নিরাপদ অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে মানুষ সাধারণত চাকরি কিংবা উদ্যোক্তামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর জন্য প্রয়োজন পূর্বদৃষ্টি, প্রস্তুতি এবং ব্যক্তিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা। অনেকের জন্য প্রথম ধাপটি হলো এমন একটি স্থান বেছে নেওয়া, যা পেশাগত ও ব্যক্তিগতভাবে উন্নতির সর্বোচ্চ সম্ভাবনা দেয়।
শক্তিশালী নাগরিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শহরগুলো সাধারণত তরুণ এবং কর্মসংস্থানপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করে, যারা উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করে এমন শহরের সন্ধান করে। বাংলাদেশে এই ধারা একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যেই গিয়ে ঠেকে: ঢাকা। রাজধানী এখনো দেশের চাকরি, শিক্ষা ও অবকাঠামোর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। তবে এই কেন্দ্রিকতার মূল্য দিতে হচ্ছে জনাকীর্ণতা, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপের মাধ্যমে।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক, যার ফলে অর্থনৈতিক কাঠামো একমুখী হয়ে উঠেছে। অন্য জেলা বা অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন ছড়িয়ে দেওয়া এখন আর বিকল্প নয় বরং একান্ত প্রয়োজন। এই রূপান্তর বৈষম্য তৈরি না করে বরং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, আঞ্চলিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন কৌশলে বিকেন্দ্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত তাদের রাজধানীর বাইরেও আঞ্চলিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। এই উদ্যোগগুলো শুধু যে প্রধান শহরগুলোর ওপর চাপ কমিয়েছে তাই নয় বরং স্থানীয় সম্ভাবনাও উন্মোচন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে ওয়াশিংটন ডিসি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সদরদপ্তর হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে দেশের নানা প্রান্তে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ছড়িয়ে রয়েছে। জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালি, আবার টেক্সাস, জর্জিয়া ও ইলিনয় প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিভা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।
অস্ট্রেলিয়ায় সিডনি ও মেলবোর্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, যখন ক্যানবেরা প্রশাসনিক রাজধানী। মালয়েশিয়া বিভিন্ন খাতভিত্তিক অঞ্চল গড়ে তুলেছে- তথ্যপ্রযুক্তির জন্য সাইবারজায়া, সরকারের জন্য পুত্রজায়া এবং বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের জন্য জহোর।
পাশাপাশি ভারতের ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রবণতা সুস্পষ্ট। ব্যাঙ্গালোর এখন একটি প্রধান আইটি হাব, পুনে উচ্চশিক্ষার জন্য পরিচিত এবং মুম্বাই আর্থিক ও চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে শীর্ষে। এই শহরগুলো সম্মিলিতভাবে দিল্লির ওপর চাপ কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করছে।
এর বিপরীতে বাংলাদেশে এখনো ঢাকামুখী অভিবাসনের প্রবণতা অব্যাহত, যার পেছনে রয়েছে চাকরি, উচ্চমানের শিক্ষা এবং নগর সুবিধার প্রাপ্তি। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস’ অনুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ এবং এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই জনসংখ্যা চাপ কেবল শহরের জন্য সমস্যা তৈরি করছে না বরং অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নের সম্ভাবনাও রুদ্ধ করছে।
পরিকাঠামো ও বিনিয়োগের সুষম বণ্টন ঢাকার চাপ কমিয়ে অন্যান্য অঞ্চলের বিকাশে সহায়ক হতে পারে। চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহী ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক ক্যারিয়ার হাব হিসেবে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। একটি প্রধান সমুদ্রবন্দর ও কাস্টমস সুবিধা থাকায় এটি শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা এবং কর্পোরেট উপস্থিতির প্রসার একে ব্যবসা ও পেশাজীবীদের জন্য ক্রমশ আকর্ষণীয় করে তুলছে।
খুলনা, যেখানেও সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক শ্রমবাজার রয়েছে, ভারী শিল্প ও প্রযুক্তি পার্ক গঠনের সামর্থ্য রাখে। এখানকার উন্নয়ন দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের চাহিদা মেটাতে পারে এবং ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
সিলেট প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত, যা দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে এখানকার আতিথেয়তা ও পর্যটন খাতে অবকাঠামো ঘাটতি রয়েছে। লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ সিলেটকে একটি বড় পর্যটন অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে পারে, কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমানতাও বাড়াবে। ইতোমধ্যে অনেক তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি এখানে অফিস খুলেছে এবং এটি বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় একটি আইটি আউটসোর্সিং হাব হয়ে উঠতে পারে।
রাজশাহী অঞ্চল কৌশলগত সহায়তা দাবি করে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এখানে সস্তা শ্রম, পর্যাপ্ত জমি এবং বিশুদ্ধ বাতাস রয়েছে। এটি শিল্প, চলচ্চিত্র ও সৃজনশীল খাতের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি, শিক্ষা বা সৃজনশীল উৎপাদন খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ রাজশাহীকে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করতে পারে।
বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও একমত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ বলেন, “আমি সরকারের প্রতি অনুরোধ করব- দেশের বিভিন্ন জেলায় সাংগঠনিক কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ করুন। তাহলে দেশের সব মানুষই সঠিকভাবে তাদের অধিকার ভোগ করবে এবং কেউ ন্যায়ের বঞ্চনার শিকার হবে না।”
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর এইচ এম রায়হান তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “আমি মনে করি এই শহর (চট্টগ্রাম) চাকরিপ্রত্যাশী ও শিক্ষার্থীদের জন্য চমৎকার একটি পছন্দ হতে পারে, কারণ চট্টগ্রাম তার নাগরিকদের জন্য সব ধরনের উন্নত জীবনমানের সুবিধা প্রদান করে। বর্তমানে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি এখানে তাদের অফিস স্থাপন করছে, ফলে এসব কোম্পানিতে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যারা চ্যালেঞ্জ নিতে চায় এবং গতিশীল পরিবেশে কাজ করতে চায়, তাদের জন্য চট্টগ্রাম হতে পারে অন্যতম সেরা স্থান।”
বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে যুক্তি এখন স্পষ্ট। সরকারিভাবে নেতৃত্ব দেওয়া জরুরি হলেও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যৌথ প্রচেষ্টাই কেবল কর্মসংস্থানের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে এবং দেশের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশকে যদি তার বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও অর্থনীতির চাহিদা পূরণ করতে হয়, তাহলে এখনই কাজ শুরু করতে হবে।
তানজিম হাসান। সূত্র: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস

