বাংলাদেশের আর্থিক খাত বর্তমানে এক জটিল চাপে রয়েছে, যার মূল উৎস—বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের লাগামহীন বিস্তার। আন্তর্জাতিক করপোরেশনগুলো যেখানে সাধারণত তাদের মূল দক্ষতার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে দেশের অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক খাত পরিবর্তন করে চলেছে সাধারণ কোনো আর্থিক বিশ্লেষণ ছাড়াই। তাদের ভাবনা যেন এমন: “সে পারলে, আমিও পারব।” এর ফলে একটি গ্রুপ ১০ থেকে ৫০টি ভিন্ন খাতে ব্যবসা ছড়িয়ে ফেলছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ব্যবসা লাভজনক নয় মাত্র কয়েকটি ইউনিটই কিছুটা মুনাফা করছে।
এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার থেকেই শুরু হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক সংকট। লোকসানি ইউনিটগুলো বন্ধ না করে, গ্রুপের লাভজনক প্রতিষ্ঠানের টাকায় এগুলো টিকিয়ে রাখা হয়। মুনাফার প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় এবং সেই অর্থ ‘ইন্টার-কম্পানি লেনদেন’-এর মাধ্যমে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে ঢেলে দেওয়া হয়। এতে লাভজনক ব্যবসাগুলোর ওপর চাপ পড়ে, আর পুরো গ্রুপই আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অনেক সময় আর্থিক প্রতিবেদনে সাজানো হিসাব দেখিয়ে লোকসান গোপন করা হয়। এতে ব্যাংকগুলো বাস্তব অবস্থা না বুঝেই ঋণ দিতে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে ঋণের সামঞ্জস্য থাকে না। এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে ব্যাংক খাত। বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর কাছেই মূলত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। অথচ সেই অর্থের বড় অংশই চলে যাচ্ছে লোকসানি সিস্টার কনসার্নগুলোতে। ফলে ঋণ খেলাপি বাড়ছে, সুদের বোঝাও বাড়ছে—যা শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যাংকিং খাতকেই অস্থিতিশীল করে তুলছে।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে প্রভাব, অতিরিক্ত আশাবাদিতা ও বাস্তবতা অস্বীকারের প্রবণতা। শক্তিশালী ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো সহজে নিয়ন্ত্রণে আসে না। অনেক উদ্যোক্তা লোকসানি ব্যবসা ছাড়তে চান না—গর্ব বা মিথ্যা প্রত্যাশার কারণে। ব্যাংকগুলোও কখনো কখনো এসব অনিয়ম দেখে না দেখার ভান করে, ঋণের যথাযথ ব্যবহার বা হিসাবের গড়মিল যাচাই করে না।
ফলে তৈরি হচ্ছে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট বাড়ছে, ঋণ পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও ঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত রক্তক্ষরণে দুর্বল হচ্ছে, লোকসানি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে। অনেক উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির চিন্তা না করে, কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে ‘ঘুরে দাঁড়ানোর’ আশা করছেন।
এই সমস্যার সমাধানে চাই মানসিকতা ও ব্যবসায়িক আচরণে মৌলিক পরিবর্তন। উদ্যোক্তাদের বুঝতে হবে, সব ব্যবসা সফল হবে না—এটা মেনে নেওয়াটাই বাস্তবতা। লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে, টিকিয়ে রাখার চেষ্টা নয়। ব্যাংকগুলোকেও ঋণের ব্যবহার কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে এবং অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে কেবল আর্থিকভাবে স্থিতিশীল প্রকল্পগুলোতে। একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত হিসাব জালিয়াতি ও ঋণ অনুমোদনের অনিয়ম বন্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে, সিস্টার কনসার্নের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ এক ধরনের আর্থিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে। লাভজনক প্রতিষ্ঠান দিয়ে লোকসানি ব্যবসা চালানো অব্যাহত থাকলে, ভবিষ্যতে এই চাপ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। এক্ষেত্রে দায়িত্ব নিতে হবে উদ্যোক্তা, ব্যাংক এবং নিয়ন্ত্রকদের—তবেই রক্ষা পাবে অর্থনীতি।
লেখক: মাসুদ খান
চেয়ারম্যান, ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার লিমিটেড।

