২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষভাগ থেকে মে মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ঘিরে এক ধরনের মিশ্র চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, সংকট অনেকটাই কমে এসেছে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের দিকে এগোচ্ছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়—সাধারণ মানুষের জন্য লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত যেন এক দ্বৈত বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে উৎপাদন ঘাটতি, জ্বালানি আমদানির চাপ ও সরবরাহ সংকট পুরোপুরি কাটেনি; অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে “সংকট কেটে যাচ্ছে”—এমন সরলীকৃত ধারণা বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত করে না। বরং বলা যায়, দীর্ঘদিনের এই সংকট এখনো বহাল থাকলেও তা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
অর্থাৎ কাগজে-কলমে উন্নতির ইঙ্গিত থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংকটের প্রভাব এখনো স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে—যা পুরো খাতটিকে এক জটিল ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি না কাটার পেছনে একাধিক গভীর ও আন্তঃসম্পর্কিত কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্যাস সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে স্থবির, আর আমদানিকৃত এলএনজির সরবরাহও চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, যা সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সংকট। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে গিয়ে বকেয়া পরিশোধে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থানীয় বাজারে ডিজেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শিল্প ও সেচ খাতে জেনারেটর ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় এই চাপ আরও তীব্র হয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং সামগ্রিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
এছাড়া অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ। অনেক পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়, আবার কিছু কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ বা জ্বালানি সংকটের কারণে আংশিক উৎপাদনে চলছে। ফলে কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকলেও বাস্তবে তার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, এই সংকট শুধু জ্বালানির ঘাটতির বিষয় নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, নীতিগত দুর্বলতা এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের সম্মিলিত ফল। তাই টেকসই সমাধানের জন্য সাময়িক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
প্রচণ্ড গরমের কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১৬,০০০ থেকে ১৭,০০০ মেগাওয়াটের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (PGCB)-এর তথ্যমতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২০,২৯০ মেগাওয়াট হলেও গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ সংকটের কারণে বাস্তবে প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মেগাওয়াট বা তারও বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই ঘাটতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পূর্ণ সক্ষমতায় না চলা। বিশেষ করে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র এবং বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট (SS Power) পুরো উৎপাদনে না থাকায় জাতীয় গ্রিডে চাপ আরও বেড়েছে। একই সময়ে এপ্রিল ২০২৬-এ দেশের লোডশেডিং পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কিছু স্বস্তির ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতির আংশিক উন্নতির দিকটি নির্দেশ করে। সরকারি পর্যায় থেকে জানানো হচ্ছে, সংকট ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আগের তুলনায় স্থিতিশীল হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নতুন কেন্দ্র চালু এবং পুরোনো কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরু একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুনরায় চালু হওয়ার ফলে গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে, যা লোডশেডিং কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায়ও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, ফলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারির প্রবণতা কমে এসেছে। প্রাকৃতিক কারণ, বিশেষ করে বৃষ্টি ও ঝড়ের ফলে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও সাময়িকভাবে কমেছে, যা পরিস্থিতিকে কিছুটা সহনীয় করেছে।
তবে এই উন্নতি এখনো স্থায়ী নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি দূর করা এবং জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের সমাধান করা জরুরি। অন্যথায় সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা কঠিন হবে এবং সংকট আবারও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে ঘাটতি ও চাপের বাস্তবতা বহন করছে, অন্যদিকে কিছু স্বস্তির আভাসও দিচ্ছে। তবে এই আংশিক উন্নতিকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও সংকটমুক্ত করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞ ও সরকারি সূত্রগুলো মনে করছে। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন জোরদার করা, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে আসে। নতুন গ্যাস কূপ খনন ও বিদ্যমান কূপগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি করলে ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ দেশীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ এবং ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্পকে দ্রুত বিস্তৃত করা গেলে শিল্প ও আবাসিক খাতে বিদ্যুতের ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি টেকসই সমাধান হিসেবে কাজ করবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে কেন্দ্রগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো, শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করলে সামগ্রিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ও মেট্রোরেলের মতো পরিবহন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোও একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সবশেষে, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান কিছু আর্থিক কাঠামোগত সমস্যারও সংস্কার প্রয়োজন, বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জের মতো ব্যয়বহুল চুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি স্বচ্ছ ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। সব মিলিয়ে বলা যায়, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তির বিস্তার এবং খাতভিত্তিক সংস্কার—এই তিনটি দিকেই সমন্বিতভাবে এগোতে পারলেই কেবল এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব হবে।
দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। চাহিদা বৃদ্ধি, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে লোডশেডিং ও ঘাটতির চাপ এখনো রয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি এবং কিছু কেন্দ্রের পুনরায় চালু হওয়ায় পরিস্থিতিতে আংশিক স্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে। এ অবস্থায় বলা যায়, সংকট সম্পূর্ণ কাটেনি, তবে তা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনার একটি প্রক্রিয়া চলছে। দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধানের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও পরিকল্পিত সংস্কারই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

