চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার প্রতি এ দেশের মানুষের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটে। প্রবল প্রতাপ, ছলচাতুরী ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জনবিস্ফোরণের মূলে ছিল গণমানুষের যূথবদ্ধ গণতান্ত্রিক স্পৃহা। গণঅভ্যুত্থানের পর সব দল ও মতের সমর্থনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার তাই শেষ ছিল না।
তবে সব প্রত্যাশার কেন্দ্রে অবশ্যই ছিল এবং আছে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ। এ-ও প্রত্যাশা ছিল, বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস এমন কিছু দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ নেবেন, যা পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের সামনে উদাহরণ হিসেবে থাকবে।
গণঅভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাস্তব কারণেই অনেক প্রত্যাশাকে থমকে দেয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ়তার ঘাটতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বলতার পরিচয় বহুবারই পাওয়া গেছে। মব সন্ত্রাস সমাজের বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে। চলতি বছর সাড়ে আট মাসে কেবল গণপিটুনিতেই নিহত হয়েছেন ১১৭ জন। সমকাল জানাচ্ছে, ‘তিনটি জেলায় বৃহস্পতিবার রাত ও শুক্রবার অপবাদ ছড়িয়ে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় (২৩ আগস্ট ২০২৫)।’ দেশের পুলিশি ব্যবস্থা যখন দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়, তখন এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। এ কথাও সত্য, সরকার কঠোরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বলেই মব সন্ত্রাস বেড়েছে। কিছু ঘটনায় সরকারের নির্লিপ্ততা আইন ভাঙার ক্ষেত্রে সুযোগসন্ধানীদের উৎসাহিত করেছে। বিধ্বস্ত পুলিশের মনোবল ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনবার ক্ষেত্রে সরকারের অনির্দিষ্ট পদক্ষেপও বাহিনীটির নিষ্ক্রিয়তা বাড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার অনমনীয় ও দৃঢ় থাকলে সন্ত্রাস, অরাজকতার রাশ টেনে ধরা সম্ভব। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও প্রধান প্রতিবন্ধক হতে পারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এ নিয়ে সরকারের উদ্যোগ জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। জানিয়ে দিতে হবে, আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনী বিধিমালায় সবই লেখা আছে; তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু কেতাবি বিধিমালায় কাজ হবে না। নির্বাচনে কঠোর শৃঙ্খলা সরকারকে নিশ্চিত করতেই হবে। এক সকালে আচম্বিত সব বন্দোবস্ত হয়ে যাবে না। তাই এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো, কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করতে হবে।
২.
স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে বিপুল জনমত তৈরি হয়। ড. ইউনূস বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠন করেন। সংস্কার প্রশ্নে সরকার সত্যিকার অর্থে কতদূর কী করতে পারছে বা পারল– এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় তৈরি হয়েছে। একমাত্র নির্বাচন ও সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কার কমিশন বাদে অন্য কমিশনগুলোর প্রতিবেদন-পরবর্তী তৎপরতা জানা যায় না। প্রধান উপদেষ্টা স্বয়ং কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এসব বিষয়ে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন কিনা, জানা যায়নি। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিটির সুপারিশে ড. ইউনূস উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, যে কয়টি সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব তা শুরু করতে হবে। তারপর উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সভা থেকে এ ব্যাপারে অরুচিকর ভাষায় অযৌক্তিক আপত্তি উত্থাপিত হলে নারীবিষয়ক সংস্কার সম্পর্কিত যাবতীয় আলোচনা হিমাগারে চলে যায়।
প্রশ্ন জাগে, প্রবল জনসমর্থিত সরকারের মেরুদণ্ড এত দুর্বল কেন? ড. ইউনূসের সারাজীবনের কাজ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে দেশের আর্থসামাজিক সংস্কার প্রশ্নে তাঁর নীরবতা ও নিস্পৃহতা অবশ্যই হতাশাজনক। তৃণমূল নারীর জীবনমান উন্নয়নে ড. ইউনূসের অবদান বিশ্বশ্রুত। তাঁর সামনে আজ দেশের আপামর নারীর জীবন উন্নয়নে সংস্কারের সুবর্ণ দুয়ার; তিনি কেন নিশ্চুপ! দেশের মানুষ কি এই সংস্কার চান না? যদি তাই হয়, অন্য ১১টি বিষয়েও তো দেশের মানুষের মনোভাব জানবার প্রয়োজন থাকে। সে বিষয়ে সরকার একেবারেই নিষ্ক্রিয়তার পরিচয় দিয়েছে।
সত্য যে, রাজনৈতিক দলগুলো জনমানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই বলে, কয়েকটি গোষ্ঠীই সারাদেশের মানুষের প্রতিনিধি হতে পারে না। সংস্কার প্রশ্নে জনসম্পৃক্ততার এই অভাব অবশ্যই একটি গুরুতর প্রসঙ্গ। সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এত সংখ্যক সংস্কার কমিটি গঠন করলেও সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো কমিশন করেনি। দেশের বাজেটে শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ হয়, জিডিপির অংশ হিসেবে তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম। অন্তর্বর্তী সরকার এই বাজেট বরাদ্দ যুক্তিসংগত কারণেই বাড়াতে পারত। তা হয়নি।
৩.
ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ের ১৮ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধনের ফলক উন্মোচন করতে গিয়ে শ্বেতপাথরে উদ্বোধক হিসেবে নিজের নাম দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা। তিনি জানতে চান, ‘এটা কি আমার বাপের টাকায় করেছে? তাহলে কেন আমার নাম থাকবে (সমকাল, ২৪ আগস্ট ২০২৫)?’ উপদেষ্টা ফলক উন্মোচন না করে ফিতা কেটে উদ্বোধনের কাজ সারেন এবং রেগে স্থান ত্যাগ করেন। এটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলেও উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত রাগ-অনুরাগ-অভিমান যতটা প্রকাশ্য হয়; ততটা তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নিয়মিত পদক্ষেপের কথা দেশের মানুষ জানতে পারে না।
সড়ক উপদেষ্টা তাঁর কার্যকালে রাজধানীর সড়ক শৃঙ্খলা তৈরিতে আদৌ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন? নানা প্রকার ও আকারের অবিরত পরিবহনে ভারাক্রান্ত সড়ক; দেখভালের কোনো ব্যবস্থা নেই।
বাস নামের প্রহসনমূলক গণপরিবহন দেখলে মনে হয়, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে চলে এসব বাহন; রং-চলটা সব উঠে কঙ্কালসার; যত্রতত্র দাঁড়িয়ে গাড়ি; মানুষ এলোপাতাড়ি দৌড়ে পার হচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক; কোনো কোনো জরুরি রাস্তার দুধার আটকে নিজেরাই স্থায়ী জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে ট্রাক ও বাস। আধুনিক বিশ্বে এটি এক বিরল রাজপথ– বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার চূড়ান্ত ঠিকানা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানেই জ্যামে বসে থাকতে হয় নগরবাসীকে। মাননীয় উপদেষ্টা রাগ না দেখিয়ে এসব দেখলে মানুষের জীবন খানিকটা সহনীয় হতে পারত।
সরকারের কাছেই মানুষ প্রত্যাশা করে, করবে। এ জন্যই জনগণের সরকার চায় তারা। আগামী ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন। এই সময়ের মধ্যে সরকারকে সুনির্দিষ্ট ও জনসম্পৃক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, তারা কী করছে; কী করতে যাচ্ছে! বিশেষত নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে প্রতিটি বিষয় জাতির সামনে পেশ করা জরুরি। স্পষ্ট আচরণের বিপরীতে সরকারের নীরবতা নানাভাবে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও দ্বিধার সৃষ্টি করে। নীরব না থেকে দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে পদক্ষেপগুলোও সময় সময় জাতিকে জানানো সরকারের দায়িত্ব।
দেশের স্বার্থ আর সবকিছুর ওপরে– এই সত্য মাথায় রেখে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে ড. ইউনূস ও তাঁর সরকারকে দেশের এই সন্ধিক্ষণে গুরুদায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে হবে। এই দায়িত্ব হতে হবে দলনিরপেক্ষ, নৈতিক ও কঠোর আইনি কাঠামোকেন্দ্রিক। দেশের শৃঙ্খলা রক্ষা করে মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা আনা সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব। সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরির প্রথম ধাপ হিসেবে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন ড. ইউনূসের সরকার সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করবে– জাতির মূল আকাঙ্ক্ষা এটাই।
- মাহবুব আজীজ: সমকালের উপসম্পাদক ও সাহিত্যিক।

