রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি আধুনিক অর্থনীতিতে একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার হাতিয়ার এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকির উৎস। কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় ভর্তুকির প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অদক্ষ উৎপাদন, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কিংবা কাঠামোগত লোকসানকে সরকারি অর্থ দিয়ে আড়াল করে রাখলে সেই সহায়তা আর কার্যকর সামাজিক বিনিয়োগ থাকে না; বরং তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান দায়ে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই দ্বন্দ্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বড় অংশ বিদ্যুৎ ও সার খাতে যাচ্ছে; এ দুই খাতেই মোট বরাদ্দের প্রায় ৫৫ শতাংশ ব্যয়ের কথা রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, এলএনজি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি ভর্তুকির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
এরই মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ নাগাদ তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন। এটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট বরাদ্দ নয়; মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সম্ভাব্য অতিরিক্ত প্রয়োজনের প্রাথমিক হিসাব। এর মধ্যে তেলে প্রায় ১০ হাজার ২৫৮ কোটি, গ্যাসে ১১ হাজার ১৭০ কোটি, বিদ্যুতে ১৯ হাজার ৮২১ কোটি এবং সারে ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন শুধু ভর্তুকি থাকবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কোন ভর্তুকি জনস্বার্থে অপরিহার্য, কোনটি সাময়িক, কোনটি লক্ষ্যভিত্তিক এবং কোনটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী অদক্ষতা ঢাকার উপায় হয়ে উঠেছে। এই পার্থক্য নির্ণয় করাই এখন অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান শর্ত।
রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির উদ্দেশ্য মূলত মুনাফা নিশ্চিত করা নয়; বরং এমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য পূরণ করা, যা বাজারের ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দিলে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৃষিতে সার ও অন্যান্য উপকরণে সহায়তা উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সহায়তা শিল্প, কৃষি ও সাধারণ ভোক্তার ওপর আকস্মিক মূল্যধাক্কা কমাতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রাষ্ট্রীয় সহায়তাও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে কার্যকর।
কিন্তু সামাজিক উদ্দেশ্যে দেওয়া ভর্তুকি এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক লোকসান পূরণের অর্থ এক নয়। দুটিকে একই হিসাবের মধ্যে রাখলে রাষ্ট্রীয় অর্থের প্রকৃত ব্যবহার ও কার্যকারিতা নির্ণয় কঠিন হয়।
তাই প্রতিটি ভর্তুকির ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর থাকা প্রয়োজন—কার জন্য ভর্তুকি, কেন ভর্তুকি এবং কত দিন ভর্তুকি। এর সঙ্গে চতুর্থ প্রশ্নটি হওয়া উচিত—ভর্তুকির বিনিময়ে কী পরিমাপযোগ্য ফল পাওয়া যাচ্ছে।
সামাজিক দায়িত্ব ও বাণিজ্যিক দক্ষতার পৃথক হিসাব। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে শুধু মুনাফার ভিত্তিতে বিচার করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি সামাজিক দায়িত্বের অজুহাতে অনির্দিষ্টকাল লোকসান মেনে নেওয়াও যুক্তিসংগত নয়।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির মতো প্রতিষ্ঠান নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করে। ফলে এর আর্থিক ঘাটতিকে একটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লোকসানের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে জানতে হবে, সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রকৃত ব্যয় কত এবং ক্রয়, সংরক্ষণ, পরিবহন, ব্যবস্থাপনা বা বিপণনের অদক্ষতার কারণে অতিরিক্ত ব্যয় কত।
অতএব, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের হিসাবব্যবস্থায় ‘সামাজিক সেবা ব্যয়’ এবং ‘বাণিজ্যিক অদক্ষতার ব্যয়’ পৃথকভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এতে বোঝা যাবে, সরকার যে অর্থ দিচ্ছে তার কত অংশ প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষায় এবং কত অংশ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সামাল দিতে ব্যয় হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, কম উৎপাদনশীলতা, পুরোনো প্রযুক্তি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার সমস্যায় রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদে শিল্পমন্ত্রী জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩১টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের পাঁচটি, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের ১৪টি এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তবে সব প্রতিষ্ঠানকে একই নীতিতে বিচার করা যাবে না। জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, জ্বালানি বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ও কৌশলগত মূল্য রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তার যৌক্তিকতা থাকতে পারে।
অন্যদিকে বাজারে বিকল্প থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর উৎপাদন ব্যয় কমাতে না পারলে, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে না পারলে কিংবা পুনরুদ্ধারের বাস্তব সম্ভাবনা না থাকলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
সরকারি অর্থ দিয়ে লোকসান পূরণ করাই সমাধান নয়। প্রয়োজন হতে পারে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, ব্যবস্থাপনা সংস্কার, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা কিংবা সম্পদের বিকল্প ব্যবহার। কারণ একটি অদক্ষ প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অর্থ হলো অন্য কোনো উৎপাদনশীল খাত থেকে সেই অর্থ সরিয়ে নেওয়া।
ঘাটতি পূরণ নয়, কর্মদক্ষতার বিনিময়ে সহায়তা। রাষ্ট্রীয় সহায়তার কাঠামোয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে ‘ঘাটতি পূরণভিত্তিক অর্থায়ন’ থেকে ‘কর্মদক্ষতাভিত্তিক অর্থায়ন’-এ উত্তরণ। প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেমন-
.উৎপাদনশীলতা কত বাড়বে;
.ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় কত কমবে
.অপচয় ও লোকসান কতটা কমবে
.কর্মীপ্রতি উৎপাদন বা সেবার পরিমাণ কত বাড়বে
পাওনা আদায়ের সময় কত কমবে
.বাজারজাতকরণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা উন্নত হবে
.সম্পদের ব্যবহার কতটা কার্যকর হবে
.এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি কতটা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারবে
অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার স্বাধীন কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করেছে। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য নির্বাচিত ৩০টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার স্বাধীন কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগকে শুধু মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাজেট বরাদ্দ ও ভর্তুকির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। নির্ধারিত কর্মদক্ষতা অর্জন করলে পরবর্তী পর্যায়ে সহায়তা বা বিনিয়োগ বাড়তে পারে; ব্যর্থ হলে ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও ব্যবসায়িক মডেল পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নির্ধারণে আরেকটি বড় সমস্যা হলো হিসাবের মান ও উপস্থাপনা। সরকারি অনুদানকে সাধারণ ব্যবসায়িক আয় হিসেবে দেখানো হলে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচালনক্ষমতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হতে পারে। একইভাবে শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখলে নগদ প্রবাহ, সম্পদের ব্যবহার ও ঋণের প্রকৃত চাপ আড়ালে থেকে যেতে পারে।
তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির পাশাপাশি নগদ প্রবাহ, সম্পদের ওপর আয়, মূলধনের দক্ষ ব্যবহার, দেনা-পাওনা ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সহায়তা বাদ দিলে প্রকৃত পরিচালন ফলাফল কী দাঁড়ায়—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একটি প্রতিষ্ঠান সরকারি সহায়তা ছাড়া কতটা আয় বা পরিচালন উদ্বৃত্ত তৈরি করতে পারছে এবং সহায়তা পাওয়ার পর তার আর্থিক ফল কী দাঁড়াচ্ছে—এই দুই চিত্র আলাদাভাবে প্রকাশ করা উচিত। এতে জনগণ ও নীতিনির্ধারক উভয়েই বুঝতে পারবেন রাষ্ট্রীয় অর্থের প্রকৃত ফল কোথায়।
পণ্যের দামে সরাসরি ভর্তুকি দিলে তার সুবিধা অনেক সময় ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার কাছে পৌঁছে যায়। ফলে সরকারি ব্যয় বাড়লেও প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয়ের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
এ কারণে ধীরে ধীরে সর্বজনীন মূল্যভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। ডিজিটাল পরিবারভিত্তিক তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, সামাজিক সুরক্ষা ডেটাবেস এবং মোবাইল আর্থিক সেবার সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা গেলে একই পরিমাণ অর্থে অধিক কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
তবে এর অর্থ হঠাৎ ভর্তুকি প্রত্যাহার নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্নআয়ের মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয় করতে হবে এবং একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে।
বিদ্যুৎ খাত রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির প্রধান ক্ষেত্রগুলোর একটি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির বরাদ্দ রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
এখানে শুধু বিদ্যুতের দাম বাড়ানো বা ভর্তুকি কমানোর দ্বিমাত্রিক বিতর্ক যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা, সিস্টেম লস, সক্ষমতার ব্যবহার, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়—সবকিছুর সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জের কাঠামো পুনর্বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তিগত বাধ্যবাধকতার কারণে ব্যয় কমানো সবসময় সহজ নয়। তাই বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমাতে চুক্তি পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিতরণ ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বাস্তবসম্মত মূল্য সমন্বয়ের পথ বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ভর্তুকি কমানো নয়, ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাই কমিয়ে আনা।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার সঙ্গে ঋণনির্ভরতার সম্পর্কও গভীর। বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মোট বকেয়া ঋণ ৬৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশের বেশি। একই সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে ৪২৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতি শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো প্রতিষ্ঠান সহজে অর্থায়ন পেতে থাকলে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের দায় নেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হলে ব্যবস্থাপনায় ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
তাই রাষ্ট্রীয় সহায়তার সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা ও কর্মদক্ষতার জবাবদিহি যুক্ত করা জরুরি। শুধু প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেওয়া নয়, ব্যর্থতার কারণ এবং দায়িত্বও নির্ধারণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ভর্তুকির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তিন স্তরের কাঠামো গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, কৌশলগত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা গুরুত্বপূর্ণ জনসেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিক সুফল বিবেচনায় সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। তবে সেই সহায়তার সামাজিক ফলাফল পরিমাপযোগ্য হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পুনর্গঠনযোগ্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। যেসব প্রতিষ্ঠানের বাজার সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতা বা বিপণনে দুর্বলতা রয়েছে, তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে অচল প্রতিষ্ঠান। যাদের পুনরুজ্জীবনের বাস্তব সম্ভাবনা নেই, তাদের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, সম্পদের পুনর্ব্যবহার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ধের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা যেতে পারে। এই শ্রেণিবিন্যাসের ফলে সব প্রতিষ্ঠানকে এক ধরনের সরকারি সহায়তার আওতায় না রেখে তাদের বাস্তব ভূমিকা ও সক্ষমতা অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের সামনে এলডিসি উত্তরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ২০২৬ সালের নভেম্বর নাগাদ উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা থাকলেও বাংলাদেশ প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। জুলাই ২০২৬-এ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ সেই অনুরোধ সমর্থন করে ২০২৯ পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
