বাংলাদেশ, যার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি ৩৫ বছরের নিচে, এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে- যা জাতির প্রস্তুতিকে পরীক্ষা করছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম যেভাবে নতুন কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতের অপরিহার্য দক্ষতা- যেমন সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং জটিল সমস্যা সমাধান—নিয়ে আলোকপাত করছে, আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা প্রয়োজন: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান ও মানসিকতা কি তরুণদের এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করছে?
উদ্বেগজনকভাবে, সিলিকন ভ্যালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অভিযোগ করছে, তারা ক্লাসে কিছুই শিখছে না। এটি শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের এক বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত দেয়। যদি সবচেয়ে সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যর্থ হয়, তবে পরীক্ষাভিত্তিক ও তত্ত্বনির্ভর বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষগুলো সম্পর্কে আমরা কী বলব? আমরা কি সত্যিই আমাদের তরুণদের এই ‘বিঘ্নের যুগে’ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করছি?
শিক্ষার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে, বাংলাদেশের তরুণদের দৈনন্দিন জীবনে এক নীরব সংকট জেঁকে বসছে: সামাজিক দক্ষতার ধারাবাহিক ক্ষয়। প্রতিদিন গড়ে কয়েক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটানোর ফলে অর্থবহ আলাপ চালানো, সহানুভূতি অনুশীলন করা এবং বাস্তব মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। যে প্রাণবন্ত সংস্কৃতিতে ছিল আড্ডা, মতবিনিময়, যৌথ অভিজ্ঞতা—তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এক ডিভাইসনির্ভর জীবনে, যেখানে লাইক, শেয়ার ও ফিল্টার করা ছবিই হয়ে উঠছে আসল যোগাযোগের বিকল্প।
যে রাস্তাগুলো একসময় হাসি, বিতর্ক ও স্বতঃস্ফূর্ত কথোপকথনে মুখর থাকত, এখন সেখানে মাথা নিচু করে আলোর স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা মানুষের নীরবতা বিরাজ করে। যখন ভার্চুয়াল স্বীকৃতি আত্মসচেতনতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন থেমে ভাবা প্রয়োজন—আমরা কি এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলছি, যারা ধীরে ধীরে মুখোমুখি যোগাযোগের ক্ষমতা হারাচ্ছে?
আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো মেধা পাচার। প্রতিবছর বাংলাদেশের হাজারো মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষা, অর্থবহ কর্মসংস্থান এবং যোগ্যতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনকে মূল্যায়ন করে এমন পরিবেশের সন্ধানে বিদেশে চলে যাচ্ছে। অনেকে আর ফিরে আসে না। বৈশ্বিক গতিশীলতা স্বাভাবিক হলেও, যে হারে মেধা দেশ ছাড়ছে, তা একটি গভীর সমস্যার সংকেত দেয়। তারা শুধু বেশি বেতন বা বিদেশি ডিগ্রির জন্য দেশ ছাড়ে না, বরং মর্যাদা, উদ্দেশ্য এবং দুর্নীতি, জটিল আমলাতন্ত্র ও স্থবিরতা-মুক্ত সুযোগের খোঁজে বের হয়।
বাংলাদেশের পাসপোর্টের নিম্নমান বৈশ্বিক ভ্রমণের সুযোগ সীমিত করার পাশাপাশি বিশ্বপরিসরে স্বীকৃতি পাওয়াকেও বাধাগ্রস্ত করে। একটি দেশ যখন তার তরুণদের ওপর বিনিয়োগ করেও তাদের উৎপাদনশীল বয়সে হারিয়ে ফেলে, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি এমন একটি দেশ তৈরি করেছি, যেখানে তরুণরা ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, নাকি এমন একটি দেশ, যেখান থেকে তারা পালাতে চায়?
