সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে আমাদের আলোচনা অধিকাংশ সময়ই নেতিবাচকতার ভেতর ঘুরপাক খায়। ফেসবুকের ভুয়া তথ্য, ইউটিউবের বিভ্রান্তিকর ভিডিও, ট্রলের সংস্কৃতি, বিদ্বেষ, গুজব ও রাজনৈতিক মেরুকরণ এসবই যেন ডিজিটাল বিশ্বের প্রধান পরিচয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে একটি প্রত্যন্ত জনপদের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে, কৃষিপণ্যকে পর্যটনের আকর্ষণে রূপ দিতে পারে এবং সাধারণ মানুষের হাতে স্থানীয় উন্নয়নের নতুন শক্তি তুলে দিতে পারে।পিরোজপুরের নেছারাবাদের ভাসমান পেয়ারা বাজার সেই বাস্তবতারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ভীমরুলি, আটঘর ও কুড়িয়ানা অঞ্চলের ভাসমান পেয়ারা বাজার বহুদিন ধরেই সংবাদমাধ্যমের পরিচিত বিষয়। বর্ষা এলেই খবর হয়েছে ফলন, দাম, কৃষকের লোকসান কিংবা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার। কখনো বিক্রি না হওয়া পেয়ারা খালে ফেলে দেওয়ার ছবিও উঠে এসেছে সংবাদে। অর্থাৎ বাজারটির গল্প ছিল মূলত উৎপাদন ও বিপণন সংকটের গল্প।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও, পর্যটকের ছবি, ইউটিউবারের ভ্রমণকাহিনি কিংবা ছোট্ট একটি ফেসবুক রিল এসবের মাধ্যমে ভাসমান পেয়ারা বাজার এখন শুধু কৃষিপণ্যের বাজার নয়, একটি পর্যটন আকর্ষণেও পরিণত হয়েছে। মানুষের আগমন বেড়েছে, পেয়ারার চাহিদা বেড়েছে, দাম বেড়েছে, নৌকা ভাড়া থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন গতি এসেছে। অর্থাৎ একটি ডিজিটাল পোস্টের প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে বাস্তব অর্থনীতিতে।
এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিটি লুকিয়ে আছে।
একসময় একটি জনপদকে দেশের মানুষের কাছে পরিচিত করতে বড় বিজ্ঞাপন, মূলধারার গণমাধ্যম কিংবা ব্যয়বহুল প্রচারণার প্রয়োজন হতো। এখন একজন সাধারণ মানুষ নিজের মোবাইল ফোনেই সেই কাজ করতে পারেন। তিনি যদি কোনো গ্রামের সৌন্দর্য, কৃষকের ফুলের ক্ষেত, নদীর পাড়, ভাসমান বাজার কিংবা মৌসুমি প্রকৃতির বাস্তব দৃশ্য ধারণ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, সেটিই অন্য কারও ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে।
বরিশালের সাতলা শাপলা বিল, সুনামগঞ্জের জাদুকাটা নদীর তীরের শিমুল বাগানসহ দেশের অসংখ্য স্থান এভাবেই স্থানীয় পরিচিতি ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হয়েছে। কোথাও সরিষার হলুদ মাঠ, কোথাও সূর্যমুখী, কোথাও ফুলের বাগান, আবার কোথাও নদী ও হাওরের সৌন্দর্য, প্রকৃতি ও কৃষি এখন ক্রমেই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
এটি শুধু ‘ভাইরাল’ হওয়ার গল্প নয়; এটি নতুন ধরনের স্থানীয় অর্থনীতির গল্প।
তবে এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো বাস্তবতা।
মানুষ ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজারের ভিডিও দেখে আগ্রহী হয়েছে মূলত সেখানে কৃত্রিম কোনো গল্প চাপিয়ে দেওয়া হয়নি বলে। মোবাইল ক্যামেরা শুধু যা দেখেছে, সেটাই দেখিয়েছে নৌকায় সাজানো পেয়ারা, খালের ওপর বাজার, মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ। এই বাস্তবতার মধ্যেই তৈরি হয়েছে বিশ্বাস। আর বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছে আগ্রহ, ভ্রমণ, কেনাকাটা ও অর্থনৈতিক লেনদেন।
কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে এই বাস্তবতাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কয়েক সেকেন্ডেই আকাশের রং বদলে দেওয়া যায়, নদীকে আরও নীল করা যায়, ফুলের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া যায়, এমনকি এমন কোনো দৃশ্যও তৈরি করা যায় যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি। এসব কনটেন্ট মুহূর্তের বিস্ময় তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করার ঝুঁকিও তৈরি করে।
