বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতার মতো গভীর সমস্যার মধ্যে রয়েছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ছয় মাসে এই সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু কাঠামোগত উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন আইন প্রণয়ন, ব্যাংকের আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে বিশেষ নিরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির প্রস্তুতি এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরির মধ্য দিয়ে সংস্কারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তবে বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। ব্যাংক খাতের প্রধান আর্থিক সূচকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি, যা থেকে বলা যায় সংকট কাটতে শুরু করেছে। বরং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে সংকট সমাধানের সময় না বলে বরং বহুদিন ধরে আড়ালে থাকা দুর্বলতাগুলো প্রকাশের সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এখন প্রশ্ন উঠছে—আইন ও নীতিগত পরিবর্তনের পর পরবর্তী ধাপে সরকার বাস্তবে কতটা অর্থ উদ্ধার করতে পারবে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট কীভাবে সামলাবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৬ শতাংশে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন ও সম্পদের অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ।
পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি আরও পরিষ্কার হয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে। এই অঞ্চলের ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার ৭.৯ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সমস্যাটি কেবল সাধারণ দুর্বলতা নয়; এর মাত্রা আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পুরো দায় বর্তমান সরকারের ওপর চাপানোও বাস্তবসম্মত হবে না। গত দুই বছরে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন সংক্রান্ত নিয়ম কঠোর হওয়ায় আগে বিভিন্নভাবে আড়ালে থাকা বহু দুর্বল ঋণ এখন প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধির একটি অংশ ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি দৃশ্যমান হওয়ার ফল।
এটি একদিকে উদ্বেগের, অন্যদিকে সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয়ও। কারণ প্রকৃত সমস্যা গোপন রেখে কোনো ব্যাংকিং সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যাকে কাগজে তুলে আনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সেই খেলাপি অর্থ কতটা আদায় করা যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করা।
আগামী ছয় মাসে তিন বড় পরীক্ষা
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সরকারের সামনে আগামী ছয় মাসে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে।
প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণ আদায়। কেবল নতুন করে কত ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলো—এ তথ্য প্রকাশ করলেই সংস্কারের সাফল্য প্রমাণ হবে না। জনগণকে দেখাতে হবে কত টাকা বাস্তবে ফেরত এসেছে, কার কাছ থেকে এসেছে এবং বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন মূলধন ঘাটতি। দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করা হবে কি না, হলে কতটা ব্যবহার করা হবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অতীতে যেসব মালিক, পরিচালক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যাংকের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের ওপর কতটা দায় আরোপ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ব্যাংকের ক্ষতি যদি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের করের অর্থ দিয়ে পূরণ করা হয়, অথচ যারা অনিয়মের মাধ্যমে সেই ক্ষতি তৈরি করেছেন তারা দায়মুক্ত থাকেন, তাহলে সংস্কারের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। শুধু নতুন পরিচালনা পর্ষদ বসানোকে ব্যাংক সংস্কার বলা যাবে না। ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো, পরিচালক নিয়োগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়া, ঋণ অনুমোদনের নিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আইন হয়েছে, এখন বাস্তব প্রয়োগের পরীক্ষা
ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বড় পরিবর্তন এসেছে ১০ এপ্রিল। ওই দিন সংসদে পাস হয় “ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, 2026”।
এই আইনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত বা টিকে থাকার সক্ষমতা হারানো ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তক্ষেপের আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পুনর্গঠন, অধিগ্রহণ, মূলধন পুনর্বিন্যাস কিংবা অন্য ধরনের সমাধানমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
