বিশ্বব্যাপী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সহযোগিতা, প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, উদ্ভাবনকে গতিশীল করা এবং দক্ষতার নিশ্চয়তা প্রদানে এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
বিশেষত যখন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) সুশৃঙ্খল ও সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন এটি সরকারের জন্য বেসরকারি খাতের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সেবা প্রদান সম্ভব করে তোলে। পাশাপাশি সমতা বজায় রাখে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সেবাপ্রদানে বেসরকারি খাতের ভূমিকাই তুলনামূলকভাবে বড়।
২০২২ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, অসুস্থ হলে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যায়। আর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাথমিক সেবার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কিংবা ফার্মেসিতে যায়।
এ তথ্যই প্রমাণ করে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ কনক্লেভে (বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫) অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, বেসরকারি খাতনির্ভরতায় জনগণকে নিজ খরচে স্বাস্থ্যসেবা নিতে হচ্ছে। এর একটি বড় কারণ এ দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ে সরকারের বিনিয়োগ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক-উভয় পর্যায়েই তুলনায় অনেক কম।
বাংলাদেশের সরকার স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশেরও কম বিনিয়োগ করে। ফলে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশই জনগণকে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়। প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ মানুষ শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দরিদ্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের বৈশ্বিক লক্ষ্য পূরণে দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ধারণাটি হলো সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং অর্থায়নের অভাবে যাতে কারো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ ব্যাহত না হয়। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান দেশের জন্য একটি কৌশলগত স্বাস্থ্য অর্থায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে সরকারকে সহায়তা করছে, যাতে জনগণ চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে দারিদ্র্যের শিকার না হয়। অর্থাৎ আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
আমি অন্যদের কাছ থেকেও শুনেছি, দেশে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নিজেদের পকেট থেকেই ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। এতে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান, আস্থা ও ক্রয়ক্ষমতাকে প্রতিফলিত করছে।
তাহলে কি পিপিপি স্বাস্থ্য খাতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে? হ্যাঁ, হতে পারে। এটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রমাণিত। তবে পিপিপি যেন শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক ও চিকিৎসাভিত্তিক সেবায় সীমাবদ্ধ না থাকে। কারণ দেশে এরই মধ্যে বেসরকারি খাত স্বাস্থ্যসেবায় বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের একটি বড় সুযোগ রয়েছে। বৈশ্বিকভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার পথে অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৯ ডলারের সমপরিমাণ রিটার্ন দেশের অর্থনীতিতে ফিরে আসে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, বিশেষ করে সরকারি খাত, বর্তমানে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট রয়েছে। মূলত সরবরাহ প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা এখানে প্রধান সমস্যা। এজন্য বেসরকারি খাতের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে পরিপূরক করা যেতে পারে। কিউরেটিভ সেবার বাইরে গিয়ে বেসরকারি খাত কমিউনিটিভিত্তিক ও সাশ্রয়ী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে পারে, যা পরে সরকার কিনে নিয়ে দেশের নাগরিকদের ব্যয়সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষকে যাতে চিকিৎসার জন্য ব্যক্তিগত খরচ করতে না হয়।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এনজিওদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং সমাজে তাদের আস্থা আমরা ভুলে গেলে চলবে না। ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ভূমিকা শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বেসরকারি খাতকে স্থানীয় অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (API) উৎপাদন, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রযুক্তিতে উদ্ভাবনী শক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো উচিত।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বকে শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি খাতের সুযোগ-সুবিধা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানো প্রসঙ্গে সরকারের সুশাসনের ভূমিকা অপরিহার্য। পিপিপি মডেল সফল করতে হলে সরকারের শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। মান, মূল্যনির্ধারণ এবং জবাবদিহির কঠোর নিয়ন্ত্রণ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কেবল সেবা বৃদ্ধিই করবে না, বরং তা হবে অধিকতর মানসম্মত, সাশ্রয়ী ও ন্যায্য।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি সরকারি অন্যান্য সহযোগী সংস্থা এবং বিভিন্ন খাতের সহযোগিতারও প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে একা কাজটি করা কঠিন। সরকারকে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ নিশ্চিতের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্যান্য মন্ত্রণালয়কেও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষায়, পরিবেশ, পুষ্টি ও জলবায়ুতে বিনিয়োগের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয় একসঙ্গে মিলেই জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নির্ধারণ করে। এখন সময় হাত মিলিয়ে কাজ করার, যেন বাংলাদেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করতে পারে এবং কেউ পিছিয়ে না পড়ে কিংবা চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে দারিদ্র্য না হন।
- সাঙ্গে ওয়াংমো: টিম লিডার, হেলথ সিস্টেম ইউনিট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ
[‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’- বণিক বার্তা আয়োজিত]

