এক সময় “কখনোই আর নয়” কথাটি কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত হতো।
এই ছিল আশউইটজের ছাইয়ের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া একটি মন্ত্র, এক অঙ্গীকার- যে ভবিষ্যতের প্রজন্ম আর কখনো গণহত্যার বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করবে না।
কিন্তু আজকের এই ডিজিটাল প্রদর্শনীর যুগে এবং রাজনৈতিক দায়মুক্তির আবহে, সেই “Never again” পরিণত হয়েছে “Ever again”-এ। আমরা এখন স্মৃতির এক বিকৃত উল্টোপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করছি।
ওয়ারশ গেটো থেকে শুরু করে স্রেব্রেনিৎসা, গাজা- এইসব জায়গায় শিশুদের দুর্ভোগের চিত্র, যা একসময় পবিত্র ধ্যানের বস্তু ছিল, তা এখন রূপ নিচ্ছে বিদ্রূপ, হাস্যরস এবং সবচেয়ে নির্লজ্জ বিনোদনের উপকরণে।
এটি নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং প্রমাণ যে ইতিহাসের অবসানহীন দহন এবং অস্বীকৃত মূল কারণগুলো এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে- যা সহিংসতায় উদাসীন এবং প্রদর্শন-নির্ভর।
চরম নিষ্ঠুরতার উদাহরণ হিসেবে ডাচ নেটফ্লিক্স কমেডি সিরিজ Football Parents-এ এমন একটি দৃশ্য রয়েছে, যেখানে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার শিকারদের তুলনা করা হয়েছে অদক্ষ শিশু ফুটবল খেলোয়াড়দের সঙ্গে- বসনিয়ান গণহত্যাকে রূপ দেওয়া হয়েছে একটি রসিকতায়।
ভুক্তভোগীদের উপহাস
১৯৯৫ সালে ডাচ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের চোখের সামনে, এমনকি তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে, ৮,০০০-এর বেশি বসনিয়ান মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যা করা হয়েছিল। আজ ডাচ টেলিভিশন সেই মৃতদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে। এই কেলেঙ্কারি আরো গভীর। নেদারল্যান্ডস তিনটি বড় ধরনের গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত- হলোকাস্ট, বসনিয়ান গণহত্যা এবং এখন গাজার গণহত্যা।
বর্তমানে ডাচ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে মামলা চলছে। অন্যদিকে একটি গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে, হলোকাস্ট চলাকালীন প্রায় পাঁচ লক্ষ ডাচ নাগরিক এতে অংশ নিয়েছিলেন। নিজেদের সহিংস অতীতের মুখোমুখি না হয়ে, ডাচ মিডিয়া সেই স্মৃতিকে “ডার্ক হিউমার”-এ রূপান্তর করে উপস্থাপন করছে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, Football Parents সিরিজে শিশুদের ফুটবল দক্ষতার ব্যর্থতাকে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার শিকারদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে- যা মর্মান্তিকভাবে প্রতিধ্বনিত করে ১৯৯৩ সালের ১২ এপ্রিলের ঘটনাকে, যখন স্রেব্রেনিৎসায় একটি স্কুল মাঠে ফুটবল খেলতে থাকা ৭৪ জন বসনিয়ান শিশুকে সার্ব গোলাবর্ষণে হত্যা করা হয়। এটি নিছক রুচিহীন কমেডি নয়- এটি হচ্ছে ব্যঙ্গের ছদ্মবেশে গণহত্যা অস্বীকার।
অস্বীকার কোনো প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ নয়; বরং এটি গণহত্যার মূল কাঠামোর অংশ, যেমন দেখা যায় ইসরায়েলি টিকটক ইনফ্লুয়েন্সারদের মাঝে- যারা গাজার শিশুদের জন্য অনুদান সংগ্রহের অভিনয় করে ভাইরাল “প্র্যাঙ্ক” ভিডিও বানায়, পরে সেটিকে নিষ্ঠুর রসিকতায় পরিণত করে। এই ভিডিওগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন দর্শক দেখে- বাস্তব জীবনের ট্র্যাজেডিকে পরিণত করে নির্মম ঠাট্টায়।
অলিখিত সত্য-
আমরা এখানে কীভাবে পৌঁছালাম? শোকস্মৃতির জায়গায় এখন পণ্যের মতো উপস্থাপন? শিশুশোক থেকে রূপান্তরিত হল পর্দায় উপহাসে?
