনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সবকিছু জানতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
অর্থপাচার ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে নতুন কমিশনের পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো কাজ শুরু করিনি। প্রথম দিনেই যদি আপনারা সব শুনে নেন, তাহলে দীর্ঘদিন আপনাদের সঙ্গে কাজ করব কীভাবে? আপনাদের বাইপাস করছি না। সময় দিন। কাজ শুরু হলে আপনারা অগ্রগতি জানতে পারবেন।’
এ সময় দুদক কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ বিচারপতি। আমরা স্যারের নেতৃত্বে প্রতিটি বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত দেব। আপনারা অতিঅল্প সময়ের মধ্যে এসব বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইছেন। আমাদের কাজ করার জন্য কিছুটা সময় দিন।’
জনগণের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জনগণের করণীয় হলো অপেক্ষা করা এবং তারা কী করছেন, তা দেখা। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, জনগণ হতাশ হবে না। ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা সামনে রেখেই তারা এখানে এসেছেন।
দুদক চেয়ারম্যানও জনগণের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশার সামনে রেখে এখানে এসেছি। ইনশাআল্লাহ জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য কাজ করব।’
এর আগে গত ১৭ আগস্ট দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ৭(১) ধারার বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে চেয়ারম্যান এবং সাবেক সচিব ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বুধবার তারা দুদকে যোগদান করেন।
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগ থেকে অবসর নেন। এর আগে দীর্ঘদিন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৫৯ সালের ১ মার্চ নওগাঁয় জন্ম নেওয়া এ কে এম আসাদুজ্জামান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালে জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি সাবেক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। চাকরিজীবনে ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে শিক্ষকতাও করেছেন। দুদকে যোগদানের আগে তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে আইনের অধ্যাপক এবং আইন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে লিগ্যাল এক্সপার্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অপর কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য এবং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে বিকম ও এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগ এবং আইবিএতে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। ফিন্যান্স, মানিলন্ডারিং, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

