গত ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজান শুরুর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কমিশনও ঘোষিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফশিল ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে।
বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন একতরফা হয়েছে। একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলতে ন্যূনতম যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বোঝায়, অন্তত সেটা ওই নির্বাচনগুলোয় ছিল না, সবই হয়েছে ক্ষমতাসীনদের মনমতো। ফলে ভোটার উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। সে প্রেক্ষাপটে দেশের তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের অধিকাংশই জীবনের প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায় আছেন। স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় আর কখনোই দেশ জনগণের সম্মতিহীন একটা সরকারের অধীনে ছিল না। তাই সে সরকারের পতনের পর দেশের জনগণ নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হওয়াই স্বাভাবিক। মূলত তারই প্রকাশ দেখছি নির্বাচনের ঘোষণার পর।
তবে একইসঙ্গে জনপরিসরে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ঘিরে বেশ কিছু ঝুঁকি ও সংকটও আলোচনায় এসেছে। বিশেষত বিদ্যমান নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এ আলোচনার পালে বাতাস দিয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আছেন আট লাখ। সেটা আরও ৫০ হাজার বাড়ানো হবে। নির্বাচনে ৬০ হাজার সেনাবাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এ সংখ্যাও বাড়ানো হবে। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, নির্বাচনকালে নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে থাকা উচিত, যেহেতু বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুলিশের কাঠামো রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। তাঁর এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৫৪ বছরে আমাদের বেসামরিক প্রশাসন সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি, এটা নিশ্চয় হতাশার কথা। তবে এর জন্য দায়ী যে মূলত অসুস্থ রাজনীতি এবং তার সুযোগ গ্রহণকারী দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্র, এটাও স্বীকার করতে হবে। অসুস্থ রাজনীতির ধারক-বাহক এবং দুর্নীতিবাজ আমলাদের সমন্বয়ে একপ্রকার প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট চক্র গড়ে উঠেছে; যারা সুযোগ পেলেই কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকেও ভণ্ডুল করে দেয়।
১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচন থেকেই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় সেনাবাহিনী ভূমিকা রেখে আসছে। মাঝখানের দুই সামরিক শাসনের সময় তো বটেই। ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে যাওয়ার নির্বাচনেও একই ধারা অনুসরণ করা হয়। পরবর্তী সব নির্বাচনেই এ রীতি অব্যাহত থাকে। সে হিসেবে আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন কোনো অবিনব ঘটনা নয়। তবে পুলিশের যে নজিরবিহীন ভঙ্গুর অবস্থা চলছে, তাই সামনের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর বাড়তি ভূমিকার দাবি জোরালো করছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে পেশিশক্তির প্রতিযোগিতা, ভোটকেন্দ্র দখল ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা এ দেশে নতুন কিছু নয়। যে কোনো উপায়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার প্রবণতা এখানে আগেও ছিল, এখনও আছে বললে ভুল হবে না। এসব সংকট মোকাবিলায় মাঠে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অপরিহার্য। জনগণের মধ্যে এই ধারণা ব্যাপক যে, মাঠে সেনাবাহিনী থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তবে জনগণের এ আস্থার প্রতিদান দিতে হলে আইনকে যেমন তার পথে চলতে দিতে হবে, তেমনি সেনা সদস্যদেরও কার্যক্রমে কোনো মহলেরই রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থাকা চলবে না।
এটাও সত্য, এ বিষয়টি শুধু সরকার যেমন নিশ্চিত করতে পারবে না, তেমনি শুধু নির্বাচনের অন্যতম অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলো চাইলেই তা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার ও রাজনৈতিক দলের সমন্বিত উদ্যোগ লাগবে। নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত সেনা সদস্যরাও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের নিরপেক্ষতা শতভাগ বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করবেন।
সূত্র: সমকাল

