বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক গভীর আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ, অন্যদিকে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানা পরিবর্তনের খবর প্রায়ই শিরোনাম হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—মালিকানা বদলালেই কি পুরনো ঋণের দায় শেষ হয়ে যায়, নাকি এটি কেবল আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও দায় এড়ানোর পুরনো সংস্কৃতির নতুন সংস্করণ?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন মালিকানার অধীনে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করছে। কোথাও পরিচালনা পর্ষদ বদলানো হচ্ছে, কোথাও নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন ঘটছে, আবার কোথাও নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ঋণের অর্থ ব্যাংকের নিজস্ব নয়; সেটি সাধারণ মানুষের আমানত এবং দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মালিকানা পরিবর্তন ব্যবসা পুনর্গঠনের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটি কখনোই খেলাপি ঋণ বা আর্থিক অনিয়মকে মুছে দেওয়ার বৈধ উপায় হতে পারে না। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের বাস্তবতায় বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারির দাবি রাখে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন শুধু আর্থিক দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ পুনঃতফসিল কিংবা নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে খেলাপি ঋণকে সাময়িকভাবে নিয়মিত দেখানো হলেও প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে আগের মতোই।
গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন ও দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে এসব নীতিমালার কিছু ধারাকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ অর্থপাচার বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত অনেক সাবেক পরিচালক ও মালিক নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে আর্থিক খাতে সুশাসনের পরিবর্তে প্রভাবশালীদের পুনর্বাসনের পথ আরও সহজ হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পর বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী সেই সুযোগ কাজে লাগায়। এমনকি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক প্রার্থীও ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। বিভিন্ন পুনঃতফসিল ও নীতিসুবিধার পর ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়।
বিশেষ ছাড়ের আওতায় প্রায় ৩০০ শিল্পগোষ্ঠী তাদের ঋণ নিয়মিত করেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোরতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, খেলাপি ঋণ কমানোর এই প্রবণতা বাস্তব আর্থিক উন্নতির চেয়ে হিসাবগত সমন্বয়ের ফল বেশি।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের সংকট দীর্ঘদিন ধরেই বাড়ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। পরে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেক গ্রাহকের দেশত্যাগ ও আর্থিক অস্থিতিশীলতার কারণে খেলাপি ঋণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ব্যাংকারদের মতে, গত দেড় দশকে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি আলোচিত কেলেঙ্কারি খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত অনিয়ম পুরো খাতের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকটে পড়েছে। পাশাপাশি প্রচলিত ধারার কিছু ব্যাংকেও বড় গোষ্ঠীগুলোর নামে বিতরণ করা বিপুল পরিমাণ ঋণের বড় অংশ পরে খেলাপিতে পরিণত হয়। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর। বেশ কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে গ্রাহকরা নিজেদের জমা অর্থ তুলতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ব্যাংকিং খাতে পুরনো অনিয়ম ও খেলাপি সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এখন বিভিন্ন নীতিগত ও প্রশাসনিক কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, একীভূতকরণ (মার্জার) কিংবা মালিকানা বদলের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পুরনো ঋণখেলাপিদের নতুনভাবে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মাত্র ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এসব ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে এবং শুরুতে দুই বছর পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে বিরতি সুবিধা থাকবে। তবে আগে যারা একই ধরনের নীতিসুবিধা নিয়েছে, তারা নতুন এ সুযোগের আওতায় আসতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত যেসব ঋণ খেলাপি হয়েছে, কেবল সেসব ঋণই এ সুবিধার আওতায় আসবে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে এবং ব্যাংকগুলোকে আবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে আদায় অযোগ্য হয়ে থাকা ঋণগুলোকে ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে বাদ দেওয়ার বা “ঋণ অবলোপন” করার প্রবণতাও বেড়েছে। এতে বাস্তবে অর্থ উদ্ধার না হলেও ব্যাংকের আর্থিক হিসাব তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন দেখানো সম্ভব হয়। ফলে প্রকৃত ঝুঁকির বড় অংশ পরিসংখ্যানের আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল বা ভঙ্গুর ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনগণের অর্থে মূলধন সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন আইনি কাঠামোর সুযোগ নিয়ে আগের পরিচালকরাই সামান্য ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথ তৈরি করছেন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ও পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সংকটকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে নতুন এ নীতিসুবিধা দেওয়া হলেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন আরও দুর্বল হতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবল খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান কমানো নয়, বরং কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রথমেই প্রয়োজন ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী করা। বর্তমানে আদালতকেন্দ্রিক দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ঋণ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে প্রাক-মামলা সমঝোতা, মধ্যস্থতা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা জরুরি।
একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দাবিও জোরালো হচ্ছে। বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বন্ধ এবং নতুন কোম্পানি নিবন্ধনে কড়াকড়ির মতো পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে প্রভাবশালী খেলাপিরা সহজে দায় এড়াতে না পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি ও ঋণ পুনরুদ্ধারের বর্তমান ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে জামানত থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো দ্রুত অর্থ উদ্ধার করতে পারে না। এ কারণে ভারতের ‘সারফেসি অ্যাক্ট’-এর মতো কার্যকর আইন অনুসরণ করে আদালতের দীর্ঘ হস্তক্ষেপ ছাড়াই বন্ধকী সম্পত্তি নিলামের সুযোগ তৈরির আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চাপের বাইরে থেকে ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে খেলাপি ঋণের সংকট বারবার ফিরে আসবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আধুনিক করা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনা এখন সময়ের বড় দাবি।
ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত সংস্কার কেবল খেলাপি ঋণের হিসাব কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রয়োজন এমন একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা, যেখানে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের জন্য কোনো বিশেষ দরজা খোলা থাকবে না। নইলে মালিকানা বদলাবে, নাম বদলাবে, কিন্তু পুরনো সংকটই নতুন রূপে ফিরে আসবে বারবার।