কঠিন সত্য হলো, আমরা কখনোই প্রকৃত অর্থে গণহত্যা থেকে সরে আসিনি। “Never again” কোনোদিন বাস্তব ছিল না- কারণ এর পেছনের কোনো হিসাব-নিকাশই মেলেনি।
বর্ণবাদ, উপনিবেশবাদ, মানবতাবিরোধী ভাবধারা, সামরিক আগ্রাসন- এই গণহত্যার মূল চালিকাশক্তিগুলো কখনোই ধ্বংস করা হয়নি। বরং হোলোকাস্টের যে মতাদর্শ তখনকার ইহুদি জনগোষ্ঠীর উপর চালানো হয়েছিল, তা এখন নতুন অবয়বে ফিরে এসেছে- নতুন লক্ষ্যবস্তু নিয়ে।
Genocide Watch-এর প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগরি স্ট্যান্টন যে ১০টি ধাপের কথা বলেছেন- শ্রেণীকরণ, প্রতীকায়ন, বৈষম্য, অমানবিকীকরণ, সংগঠন, মেরুকরণ, প্রস্তুতি, নিপীড়ন, নির্বংশ এবং অস্বীকার- তা তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চেতনায় কখনোই প্রবেশ করেনি। বরং এখন এগুলো পটভূমির শব্দে পরিণত হয়েছে- রাজনৈতিক ভাষ্য এবং মিডিয়ার কথোপকথনে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এমনকি ভাষাগতভাবেও, সেই প্রতিশ্রুতি ছিল ভঙ্গুর। “Never again” কথাটি যতবার বলা হয়েছে, ততবার তার “N” অক্ষরটি ক্ষয়ে গেছে- শেষ পর্যন্ত থেকে গেছে কেবল “ever again”। প্রতিশ্রুতি পরিণত হয়েছে ভবিষ্যদ্বাণীতে: “চিরকালই আবার”।
একটি হারানো পবিত্রতা-
হলোকাস্টের একটি আইকনিক ছবি, ১৯৪৩ সালের ওয়ারশ গেটোর একটি শিশু- হাত তুলেছে আত্মসমর্পণে, ভয়ের ছাপ তার মুখে। একজন নাৎসি ফটোগ্রাফার তোলা সেই ছবি শিশুকালের পবিত্রতাকে দেখিয়েছিল, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নীচে পিষে যাওয়া ভয়ের চিত্রে। একসময় এটি ছিল স্মৃতির প্রতীক, প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি কিন্তু আজ- সেই পবিত্রতাও উপহাসের খোরাক।
বিশেষত পশ্চিমা সংস্কৃতিতে- যেখানে আগের গণহত্যাগুলোতে ভূমিকা ছিল- সেখানে এখন শিশুদের দুঃখও ব্যঙ্গের বস্তু। শিশুদের ব্যথা “আকর্ষণীয়”- তাদের কান্না আবেগ উদ্দীপক। কিন্তু কষ্টকে উপস্থাপন আর কষ্টকে শোষণ- এই দুইয়ের মাঝে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা আছে। আজ সেই রেখাটি মুছে গেছে- পুরোপুরি। আজকের এই লাইভস্ট্রিম যুদ্ধ আর অ্যালগরিদম-চালিত ক্লিক সংস্কৃতিতে, গণহত্যা এখন শুধু অপরাধ নয়- এটি একটি কনটেন্ট।
ওবমানা- অর্থাৎ বসনিয়ান গণহত্যা ছিল প্রথম “লাইভ সম্প্রচারিত” গণহত্যা। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত সেই বিভীষিকাময় ছবি বিশ্বজুড়ে মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল- তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চরম ব্যর্থতা।
গাজার গণহত্যা- প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাল গণহত্যা।
স্মার্টফোনে বন্দি হচ্ছে শিশুদের শেষ মুহূর্ত। লাইভস্ট্রিমে দেখা যাচ্ছে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া পরিবারগুলো- কিন্তু এইসব ছবিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে ব্যঙ্গ, অস্বীকার কিংবা খলনায়কসুলভ বিদ্রূপ। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোর একটি বৈশিষ্ট্য। সেই একই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান যারা গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ, তারাই এখন সংস্কৃতির মাধ্যমে মৃতদের উপহাসের পরিবেশ তৈরি করেছে।
