আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে লিখি বা লিখি “আমি যদি ভিসি হতাম”, অনেকেই মনে করে আমি বুঝি ভিসি হতে চাই। জীবনে কোনো দিন আমার মধ্যে এই ইচ্ছে জাগেনি। বরং বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার যোগ্যতা আমার নাই। এখানে ভিসিদের ৮০% কাজই বিশ্বের কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে নাই। মানে আমাদের কু-সংস্কৃতি ও কু-পরিবেশের কারণে মোট কাজের ৮০% কু-কাজ তৈরি হয়। এই কারণে ভিসিরা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে চিন্তা করার সময়ও যেমন পায় না, আবার অনেকের ইচ্ছাও থাকে না। ৮০% কু-কাজের পেছনে সময় দিতে দিতেই তারা exhausted থাকে সব সময়।
অবশ্য আমাদের অধিকাংশ ভিসিই অতিরিক্ত ৮০% অকাজ, কু-কাজ করতে পছন্দও করে। তারা জেনে-বুঝেই এই পদ নেয়। পদে গিয়ে এই status quo কে পরিবর্তনের জন্য যেই চ্যালেঞ্জ আছে, সেটাও নিতে চান না। বরং ৮০% কু-কাজকেই তারা উপভোগ করে এবং এই জন্যই তারা ভিসি হতে মরিয়া।
এই ছোট্ট জীবনে যেই দুইটা প্রশাসনিক পদ পেয়েছি, দুটো থেকেই কয়েক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেছি। অল্প সময়েই বুঝে গেছি আমি বাংলাদেশের পরিবেশের সাপেক্ষে কোনো রকম প্রশাসনিক পদের জন্য যোগ্য না।
আমি শিক্ষকতা এবং যতটা পারি গবেষণা করা এবং করানোর মাঝেই আনন্দ পাই। জ্ঞানের প্রবাহ ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সাথে যুক্ত থাকার চেয়ে বেশি আনন্দের আর কী হতে পারে? তার মাঝে এখন বই লিখছি। এটা লিখতে গিয়েও প্রচণ্ড আনন্দ পাচ্ছি এবং একই সাথে শিখছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চেয়ে আনন্দের আর কোনো চাকরি হতে পারে না।
এটি একমাত্র পেশা যার মাধ্যমে নিজেকে জ্ঞানের প্রবাহে রেখে নিজে অনবরত উন্নত হওয়ার সুযোগ আছে এবং তার জন্য আবার বেতনও আছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু শিখি। আর সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হলো ১৮-২৮ আর আমরা সারাজীবন সেই বয়সের মানুষদের সান্নিধ্যে থাকতে পারি। এইটা যে জীবনে কত বড় পাওয়া, তা ভাষায় বর্ণনা সম্ভব না।
সুতরাং আমার যদি ভীমরতি না ধরে থাকে, এইটা রেখে আমি কেন প্রশাসনিক পদে যাব? বিশেষ করে যতক্ষণ আমি গবেষণা করতে পারব এবং করাতে পারব, ততক্ষণ কোনো প্রশাসনিক পদে তো আরও নয়। শিক্ষকতার আরও অনেক আনন্দ আছে যেমন সময়ের স্বাধীনতা। আমি যতক্ষণ জেগে থাকি, কিছু না কিছু করি বা পড়ি, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই কাজগুলো কোনো চাপে পড়ে করি না। নিজের আনন্দেই করি এবং কখন করব, সেই সময়টাও নিজেই ঠিক করতে পারি।
ইদানীং এক নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। দেখা গেছে, আমি যদি এখন কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, তখন কেউ কেউ বলে উঠে: ঘুম ভাঙছে তাহলে? অথবা বলে: এত দেরিতে বুঝলে হবে? যারা এইসব কথা বলে, তারা আসলে কারা? এরা হলো সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী অথবা অন্ধভক্ত।
এরা তখন যদি তাদের সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো, তাহলে দেশের অবস্থা আজকের মতো হতো না আর তাদের অবস্থাও আজকের মতো হতো না। এই যে এস আলম, সালমান এফ রহমান, আজিজ খানসহ অসংখ্য মানুষ আওয়ামী লীগের প্রিয়পাত্র হয়ে লক্ষ কোটি টাকা পাচার করছিল, তখন যদি তারা চুপ না থেকে তাদের নেত্রীকে থামাতে পারতো, তাহলে দেশ আজ এই অবস্থাতেই আসতো না আর তাদেরও এই অবস্থা হতো না।
নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরা শুধু তো চুপ থাকেনি, বরং এটি প্রচার ও প্রসারে যা করণীয়, করেছে। কিন্তু আমি তাদের অনেকের সাথে কথা বলে জেনেছি, তারা কেউই মন থেকে ওই শিক্ষাক্রমকে পছন্দ করতো না।
তাছাড়া, উনারা জানতেন শিক্ষার উন্নয়ন যদি সরকার সত্যি সত্যি চাইতো, তাহলে শিক্ষাক্রম নামক মোড়ক পরিবর্তনের আগে শিক্ষকতা পেশার উন্নয়নের পদক্ষেপ নিত। ওই বুদ্ধিজীবীদের উচিত ছিল সেই কথাটা বলা। ওরা নাকি ফিনল্যান্ডের মডেল এনেছে? প্যাকেজে যদি আনতেই হয়, পুরোটা আনেন, মানের শিক্ষকতা পেশাকে আগে আকর্ষণীয় করেন।
বাংলাদেশের পার্সপেকটিভে বাংলাদেশের স্কুলের শিক্ষকরা যেই বেতন পায়, ফিনল্যান্ডের সামাজিক পার্সপেকটিভে ফিনল্যান্ডেও যদি শিক্ষকদের একই বেতন দেওয়া হয়, তখন কি তাদের মডেল কাজ করতো? তারা আগে শিক্ষকতা পেশাকে এতটাই আকর্ষণীয় করেছিল যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল এডুকেশন বিভাগে ভর্তির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতা হয়।
নতুন শিক্ষাক্রমের কারণে গত বিগত সরকার কতটা অজনপ্রিয় হয়েছিল, কেউ কখনো গবেষণা করে দেখেছিল? অবশ্য এইসব বিষয়ে গবেষণা করে সত্য ফলাফল প্রকাশের পরিবেশও তখন ছিল না।
আমি এইসব বিষয়ে তখনও যেমন লিখে গিয়েছি, এখনও লিখছি এবং বলছি। কারণ আমি মনে করি সমাজে আমার মতো প্রতিবাদী মানুষ দরকার। কিন্তু এই সমাজে এই প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা এলার্মিংলি কমে গেছে, তাই আমার বা আমার মতো আরও যারা আছে, তাদের দায়িত্বও বেশি।
- কামরুল হাসান মামুন, অধ্যাপক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়। (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