এর আগে “ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এর মাধ্যমে যে কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, নতুন আইন সেটিকে স্থায়ী আইনি ভিত্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে আলাদা একটি ব্যাংক রেজোলিউশন বিভাগও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এর তাৎপর্য বড়। কারণ অতীতে দুর্বল ব্যাংককে বছরের পর বছর তারল্য সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিল কিংবা বিশেষ নিয়ন্ত্রক ছাড় দিয়ে টিকিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল। নতুন ব্যবস্থায় এমন ব্যাংক বাস্তবে টেকসই কি না, তা বিবেচনায় এনে দ্রুত পুনর্গঠন বা সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে আইনটি পাসের সময় একটি বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছিল। অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সময় ১৮(এ) ধারা যুক্ত করে সাবেক ব্যাংক মালিকদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর সরকার পরে ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, ব্যাংক সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; আইনের প্রতিটি ধারায় জবাবদিহি ও স্বার্থের সংঘাত ঠেকানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমানতকারীর সুরক্ষায় নতুন আইন
একই দিনে, অর্থাৎ ১০ এপ্রিল, অনুমোদন পায় “আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬”। এই আইন “ব্যাংক আমানত বীমা আইন, ২০০০”-এর জায়গা নিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় শুধু ব্যাংক নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানও আমানত সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় এসেছে। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তির আমানত সুরক্ষার সীমা 1 লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে।
কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা সমাধান প্রক্রিয়ার মধ্যে গেলে ছোট আমানতকারীদের জন্য এই ব্যবস্থা কিছুটা বাড়তি নিরাপত্তা দেবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক নিয়ে আমানতকারীদের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এমন একটি আইনি সুরক্ষা আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।
তবে কেবল আমানত সুরক্ষার পরিমাণ বাড়ালেই আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না। মানুষ মূলত জানতে চায়, প্রয়োজনের সময় তারা নিজের টাকা ফেরত পাবে কি না। তাই আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যাংকের তারল্য, মূলধন, সম্পদের মান এবং ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
দায়ীদের জবাবদিহি ছাড়া সংস্কার অসম্পূর্ণ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ ব্যাংক সংস্কারের ক্ষেত্রে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছেন। তার মতে, দুর্বল ব্যাংক কে পরিচালনা করবে—এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়।
বরং দেখতে হবে, অতীতে যারা ব্যাংক দুর্বল করার পেছনে ভূমিকা রেখেছেন তাদের দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এবং ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা আত্মসাৎ হওয়া অর্থ কতটা ফেরত আনা যাবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাংক সংস্কারের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের দাবি জানায়। কতটি আইন হলো, কতটি প্রজ্ঞাপন জারি হলো অথবা কতটি কমিটি গঠন করা হলো—এসব দিয়ে প্রকৃত সংস্কারের ফল বিচার করা কঠিন।
সাফল্য তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী পরিষ্কার হবে, খেলাপি অর্থ আদায় বাড়বে, অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সাধারণ আমানতকারীর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি নতুন করে আস্থা তৈরি হবে।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির দিকে এগোচ্ছে। এই ব্যবস্থায় সব ব্যাংককে একই ধরনের নিয়মিত কাগজপত্র যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যেসব ব্যাংকে বেশি ঝুঁকি রয়েছে, সেগুলোর ওপর বেশি নজর দেওয়া হবে।
বিশেষভাবে দুর্বল সম্পদমান, ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেল, অস্বাভাবিক ঋণ প্রবাহ এবং সুশাসনের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করা হবে।
এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুধু নিয়ম মানা হয়েছে কি না তা দেখে ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা যায় না। একটি ব্যাংক কাগজে নিয়ম মেনে চললেও তার ঋণ পোর্টফোলিও যদি কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, জামানতের মূল্য যদি বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয় অথবা পরিচালকদের প্রভাবে ঋণ অনুমোদিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার এগিয়ে নিতে জুন মাসে বিশ্বব্যাংক ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের “আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প-দুই” অনুমোদন করেছে।
এই অর্থায়নের আওতায় আমানত সুরক্ষা, জরুরি তারল্য সহায়তা, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন ও সমাধান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারের মতো বিষয় রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়াই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। এই অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, কোন ধরনের সংস্কারে ব্যবহার হবে এবং এর ফলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতায় কী পরিবর্তন আসবে—সেটিই হবে আসল বিবেচ্য।
একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীতে অতিরিক্ত ঋণ বড় ঝুঁকি
ব্যাংক খাতের দুর্বলতার অন্যতম বড় উৎস হলো কয়েকটি ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া।
একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া, ভুয়া বা জাল কাগজপত্র ব্যবহার, অতিমূল্যায়িত সম্পদ জামানত হিসেবে দেখানো এবং পরিচালকদের প্রভাবে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ বহুদিনের।
এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন যথেষ্ট নয়। প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা ব্যবস্থা এবং ঋণ অনুমোদনের কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