নির্ভরতার মূল্য-
বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে দেখেছে কিভাবে পশ্চিমা রাজনৈতিক, মিডিয়া এবং একাডেমিক কাঠামো- “Never again” শপথ ভেঙেছে গাজার গণহত্যার সময়। কিন্তু এই বিশ্বাসঘাতকতার শিকড় গভীরে- বসনিয়া ও ওবমানা পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে পশ্চিমা শক্তি কার্যত গণহত্যাকে বৈধতা দিয়েছিল এবং পুরস্কৃত করেছিল। এর প্রমাণ? আজও স্রেব্রেনিৎসা নিয়ন্ত্রণ করে সেই সার্ব বাহিনী যারা বসনিয়াকদের হত্যা করেছিল। গণহত্যার দায়মুক্তিই অস্বীকারের পথ খুলে দিয়েছে।
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়- রেক্টর সেবাস্টিয়ান শুটজের নেতৃত্বে- এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই বিশ্ববিদ্যালয় এখনো Mothers of Srebrenica সংগঠনের কাছে ক্ষমা চায়নি, যদিও তাদের গণহত্যা অস্বীকারের ভূমিকা ছিল প্রমাণিত।
গাজা আমাদের সামনে নির্মম সত্যটি তুলে ধরছে: একটি গণহত্যা ক্ষমা করলে, পরবর্তীটিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
বসনিয়ান মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিবাদ এবং নেটফ্লিক্সের কাছে আবেদন সত্ত্বেও, যারা বসনিয়ান গণহত্যা নিয়ে ব্যঙ্গ করে এমন কনটেন্ট সরিয়ে নিতে বলেছিল, নেটফ্লিক্স কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা দেখায় মুসলিম জীবনের প্রতি তাদের চূড়ান্ত অবজ্ঞা- যা প্রতিধ্বনি তোলে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের মন্তব্যে, যিনি বলেছেন “ইসরায়েল আমাদের সবার হয়ে নোংরা কাজ করছে”।
আজ যখন বিশ্ব গাজার গণহত্যা ফিডে স্ক্রল করছে, তখন নেটফ্লিক্স উপস্থাপন করছে ডাচ প্রযোজিত কনটেন্ট যা আগের গণহত্যাকে উপহাস করছে- দর্শকদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে হেসে ওঠার, সেই “সুউৎকৃষ্ট কাজের” জন্য যা ডাচ শান্তিরক্ষীরা স্রেব্রেনিৎসায় করেছিল- বসনিয়ান ছেলেদের হত্যা।
নেটফ্লিক্স উন্মোচন করেছে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের বিকৃত কাঠামো, যেখানে এমনকি স্বর্ণকেশী, নীল চোখের ইউরোপীয় মুসলিম নিহতদেরও পূর্ণ মানবতা স্বীকার করা হয় না- তাদের স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়, কোনো সিরিজ সরানো হয় না, নেটফ্লিক্সের নেতৃত্ব রিড হ্যাস্টিংস ও ডেভিড হাইম্যানের দৃষ্টিতে। এই অবমাননাকর মনোভাব দিয়ে নেটফ্লিক্স সেই প্রচারণার পুনরাবৃত্তি করছে, যা ইতিহাসে গণহত্যার পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করেছে।
অনেক বসনিয়াক তখন অবাক হয়েছিল, যখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় গণহত্যা অস্বীকারের জন্য ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানায়। আজ তারা হতবাক নেটফ্লিক্স দেখে- যা তাদের মৃতদের নিয়ে উপহাস করছে। এই বিশ্বাসঘাতকতা আরও যন্ত্রণাদায়ক, কারণ, বিশ্বের অন্যদের মতো তারাও “Never again” প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস রেখেছিল- কিন্তু এখন জানতে পারছে, সেই প্রতিশ্রুতি তাদের জন্য কখনোই প্রযোজ্য ছিল না।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই

