সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন। বিচার কেন প্রকাশ্যে হওয়া উচিত—এই প্রশ্নের একটি ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছিলেন প্রায় এক শতাব্দী আগে ব্রিটেনের একজন বিচারপতি, যিনি বলেছিলেন, ন্যায়বিচার কেবল হলেই চলবে না, তা যে সত্যিই হয়েছে—এটাও জনগণের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির সদস্য রাষ্ট্র, যেখানেও প্রকাশ্য শুনানির নীতি স্বীকৃত। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো ফৌজদারি অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তি আইনসম্মত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে ন্যায্য ও প্রকাশ্য শুনানি পাওয়ার অধিকারী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আন্তর্জাতিক নীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে বাংলাদেশের সংবিধানে। অর্থাৎ প্রকাশ্য বিচার শুধু একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও একটি মৌলিক নীতি।
প্রকাশ্য বিচার বলতে বোঝায়, আদালতের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকবে। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া শুনানি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, যেকোনো নাগরিক আদালতকক্ষে বসে তা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন, আর সংবাদমাধ্যমও এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইনসম্মতভাবে সংবাদ প্রকাশ করতে পারবে। আমাদের সাংবিধানিক দর্শনের মূল কথাই হলো, বিচার কখনো গোপনে হবে না—বিচারক কীভাবে শুনানি পরিচালনা করছেন এবং কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছেন, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট থাকতে হবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের কিছু আদালতে, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকটি এজলাসে, সংবাদকর্মীদের প্রবেশে বাধা দেখা যাচ্ছে—যা দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত রীতির ব্যতিক্রম।
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের আদালত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার চর্চা লক্ষণীয়। যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতের শুনানি শুধু সাংবাদিকদের জন্যই উন্মুক্ত নয়, নিয়মিত সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়। কানাডার সর্বোচ্চ আদালতেও একই ধরনের চর্চা প্রচলিত। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে টেলিভিশন ক্যামেরার অনুমতি না থাকলেও সাংবাদিকরা সরাসরি উপস্থিত থেকে শুনানি পর্যবেক্ষণ করেন, আর আদালত নিজেই শুনানির অডিও প্রকাশ করে। কমন ল প্রচলিত অধিকাংশ দেশেও আদালত সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত থাকে, যদিও ছবি বা ভিডিও ধারণে কিছু যুক্তিসংগত নিয়ন্ত্রণ থাকে।
প্রতিবেশী ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এ ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। ২০১৮ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সেখানকার আদালত জানিয়েছিলেন, আদালত জনগণের প্রতিষ্ঠান, তাই ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। এরপর থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মামলার শুনানি সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়, এবং বলা হয়, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ায়। বর্তমানে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত নিয়মিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বেঞ্চের শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করে থাকে।
অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক প্রবণতা হলো আদালতকে ক্রমেই আরও উন্মুক্ত করা—কোথাও ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত, কোথাও সরাসরি সম্প্রচার সীমিত, কিন্তু সাংবাদিকদের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থায় অত্যন্ত বিরল।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার একটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রীতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ে একাধিক প্রধান বিচারপতির আমলে সংবাদকর্মীরা আদালতকক্ষে প্রবেশ করে শুনানি পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ প্রকাশ করেছেন।
স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বা আলোচিত মামলার শুনানিতে আসন সংকুলানের সমস্যা অতীতেও দেখা দিয়েছে। সে সময় আদালত কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করেছিলেন—যেমন সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষণ বা শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কিছু নিয়ম মেনে চলা। এতে আদালতের শৃঙ্খলাও বজায় ছিল, আবার গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকারও ক্ষুণ্ন হয়নি।
অবশ্যই কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম থাকতে পারে—শিশু, যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা বা সাক্ষীর সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রে আদালত সীমিত পরিসরে শুনানির নির্দেশ দিতে পারেন। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ন্যায়সংগত ব্যতিক্রম। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ব্যতিক্রম ধীরে ধীরে সাধারণ নিয়মে পরিণত হতে থাকে—তাতে প্রকাশ্য বিচারের সাংবিধানিক মূলনীতিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশের অর্থ এই নয় যে তারা বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনা করবেন বা তাতে প্রভাব ফেলবেন। আদালত অবমাননা আইন, বিচারিক শৃঙ্খলা এবং সাংবাদিকতার পেশাগত নীতিমালা তাদের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য থাকে। ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ প্রকাশের জন্য বিদ্যমান আইনেই প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য অপব্যবহারের আশঙ্কায় গোটা গণমাধ্যমকে আদালতের বাইরে রাখা একটি ভারসাম্যহীন ও অপ্রয়োজনীয় সমাধান।
দেশের বিচারব্যবস্থায় জনগণের আস্থার একটি বড় ভিত্তি হলো আদালতের উন্মুক্ততা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেই উন্মুক্ততা সংকুচিত হলে বিচারব্যবস্থা নিয়ে অহেতুক সন্দেহ, জল্পনা ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন সংরক্ষণ করা জরুরি, তেমনি জনগণের জানার অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে—এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক কোনো দ্বন্দ্ব নেই, বরং একটি অন্যটিকে শক্তিশালী করে।
সময়ের দাবি হলো, সুপ্রিম কোর্ট একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত নীতিমালা প্রণয়ন করুক, যেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার, আসনব্যবস্থা, আচরণবিধি এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রবেশ সীমিত করার শর্তাবলি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। এতে আদালতের শৃঙ্খলা যেমন অটুট থাকবে, তেমনি গণমাধ্যমও তার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবে।
সবশেষে একটি সত্য মনে রাখা জরুরি—বিচারব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার দেয়ালের উচ্চতায় নয়, বরং জনগণের বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাসের মূল ভিত্তিই হলো একটি উন্মুক্ত আদালত, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল হয় না, জনগণও নিশ্চিত হতে পারেন যে তা প্রকৃতপক্ষেই হচ্ছে।