অর্থবহ কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সবচেয়ে হতাশাজনক বাস্তবতাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক এমন এক চাকরির বাজারে প্রবেশ করে, যেখানে সুযোগের চেয়ে প্রত্যাখ্যানই বেশি। অনেকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে, অস্থায়ী চাকরি থেকে আরেকটিতে ঘুরতে থাকে, অথবা এমন কাজে থিতু হয় যা তাদের দক্ষতা বা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মেলে না। আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি যতটা চাকরি তৈরি করতে পারে, তার চেয়ে বেশি চাকরিপ্রার্থী তৈরি হচ্ছে, ফলে অনেকেই চলে যায় অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। দেশে অনেক তরুণ বেকারত্ব থেকে মুক্তির পথ হিসেবে স্টার্টআপ উদ্যোগে ঝুঁকে পড়ে, নিজস্ব শর্তে উদ্ভাবন ও সফলতার স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু বৈশ্বিক গবেষণা বলছে, সফল উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে বেশি বয়সী, অভিজ্ঞ ও গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠাতারাই এগিয়ে থাকে। যখন বিশ্ব তরুণ উদ্যোক্তাদের রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করে কিন্তু যথেষ্ট সহায়তা ও জায়গা দেয় না, তখন আমরা কীভাবে আশা করব যে তারা টিকে থাকবে?
বাংলাদেশের অনেক তরুণ দ্বিমুখী মানদণ্ডে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় উভয় ক্ষেত্রেই এসব বৈপরীত্য স্পষ্ট। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো গোপনীয়তার অধিকার প্রচার করে, অথচ আড়ালে ব্যবহারকারীর তথ্য থেকে মুনাফা করে। জলবায়ু সম্মেলনে নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, অথচ সেই নেতারাই ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করেন এবং নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদন করেন। পরাশক্তিগুলো বিদেশে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেয়, কিন্তু নিজেদের স্বার্থে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো অন্যদের নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানায়, অথচ নিজের অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করে না। কেউ কেউ জাতি, ধর্ম বা রাজনীতির ভিত্তিতে কিছু শরণার্থীকে গ্রহণ করে, অন্যদের ফিরিয়ে দেয়।
ক্রীড়াবিদরা প্রতিবাদের জন্য প্রশংসা পান, কিন্তু তাদের মতামত শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকদের চ্যালেঞ্জ করলে সমালোচিত হন। এ ধরনের বৈপরীত্য তরুণদের সঠিক-ভুল, নীতি-আকাঙ্ক্ষা বোঝা কঠিন করে তোলে এবং আস্থা নষ্ট করে। যখন চারপাশের বিশ্ব নৈতিকতার সীমা বদলাতে থাকে, তখন আমরা কীভাবে আশা করব এই প্রজন্ম একটি সুস্পষ্ট নৈতিক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করবে?
তবে বৈপরীত্য, হতাশা ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও বাংলাদেশের এক বাড়ন্ত তরুণ প্রজন্ম নীরব বা উপেক্ষিত থাকতে চাইছে না। তারা নেতৃত্বের ভূমিকায় আসছে, কমিউনিটিতে সংগঠিত হচ্ছে, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে এবং ডিজিটাল মাধ্যমকে শুধু প্রকাশের জন্য নয়, বরং তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করছে। জলবায়ু আন্দোলন থেকে শিক্ষা সংস্কার, সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে সবুজ ব্যবসা প্রচার—তরুণরা শুধু অন্তর্ভুক্তি চাইছে না, বরং তাদের প্রস্তুতিও প্রমাণ করছে। এখন তাদের প্রয়োজন প্রতীকী প্রশংসা নয়, বরং বাস্তব সুযোগ, ধারাবাহিক পরামর্শ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা।
শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না—কারণ তারাই এই ভবিষ্যৎ বাঁচবে এবং এর ফল ভোগ করবে। যদি আমরা আমাদের তরুণদের বিশ্বাস করি, উদ্দেশ্যমূলক চ্যালেঞ্জ দিই এবং বর্তমান নির্মাণে অন্তর্ভুক্ত করি, তবে আমরা শুধু ভালো নেতৃত্বই পাব না, বরং একটি শক্তিশালী ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
- ড. ইফতেখার উল করিম ব্র্যাক বিজনেস স্কুল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং নির্বাহী শিক্ষা ও শিল্প সংযোগ বিভাগের পরিচালক। সূত্র: ডেইলি স্টার