একটি বাস্তব ভিডিও হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে নিখুঁত নয়, কিন্তু তার সামাজিক মূল্য অনেক বেশি। কারণ বাস্তবতা মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কোথাও যেতে, কিছু দেখতে, কোনো পণ্য কিনতে কিংবা একটি এলাকার প্রতি আগ্রহী হতে মানুষ সত্যনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার ওপরই শেষ পর্যন্ত ভরসা করে।
এই জায়গায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেবল বিনোদন বা রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যম হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এখন স্থানীয় অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক বিপণন অবকাঠামো।
একজন পর্যটক একটি ভিডিও পোস্ট করলেন। সেটি দেখে আরও মানুষ সেখানে গেলেন। পর্যটক বাড়লে স্থানীয় নৌকার মাঝির আয় বাড়ল, কৃষকের পণ্যের দাম বাড়ল, খাবারের দোকানে বিক্রি বাড়ল, পরিবহন ব্যবসা সক্রিয় হলো, নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হলো। একটি পোস্ট থেকে শুরু হয়ে এভাবেই তৈরি হতে পারে বহুস্তরীয় অর্থনৈতিক প্রভাব।
অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ‘শেয়ার’ কখনো কখনো একটি জনপদের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
যোগাযোগ তাত্ত্বিকদের ভাষায়, মিডিয়া মানুষের দৃষ্টিসীমা প্রসারিত করে। আগে সেই জানালার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের হাতে। এখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেই জানালা খুলে দিয়েছে সাধারণ মানুষের হাতেও। আজ প্রত্যেক মানুষ একই সঙ্গে দর্শক, ভ্রমণকারী, কনটেন্ট নির্মাতা, তথ্যদাতা এবং কখনো কখনো স্থানীয় অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক দূত।
এই পরিবর্তন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রেখে যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যা আসলে কোথায়?মাধ্যমে, নাকি ব্যবহারে?
একই প্ল্যাটফর্মে কেউ গুজব ছড়ায়, ঘৃণা ছড়ায়, মানুষকে অপমান করে। আবার সেই প্ল্যাটফর্মেই কেউ একটি অজানা গ্রামের সৌন্দর্য তুলে ধরে স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন পথ তৈরি করে। কেউ বিভ্রান্তি তৈরি করে, কেউ মানুষের মধ্যে ভ্রমণ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ায়।
অতএব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে ভালো বা খারাপ নয়। এর শক্তির দিক নির্ধারণ করে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য ও দায়িত্ববোধ।
পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজার আমাদের তাই একটি বড় শিক্ষা দেয়। প্রযুক্তিকে শুধু উত্তেজনা, বিভাজন ও ক্ষণিকের ভাইরালতার জন্য ব্যবহার না করে স্থানীয় সম্পদ, সংস্কৃতি, কৃষি ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এমন অসংখ্য জায়গা আছে, যেগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপিত হলে স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। প্রয়োজন বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা, স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করা এবং জনপ্রিয়তার সঙ্গে পরিবেশ ও সংস্কৃতি রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখা।
কারণ একটি সত্যনিষ্ঠ ভিডিও শুধু লাখো ভিউ পাওয়ার জন্য নয় কখনো কখনো তা একটি কৃষকের ন্যায্যমূল্য, একজন মাঝির বাড়তি আয়, একটি গ্রামের নতুন পরিচিতি এবং একটি জনপদের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের হাতে এক অসাধারণ শক্তি তুলে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো আমরা সেই শক্তি দিয়ে ঘৃণা ছড়াব, নাকি মানুষের জীবন ও জনপদের অর্থনীতি বদলানোর নতুন পথ তৈরি করব?
মিজান মাজনুন
সাংবাদিক ও আইনজীবী।