বিশেষ করে বড় ঋণের ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকানা, সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান, জামানতের বাস্তব মূল্য এবং ঋণগ্রহীতার অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
২০২৮ থেকে নতুন ঋণক্ষতি হিসাব পদ্ধতি
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও একটি বড় পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। “আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান 9”-এর অধীনে “প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি” পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে ঋণ সমস্যায় পড়ার পর ক্ষতির বিপরীতে অর্থ সংরক্ষণ করা হয়। নতুন পদ্ধতিতে ভবিষ্যতে ঋণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও আগাম বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে তহবিলযুক্ত ও তহবিলবিহীন ঋণসুবিধার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা চালু হবে।
এর ফলে ব্যাংকগুলোকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ক্ষতির বিপরীতেও আগেভাগে অর্থ সংরক্ষণ করতে হতে পারে। এতে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা বাড়তে পারে।
তবে এর একটি কঠিন দিকও আছে। বেশি পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হলে অনেক ব্যাংকের কাগুজে মুনাফা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে কিছু ব্যাংকের গোপন বা অপ্রকাশিত মূলধন ঘাটতিও সামনে চলে আসতে পারে।
অর্থাৎ নতুন হিসাব পদ্ধতি চালু হলে শুরুতে ব্যাংক খাতের আর্থিক চিত্র আরও খারাপ দেখানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সঠিক ঝুঁকি চিহ্নিত করতে এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি আগেভাগে মোকাবিলা করতে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন: টাকা ফেরত আসবে কি?
বাংলাদেশের ব্যাংক সংস্কারের আলোচনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—যে অর্থ ইতোমধ্যে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে বা দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি অবস্থায় পড়ে আছে, তার কতটা ফেরত আনা সম্ভব হবে।
একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বদলানো তুলনামূলক সহজ। আইন পরিবর্তন করাও সম্ভব। কিন্তু বড় ঋণখেলাপির কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের দায় নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন।
এ কারণেই সংস্কারের দ্বিতীয় পর্যায় প্রথম পর্যায়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সরকার যদি খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারে, দুর্বল ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির জন্য সুস্পষ্ট নীতি দেয় এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ দেওয়া বন্ধ করতে পারে, তাহলে বর্তমান সংস্কার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।
অন্যদিকে সংস্কার যদি আইন, প্রজ্ঞাপন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ব্যাংক খাতের মূল সংকট অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
আমানতকারীর আস্থাই হবে চূড়ান্ত পরীক্ষা
ব্যাংক ব্যবস্থা মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একজন আমানতকারী ব্যাংকে অর্থ রাখেন এই বিশ্বাসে যে প্রয়োজনের সময় তিনি তা ফেরত পাবেন। বিনিয়োগকারী বিশ্বাস করেন ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে কোনো ব্যাংক এমন ঝুঁকি নিচ্ছে না, যার মূল্য পরে সাধারণ আমানতকারী বা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই আস্থা দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি, দুর্বল তদারকি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঋণ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাই ব্যাংক সংস্কারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কোনো আইনের নাম দিয়ে বিচার করা হবে না। বিচার হবে আমানতকারী আবার নিশ্চিন্তে ব্যাংকে টাকা রাখতে পারছেন কি না, সৎ ঋণগ্রহীতা ন্যায্যভাবে অর্থায়ন পাচ্ছেন কি না এবং প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা সত্যিই আইনের আওতায় আসছেন কি না—এসব বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে।
বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতে একটি নতুন সংস্কার কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। “ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, ২০২৬”, “আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬”, বিশেষ নিরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে নীতিগতভাবে বড় কিছু পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু ৩২.৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ, ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন অনুপাত এবং দীর্ঘদিনের সুশাসন সংকট মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সামনে পথ এখনো কঠিন।
পরবর্তী ছয় মাস তাই শুধু সংস্কার অব্যাহত রাখার সময় নয়; এটি হবে ফল দেখানোর সময়। কত টাকা উদ্ধার হলো, কত দুর্বল ব্যাংক বাস্তবসম্মতভাবে পুনর্গঠিত হলো, কতজন দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো এবং আমানতকারীরা কতটা আস্থা ফিরে পেলেন—এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ব্যাংক খাত সত্যিকার অর্থে সংস্কারের পথে এগোচ্ছে, নাকি শুধু নতুন কাঠামোর মধ্যে পুরোনো সমস্যাই বহন করে চলেছে।