এটি সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নয়; বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর অতিরিক্ত সময় হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও এলডিসি উত্তরণ-সংশ্লিষ্ট কিছু উদ্যোগ—রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বাণিজ্যচুক্তি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, লজিস্টিকস ও শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি প্রণোদনার ক্ষেত্রেও বর্তমান বাস্তবতা সরলভাবে ‘তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার’ নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রপ্তানি নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রয়েছে; বাংলাদেশ ব্যাংক ৪৩টি নির্দিষ্ট রপ্তানি পণ্যে ০.৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা বহাল রেখেছে।
তাই দীর্ঘমেয়াদি নীতি হওয়া উচিত অস্থায়ী নগদ সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তি, দক্ষতা, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, পণ্য বৈচিত্র্য, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সহায়তা বাড়ানো। এতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা সরাসরি উৎপাদনশীল সক্ষমতা তৈরিতে ব্যবহার হবে।
ভর্তুকির বোঝা কমানোর পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য সরকারি ব্যয় নির্বাহে ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে।
জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং করদাতার আস্থা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
তবে রাজস্ব বাড়ানোর অর্থ শুধু করহার বাড়ানো নয়। উৎপাদন ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত না করে করভিত্তি সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক অংশকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা বেশি কার্যকর পথ।
আধুনিক অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়। যেখানে বেসরকারি খাত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কম, সেখানে রাষ্ট্র শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক, নীতিনির্ধারক ও সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে কাজ করতে পারে।
আবার প্রাকৃতিক একচেটিয়া খাত, কৌশলগত অবকাঠামো, খাদ্যনিরাপত্তা বা জনস্বার্থনির্ভর সেবায় রাষ্ট্রীয় মালিকানা কিংবা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকতে পারে। ফলে সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কমিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। মূল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র যে প্রতিষ্ঠানের মালিক বা নিয়ন্ত্রক, সেটি জনগণের অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। এই কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে মালিকানার পরিচয়ের চেয়ে উৎপাদনশীলতা, স্বচ্ছতা, আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক সুফল ও জবাবদিহিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহারের চিন্তা যেমন অবাস্তব, তেমনি অদক্ষ প্রতিষ্ঠানকে অনির্দিষ্টকাল সরকারি অর্থে টিকিয়ে রাখাও টেকসই নীতি নয়। রাজস্ব আহরণে চাপ, সুদ পরিশোধের বাড়তি বোঝা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তিত বাস্তবতায় সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি টাকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য।
তাই প্রয়োজন ‘ভর্তুকি দেব কি দেব না’—এই পুরোনো বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামো তৈরি করা। সামাজিক কল্যাণ, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৌশলগত খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা থাকবে; কিন্তু তার উদ্দেশ্য, সুবিধাভোগী, সময়সীমা ও ফলাফল নির্ধারিত থাকবে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে থাকবে কর্মদক্ষতার সূচক, সময়সীমা, স্বচ্ছ হিসাব ও ব্যবস্থাপনাগত জবাবদিহি। আর দীর্ঘদিনের অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে কেবল লোকসান পূরণের মাধ্যমে টিকিয়ে না রেখে পুনর্গঠন বা বিকল্প ব্যবস্থার পথে যেতে হবে।
ভর্তুকির সবচেয়ে কার্যকর রূপ হলো এমন সহায়তা, যা ভবিষ্যতে ভর্তুকির প্রয়োজন কমিয়ে দেয়। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা গড়ে তোলা এবং রপ্তানি খাতকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলা—এই পথেই রাষ্ট্রীয় অর্থের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি সম্ভব।
রাষ্ট্রীয় অর্থ জনগণের অর্থ। তাই প্রশ্ন শুধু কত টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলো তা নয়; বরং কোথায় ব্যয় হলো, কার উপকার হলো, কী ফল পাওয়া গেল এবং সেই ব্যয় ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে আরও স্বনির্ভর করে তুলছে কি না—এই চারটি প্রশ্নের উত্তরই হতে হবে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার মূল মানদণ্ড।
সামাজিক সুরক্ষা ও বাণিজ্যিক দক্ষতাকে পরস্পরবিরোধী না দেখে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি। অস্থায়ী সহায়তা থেকে উৎপাদনশীল সক্ষমতায়, নির্বিচার ভর্তুকি থেকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তায় এবং ঘাটতি পূরণ থেকে কর্মদক্ষতার বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে উত্তরণই হতে পারে বাংলাদেশের ভর্তুকি ব্যবস্থার পরবর্তী সংস্কারের মূল দর্শন

