অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণের একটি রূপকল্প ঘোষণা করেছে। সে অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। এই লক্ষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে জাতীয় শক্তিগুলো একটা দিকনির্দেশনা পেয়েছে। এটি একটি বিষয়।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, সেটি হলো সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সংস্থা পিপিআরসি (পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার) একটি জরিপ করেছে। এতে দেখা গেছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৮ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২২ সালের সরকারি হিসাবে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এদিকে আমরা দেখছি, এক বছর ধরে সরকার ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ পুরো সময় ব্যয় করেছে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনার পেছনে।
সংস্কার, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনা—এগুলো সবই হোক এবং তার মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ। তবে মাঠ বাস্তবতায় মানুষ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে বড় ধরনের বার্তা দিয়েছে পিপিআরসির জরিপ। বার্তাটি হলো, দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রে আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। এই বার্তা উপেক্ষা করার অবকাশ নেই। এটাকেও সমগুরুত্ব নিয়ে জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
তৃতীয় যে বিষয়টি বলব, সেটি হলো গণতান্ত্রিক উত্তরণের রূপকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু অনিশ্চয়তা আছে। কীভাবে এটা মোকাবিলা করা যায়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে আবার আমি তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রথমটি হলো ‘অনুপস্থিত সরকার’। সরকারকে আমরা প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কার্যকর শাসনের ক্ষেত্রে একধরনের ‘অনুপস্থিত সরকার সিনড্রোম’ (লক্ষণ) দেখা যাচ্ছে। সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার নানা ধরনের ঘটনা ঘটছে এবং সেগুলো বিস্তার লাভ করছে। সেখানে অনুপস্থিত সরকার ‘সিনড্রোম’ রয়েছে এবং তা অনিশ্চয়তা তৈরির একটি অন্যতম কারণ। এসব ক্ষেত্রে সরকার যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সহিংস ঘটনা বাড়বে এবং নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা হতে পারে। পাশাপাশি একটি কম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আশঙ্কা থাকে।
তৃতীয় বিষয়টি হলো, গণতান্ত্রিক উত্তরণের সঙ্গে গুণগত শব্দটি যোগ করা উচিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। এখন শুধু গণতান্ত্রিক উত্তরণ হলে হবে না, দরকার গুণগত মানসম্পন্ন উত্তরণ। রাষ্ট্রে সার্বিক কার্যকর শাসন ও মানুষের অধিকারভিত্তিক অবস্থান নিশ্চিত করাই হলো গুণগত উত্তরণ। সেই উত্তরণের ক্ষেত্রে নিশ্চয়তার অভাব দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এগোতে হবে।
আমি মনে করি, ঐকমত্যের ‘ড্রয়িং রুম’ আলোচনার বাইরে একটি সামাজিক উদ্যোগ দরকার। ঐকমত্যের আলোচনায় সরকার, সরকারের নিয়োজিত কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে। আমি তাঁদের সাফল্য কামনা করি। কিন্তু দেখছি, তাঁরা তেমন আশাবাদ তৈরি করতে পারছেন না। অনিশ্চয়তা শুধু মুখের কথায় দূর হবে না।
আমি মনে করি, ঐকমত্যের প্রক্রিয়া চলুক। কিন্তু গুণগত পরিবর্তনের অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা তৈরির জন্য আরেকটি নতুন উদ্যোগে আমাদের শামিল হওয়া উচিত। আমি পাঁচটি নীতি সংলাপের প্রস্তাব করছি। এর আয়োজক হবে সামাজিক শক্তি। সেখানে তিন ধরনের ‘অ্যাক্টর’ থাকবে—রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও পেশাজীবী।
প্রথম নীতি সংলাপ হবে অর্থনীতি নিয়ে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের সঙ্গে অর্থনীতির পুরোনো অলিগার্কিক মডেলের (মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালীর নিয়ন্ত্রণে থাকা) বদল দরকার। দ্বিতীয়টি হবে শিক্ষা নিয়ে। কারণ, শিক্ষা একটি লাইনচ্যুত বাস্তবতায় রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। তৃতীয় সংলাপটি হবে স্বাস্থ্য নিয়ে। এ খাত বেহাল। কিন্তু খাতটি মানুষের জীবনে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। চার নম্বরটি হবে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার নিয়ে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্যতম একটি স্তম্ভ অতিমাত্রায় কেন্দ্রীকরণ। পাঁচ নম্বর নীতি সংলাপটি হবে ভূরাজনীতি ও ভূকৌশল নিয়ে। এ ক্ষেত্রে সংলাপে পেশাজীবী বলতে আমি সশস্ত্র বাহিনীকেও বোঝাচ্ছি।
আমি মনে করি, পাঁচটি নীতি সংলাপ আমাদের গুণগত গণতান্ত্রিক উত্তরণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা পিপিআরসির জরিপে দেখেছি, দারিদ্র্যের কশাঘাতের মধ্যেও মানুষ হাল ছেড়ে দিতে রাজি নয়। আমরা কেউ হাল ছেড়ে দিতে পারি না। চেষ্টা আমাদের করে যেতেই হবে। তবে কাগুজে প্রতিশ্রুতির প্রতি আমাদের আর আকর্ষণ নেই।
- হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। সূত্র: প্রথম আলো

