জ্বালানিশক্তির হাত ধরেই মানবসভ্যতা এগিয়ে চলেছে। আগুনের ব্যবহার আয়ত্ত করা থেকে শুরু করে বাষ্পশক্তির প্রয়োগ কিংবা পরমাণু বিভাজনের মতো মাইলফলক অর্জন- সবকিছুই জ্বালানিশক্তির অবদান।
আজ আমরা এক নতুন যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের সামনে উঁকি দিচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এক অপার সম্ভাবনা।
গত বছর নতুনভাবে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের প্রায় সবটাই এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ দুই ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে- যা জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার বেশি।
বর্তমানে সৌর ও বায়ুশক্তি পৃথিবীর সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়েছে। এই খাতে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান, ত্বরান্বিত হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন। অথচ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিতে অনেক বেশি ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
যেসব দেশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিকে আঁকড়ে আছে, তারা তাদের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিচ্ছে না- বরং ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা হারাচ্ছে এবং একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুযোগ থেকেও নিজেদের বঞ্চিত করছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা মানে জ্বালানি স্বায়ত্তশাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য অনিশ্চিত, সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কবলেও পড়তে হয়- যেমনটি আমরা দেখেছি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে। কিন্তু সূর্যের আলোতে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই, বাতাসে কোনও নিষেধাজ্ঞা চলে না এবং প্রায় প্রতিটি দেশেই এত নবায়নযোগ্য সম্পদ রয়েছে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। এখনও বিশ্বের বহু মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় জীবন কাটায়। নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমেই দ্রুত, সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ সেবা পৌঁছানো সম্ভব- বিশেষত অফ-গ্রিড ও ছোট সৌর প্যানেলগুলো এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবমিলিয়ে- নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা এখন অপ্রতিরোধ্য। তবু এই রূপান্তর সব দেশ ও মানুষের জন্য এখনো সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি- উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনও অনেকটা পিছিয়ে।
২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব ডেটা সেন্টারগুলোর সম্মিলিত বিদ্যুৎ খরচ হবে পুরো জাপানের বর্তমান বিদ্যুৎ খরচের সমান। এসব পরিচালনায় নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহারে কোম্পানিগুলোকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে।
সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ছয়টি পদক্ষেপ:
১. রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার: প্রত্যেক দেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ভবিষ্যতের প্রতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতি জানাতে হবে। পরবর্তী এনডিসিতে (জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান) ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উপযোগী পরিকল্পনা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং নবায়নযোগ্য শক্তির রূপরেখা স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। জি-২০ দেশগুলোর দায় সবচেয়ে বেশি।
২. আধুনিক গ্রিড ও স্টোরেজ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি যাতে পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে, তার জন্য আধুনিক গ্রিড ও শক্তিশালী স্টোরেজ অপরিহার্য। বিনিয়োগের অনুপাত গ্রিড ও স্টোরেজ খাতে ৬০ সেন্ট থেকে বাড়িয়ে ডলারপ্রতি ১ ডলার করতে হবে।
৩. বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদা পূরণ: সব দেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে, ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা নবায়নযোগ্য উৎস থেকেই পূরণ হবে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিকেও এতে এগিয়ে আসতে হবে।
৪. ন্যায্য রূপান্তর: জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জরুরি খনিজ সরবরাহের শৃঙ্খলে জবাবদিহিতা ও পরিবেশ-সম্মত সংস্কার আনতে হবে।
৫. বাণিজ্য ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ: নবায়নযোগ্য শক্তির সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করতে হবে। শুল্ক হ্রাস, বিনিয়োগ চুক্তির সংস্কার ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই রূপান্তরকে গতিশীল করতে হবে।
৬. উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ: আফ্রিকা, যেখানে বিশ্বের ৬০% সেরা সৌর সম্পদ রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ মাত্র ২%- এটি পরিবর্তন করতে হবে। ঋণ শোধে বাজেট সংকট যেন না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ঋণদান সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থাও আধুনিক করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।
পরিশেষে, এক নতুন জ্বালানি সম্ভাবনার যুগ আমাদের দুয়ারে। সাশ্রয়ী, প্রাচুর্যময় ও নবায়নযোগ্য শক্তি আমাদেরকে এক নিরাপদ, টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে পারে- যেখানে বিদ্যুৎসেবা থাকবে সবার নাগালে।
এই মুহূর্তটাই সময়- বিশ্বব্যাপী রূপান্তর ত্বরান্বিত করার। আসুন, আমরা এই সুযোগ কাজে লাগাই।
আন্তোনিও গুতেরেস, মহাসচিব, জাতিসংঘ। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

