স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন দেখানোর অধিকার রাষ্ট্রের অবজ্ঞার বুলডোজারেই মাটিতে মিশে যায়, কিংবা স্বপ্নের কঙ্কাল নিয়ে জীবনযাপন করতে হয়- এটাই হয়ে উঠেছে আমাদের দেশের বাস্তবতা। বাংলাদেশ আজ আর স্বপ্নের, আবিষ্কারের কিংবা উদ্ভাবনের দেশ নয়, বরং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার দেশে পরিণত হয়েছে।
এটা বাংলাদেশের নয়, অন্য কোনো কাল্পনিক দেশের ছবি- যেখানে ফেল করানো শিক্ষাব্যবস্থাকে সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। এমন দেশে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা ছাড়া অন্য কোনো পথ খুঁজে পায় না। আমাদের দেশের অবস্থা অবশ্য একটু আলাদা হলেও খুব একটা ভিন্ন নয়। এখানে শুধু ফেল করানো শিক্ষাপ্রণেতাই নয়, এ প্লাস ও গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীরাও মহাপ্রতিভার তালিকায় থাকে। তারপরও প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার মতো করুণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। কারণ, এই মহাপ্রতিভারা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই ফেল করিয়ে দিয়েছেন। বাল্যকালে অর্জিত সোনালি ফলও তাদেরকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সঠিকভাবে চালানোর পরীক্ষায় পাশ করাতে পারেনি- এটাই বড় আশ্চর্যের বিষয়।
হরিপদ কাপালী হয়তো এ প্লাস পাননি কিন্তু তিনি উদ্ভাবন করেছেন। আর আজকের সোনালি এ প্লাস ধারী বালক-ছেলেরা হরিপদের মতো কোনো নতুন কিছু করতে পারেনি, তারা শুধু স্বস্তিতে বেঁচে আছে। অথচ এ প্লাস ও গোল্ডেন এ প্লাস নিয়ে আজ আমাদের দেশে এক ধরনের অস্বাভাবিক উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যম ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে সেই নম্বরের পেছনে ছুটে বেড়ায়, তাদেরকে বিশ্বজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করে নানা পুরস্কার দেয়। সম্ভবত সেইসব মিডিয়ার সম্পাদক-সংবাদকর্মীরাও স্কুলজীবনে ভালো নম্বর পেয়েছিলেন।
তবে এই বিস্ময়কর বালকরা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চপদে থাকলেও দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তাদের ভূমিকা কতটুকু তা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে বিগত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার আমলে তাদের অবদান কতটা, কিংবা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকা কী ছিল- সেই প্রশ্ন থেকে মুক্ত নয়। যাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে, তারাও বেশিরভাগই বাল্যকালে সোনালি ফল পাওয়া মহাপ্রতিভারা।
এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পরে যখন সংবাদমাধ্যম ও অভিভাবকরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করেন, তারা আদতে তাদের ভীতি ও অহংকার তৈরি করেন। এতে করে শিক্ষার্থীরা জীবনের আসল লক্ষ্য মানুষ হওয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তারা বড় হয়ে ডাক্তার, প্রকৌশলী বা আমলা হওয়ার বাইরে কিছু ভাবতে শিখে না।
আমাদের ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা ও ভিসিদের চিকিৎসা, প্রকৌশল, শাসন কিংবা শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান কেমন? তারা নিশ্চয়ই নিজেদের পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে পেরেছেন, সেটা সম্মানযোগ্য। কিন্তু সেটাকে আমরা কেন জাতির জন্য বড় অর্জন হিসেবে উদযাপন করি? অন্যদিকে যারা স্বপ্ন দেখে, তাদের স্বপ্ন রাষ্ট্রের অবজ্ঞায় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। বাংলাদেশ এখন পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার দেশ, স্বপ্ন দেখার দেশ নয়।
দেশে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ হলো: দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, নৌকা-লঞ্চডুবি, দূরের যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা, বর্ষাকালে বজ্রপাত। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের পর আত্মহত্যার ঘটনাও এসবের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় সমস্যা। বজ্রপাত থেকে বাঁচাতে তালগাছ লাগানো যায় কিন্তু আত্মহত্যা রোধের জন্য কী করণীয়?
গত বছর ঢাকায় গেন্ডারিয়ার নাগমণি, নাটোরে বাগাতিপাড়ার জেসমিন, পিরোজপুরে নেছারাবাদের সুমাইয়া, হবিগঞ্জে নজরপুরের ফারজানা, বগুড়ায় শেরপুরের সুমাইয়া, ঠাকুরগাঁওয়ে বালিয়াডাঙ্গির মিতু, দিনাজপুরে নবাবগঞ্জের রিতা, কুমিল্লায় দাউদকান্দির শ্রাবন্তী, গাইবান্ধায় সদরের দিশা ও নুরপুরের লাবণ্য, কক্সবাজারে রুদ্রসহ অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এটা কি পরীক্ষাব্যবস্থা না মৃত্যুপুরী? শিক্ষাপ্রণেতারা কি এ বিষয়ে কখনো মনোযোগ দিয়েছেন? তারা দায়মুক্ত নাকি?

যারা এতটা সফল, তারা কি বোঝে না যে, ভালো ফলাফলের পেছনে অর্থনৈতিক সুবিধা, ভাল স্কুল ও কড়াকড়ি পড়াশোনা বড় ভূমিকা রাখে? তারা শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করেছে, জীবনের বাস্তবতা দেখেনি। যারা এসব বুঝতে পারেন না, তাদেরকেও কি মেধাবী বলা যায়? সক্রেটিসের কথায়, “আমি জানি আমি কিছুই জানি না”- এটা অন্তত স্বীকার করা উচিত।
অবশ্যই এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন যাদের পেটভরা খাবার ছিল না, ভালো কাপড়ও ছিল না, তাদের পরিবার দিনমজুর, তারপরও তারা ভালো ফল করেছে। তারা সত্যিকার অর্থেই পুরস্কারের যোগ্য। কিন্তু বাকিরা জীবনের মূল পর্বে গিয়েই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবে। এখন সময় এসেছে এসব মিথ্যা আদিখ্যাতাকে বিদায় জানানোর, কারণ এরা অনেক আত্মহত্যা ও গ্লানির জন্য দায়ী।
প্রতিবছর ভালো ফল না করার জন্য শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করে, তবে তা কি আসলেই আত্মহত্যা? না তাদের কি বাধ্য করা হয়? হয়তো আরো অনেকেই আত্মহত্যার কথা ভেবে ফিরে এসেছে, অথবা সঙ্কুচিত জীবন বেছে নিয়েছে। ব্যর্থতা কি আসলেই তাদের? না শিক্ষাব্যবস্থার?
মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করার পলান সরকার গ্রামে গ্রামে বই বিলিয়ে আলো ছড়াচ্ছেন। অন্যদিকে সোনালি এ প্লাস পাওয়া মহাপ্রতিভারা জ্ঞান লুকিয়ে রেখেছেন, ইংরেজির কৌশল দিয়ে সাধারণ মানুষকে দাসত্বে রেখেছেন। ভাগ্যিস হরিপদ কাপালী ও পলান সরকাররা নিজেদের সৃষ্টিশীলতাকে ধ্বংস হতে দেননি।
আসুন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাপদ্ধতিকে আনন্দময়, নিরাপদ, সৃষ্টিশীল ও মানবিক করে তুলি। যেন শিশু-কিশোরেরা মৃত্যুর বেদনায় নয়, পূর্ণতার আশা নিয়ে বিকশিত হয়। শিক্ষাব্যবস্থা হোক তাদের প্রস্ফুটনের মাধ্যম, যেখানে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থী সবাই শিখবে সুবুদ্ধির শিক্ষা।

