জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ, সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতের প্রচলিত ব্যবসায়িক ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। একসময় ব্যাংকের সাফল্য প্রধানত মুনাফা, ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা হতো। এখন সেই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসনের প্রভাব। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও ধীরে ধীরে শুধু মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যাংকিং থেকে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনভিত্তিক—অর্থাৎ ESG—নীতিনির্ভর টেকসই ব্যাংকিংয়ের দিকে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এ পরিবর্তন কেবল আন্তর্জাতিক প্রবণতা অনুসরণের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রয়োজনও। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, শিল্পবর্জ্য ও নগরদূষণের মতো ঝুঁকি এখন ব্যবসা ও বিনিয়োগের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই কোন খাতে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিবেশ ও সমাজের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে ওই প্রকল্পের ঝুঁকি কতটা—এসব বিষয় ব্যাংকের ঋণ সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালে গ্রিন ব্যাংকিং উদ্যোগ চালুর মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পরিবেশগত বিষয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে ESRM নির্দেশনা, গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড এবং ২০২০ সালের Sustainable Finance Policy-এর মাধ্যমে এই কাঠামো আরও বিস্তৃত হয়। টেকসই অর্থায়নের ধারণাটি শুধু সবুজ প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল অর্থায়ন এবং টেকসই ব্যবসায়িক কার্যক্রমকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবুজ অর্থায়নে ন্যূনতম ৫ শতাংশ এবং টেকসই অর্থায়নে ন্যূনতম ২০ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে। এই লক্ষ্য ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওকে ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল খাতে সরিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
এর ফলে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু জামানত, সুদ ও সম্ভাব্য মুনাফা বিবেচনা করলেই হচ্ছে না; প্রকল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি, শ্রমিকের নিরাপত্তা, সামাজিক প্রভাব এবং পরিচালনব্যবস্থার মানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
টেকসই ব্যাংকিংকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত Sustainability Rating প্রকাশ করছে। এতে টেকসই অর্থায়ন, সবুজ অর্থায়ন, কোর ব্যাংকিংয়ের স্থায়িত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ব্যাংকিং সেবার বিস্তারের মতো বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। সর্বশেষ প্রকাশিত Sustainability Rating 2024-এ ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পাবালী ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক শীর্ষ ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে।
এ ধরনের মূল্যায়ন ব্যাংকগুলোর জন্য শুধু একটি পুরস্কার বা স্বীকৃতির বিষয় নয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকের নীতিমালা, অর্থায়নের ধরন, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বাস্তব চিত্রও সামনে আসে। ফলে টেকসই ব্যাংকিং এখন ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
সবুজ অর্থায়নের বিস্তৃত পরিধি
সবুজ অর্থায়ন বলতে আগে মূলত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, Effluent Treatment Plant বা দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো প্রকল্পকে বোঝানো হতো। এখন এর পরিধি অনেক বড়। সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বায়োগ্যাস, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন, পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, সবুজ ভবন এবং দূষণ কমানোর প্রযুক্তিতে অর্থায়ন এর অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের Green Transformation Fund শিল্পকারখানাকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি গ্রহণে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২০ সালে এ তহবিলের আওতায় বৈদেশিক মুদ্রায় পুনঃঅর্থায়ন ও অন-লেন্ডিংয়ের জন্য ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০০ মিলিয়ন ইউরোর কাঠামোও চালু করা হয়। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পণ্য, প্রকল্প ও উদ্যোগের জন্য পৃথক পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থাও রয়েছে।
দেশের নির্মাণ খাতেও এর প্রভাব বাড়ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, সৌরবিদ্যুৎ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নকশার মাধ্যমে LEED-সনদপ্রাপ্ত ভবন নির্মাণে ব্যাংক অর্থায়ন করছে। ফলে সবুজ অর্থায়ন এখন কেবল পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; এটি শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।
নীতিমালা তৈরি হলেও টেকসই ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তব প্রয়োগ। কোনো ব্যাংক নির্ধারিত হারে সবুজ বা টেকসই ঋণ বিতরণ করলেই সেটিকে প্রকৃত অর্থে টেকসই ব্যাংকিং বলা যায় না। অর্থায়ন পাওয়া প্রকল্প বাস্তবে কতটা পরিবেশবান্ধব, সামাজিক ঝুঁকি কতটা কমেছে এবং নির্ধারিত অর্থ যথাযথ কাজে ব্যবহার হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই জরুরি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের মান ও স্বচ্ছতা। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ও সামাজিক তথ্য পর্যাপ্ত না হলে ব্যাংকের পক্ষে সঠিক ESG মূল্যায়ন করা কঠিন হয়। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য ও দক্ষতার ঘাটতি বেশি।
এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক দুর্বলতাও টেকসই অর্থায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং মূলধনসংক্রান্ত চাপ থাকলে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থায়নে ব্যাংকের সক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ একটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী না হলে শুধু সবুজ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে টেকসই ব্যাংকিং নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
টেকসই ব্যাংকিংকে কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরও তথ্যনির্ভর ও ফলাফলভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। শুধু কত টাকা সবুজ বা টেকসই খাতে বিতরণ হয়েছে তা দেখলে চলবে না; সেই অর্থের পরিবেশগত ও সামাজিক ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে।
এ জন্য ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই, প্রকল্পভিত্তিক পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং নিয়মিত পরবর্তী পর্যবেক্ষণ জোরদার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মানসম্মত ESG disclosure বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও কার্যকর হবে।
ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের দক্ষতাও বাড়াতে হবে। পরিবেশগত ঝুঁকি শনাক্তকরণ, কার্বন নিঃসরণ পরিমাপ, জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও টেকসই প্রকল্প মূল্যায়নের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি ভালো পারফরম্যান্স করা ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, সুদ প্রণোদনা বা অন্যান্য নীতিগত সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
টেকসই ব্যাংকিংয়ের অর্থ মুনাফা পরিত্যাগ করা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ও দায়িত্বশীল মুনাফার ভিত্তি তৈরি করা। পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে কোনো শিল্প ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ঋণও ব্যাংকের জন্য ঝুঁকিতে পড়বে। বিপরীতে জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে উদ্যোক্তার সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি ব্যাংকের ঋণঝুঁকিও কমতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের প্রকাশনা তালিকায় জানুয়ারি–মার্চ ২০২৬ সময়ের Sustainable Finance-এর ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে—যা দেখায়, টেকসই অর্থায়ন এখন ব্যাংকিং খাতের নিয়মিত নজরদারি ও মূল্যায়নের অংশ।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামনে সফলতা নির্ভর করবে শুধু নির্ধারিত ৫ বা ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ওপর নয়; বরং অর্থায়নের গুণগত মান, প্রকৃত পরিবেশগত ফলাফল, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে তার ওপর। টেকসই ব্যাংকিং তাই এখন আর কেবল একটি নীতিগত ধারণা নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক রাখার অন্যতম হাতিয়ার।

