ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ এবং নগদহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতও দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস, কিউআর কোড, কার্ড, মোবাইল অ্যাপ এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা মানুষের লেনদেনকে করেছে দ্রুত ও সহজ। অ্যাকাউন্ট খোলা, রেমিট্যান্স গ্রহণ, অর্থ স্থানান্তর, কার্ডে কেনাকাটা কিংবা ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের মতো অনেক সেবা এখন শাখায় না গিয়েও পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু ডিজিটাল সুবিধার এই বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি। অনলাইন ব্যাংকিং, এমএফএস ও কিউআরভিত্তিক লেনদেন যত বাড়ছে, প্রতারকদের কৌশলও তত আধুনিক হচ্ছে। ফলে আর্থিক খাতের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে ডিজিটাল সেবার বিস্তার, অন্যদিকে গ্রাহকের অর্থ, তথ্য ও পুরো আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন সাইবারসিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক, ভার্সন ১.০ (২০২৬) বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। নতুন এই কাঠামোতে সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধারের সমন্বিত ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত এক দশকে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবায় যে ডিজিটাল রূপান্তর ঘটেছে, তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে দিয়েছে। মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ক্লাউডভিত্তিক সেবা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃসংযোগের ফলে গ্রাহক দ্রুত সেবা পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতাও বেড়েছে।
এই পরিবর্তনের বিপরীতে অপরাধীদের কৌশলও বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের এক গবেষণায় ১৬২টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক দশকে আর্থিক খাতে সাইবার ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সাইবার-সক্ষম প্রতারণা প্রায় তিন গুণ হয়েছে। গবেষণাটি অবশ্য সতর্ক করেছে যে অনেক দেশে ঘটনা যথাযথভাবে রিপোর্ট না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র আরও বড় হতে পারে।
অর্থাৎ, প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, একটি সাইবার আক্রমণের সম্ভাব্য ক্ষতিও তত বিস্তৃত হচ্ছে। এখন আক্রমণ শুধু কোনো গ্রাহকের হিসাব বা একটি কম্পিউটারকে লক্ষ্য করে হচ্ছে না; কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা, অর্থপ্রদানের অবকাঠামো, এপিআই, ক্লাউড সেবা এবং তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তিগত সংযোগও ঝুঁকির আওতায় এসেছে।
আর্থিক খাতের প্রস্তুতি: কোথায় দাঁড়িয়ে ব্যাংকগুলো? বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি সমান নয়। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল, আধুনিক নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তার প্রথম শর্ত হলো শক্তিশালী তথ্যপ্রযুক্তি সুশাসন। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকে এখনো মূল ব্যবসার ঝুঁকি হিসেবে না দেখে আলাদা প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, পর্যাপ্ত বাজেট এবং শীর্ষ পর্যায়ের জবাবদিহিতা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়নি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি সুশাসন এবং সাইবার নিরাপত্তা ও জালিয়াতি প্রতিরোধ নিয়ে পৃথক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু থাকার বিষয়টিও এ খাতের দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
শুধু একটি নিরাপত্তা সফটওয়্যার কিনে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরিচালনা কেন্দ্র, রিয়েল-টাইম লেনদেন পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত দুর্বলতা পরীক্ষা, তথ্য পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল।
বিশ্বজুড়েই সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশেও বিশেষায়িত দক্ষতার অভাব অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ব্যাংকগুলোকে শুধু প্রযুক্তি কেনার বদলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পুরোনো লিগ্যাসি প্রযুক্তির ওপর নতুন ডিজিটাল সেবা যুক্ত করা হয়েছে। পুরোনো ও নতুন ব্যবস্থার মধ্যে নিরাপত্তার দুর্বল সংযোগ থাকলে তা আক্রমণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একইভাবে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ভেন্ডর ও তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি সেবার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যাংকের নিজস্ব নিরাপত্তা শক্তিশালী হলেও কোনো অংশীদার প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি পার্টনার নেটওয়ার্ক নিয়ে পৃথক নির্দেশনাও জারি করেছে।
আধুনিক সাইবার জালিয়াতির নতুন কৌশল। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে আর্থিক জালিয়াতির ধরনও বদলেছে। বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
এমএফএস ও ডিজিটাল ওয়ালেট: বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবাকে কেন্দ্র করে প্রতারকরা সামাজিক প্রকৌশল, ভুয়া পরিচয় ও ফিশিং কৌশল ব্যবহার করছে।
ওটিপি ও সামাজিক প্রতারণা: গ্রাহককে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে অথবা ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে পিন, পাসওয়ার্ড কিংবা এককালীন পাসওয়ার্ড নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক সময় প্রতারণামূলক লিংকের মাধ্যমে গ্রাহককে ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
ভুয়া এসএমএস: আন্তর্জাতিক বা গ্রে-রুটের মাধ্যমে আসা প্রতারণামূলক বার্তা অনেক সময় বৈধ প্রতিষ্ঠানের বার্তার মতো দেখায়। ফলে সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে আসল ও নকল বার্তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এপিআই ও সরবরাহ-শৃঙ্খল আক্রমণ: ব্যাংকের সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের আর্থিক প্রযুক্তির সংযোগ বাড়ায় এপিআই নিরাপত্তার গুরুত্বও বেড়েছে। কোনো এপিআইয়ের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা করা সম্ভব।
ম্যালওয়্যার ও র্যানসমওয়্যার: ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্য চুরি, সিস্টেম অচল করা কিংবা তথ্য সংকেতায়িত করে অর্থ দাবি করার ঝুঁকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম সম্পদসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের হামলা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক সাইবারসিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক, ভার্সন ১.০ জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এটি তফসিলি ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, এমএফএস প্রদানকারী, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী ও পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন হলো—এই কাঠামোকে শুধু পাঁচটি ধাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কাঠামোটি ছয়টি মূল কার্যধারা—শাসন, ঝুঁকি ও সম্পদ চিহ্নিতকরণ, সুরক্ষা, শনাক্তকরণ, প্রতিক্রিয়া এবং পুনরুদ্ধার—এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর পাশাপাশি সাইবার ঘটনা রিপোর্টিংয়ের ওপরও পৃথক গুরুত্ব রয়েছে।
এতে বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। লক্ষ্য শুধু হামলা প্রতিরোধ নয়; হামলা হলে দ্রুত শনাক্ত করা, ক্ষতি সীমিত রাখা, সেবা সচল রাখা এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার করাও এখন নিরাপত্তার অংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশিকার পাশাপাশি পার্টনার নেটওয়ার্কের জন্যও আলাদা কাঠামো এসেছে। এর ফলে ব্যাংক ও তাদের প্রযুক্তিগত অংশীদারদের মধ্যকার সংযোগকেও নিরাপত্তার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আর্থিক খাতের সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে—শুধু আক্রমণ ঠেকানোর ওপর জোর দেওয়া। বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই শতভাগ সাইবার আক্রমণমুক্ত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রয়োজন সাইবার সহনশীলতা; অর্থাৎ আক্রমণ হলেও যেন গুরুত্বপূর্ণ সেবা দীর্ঘ সময় বন্ধ না থাকে এবং দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা যায়। এর জন্য নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া, ব্যাকআপ ব্যবস্থা, দুর্যোগ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, বিকল্প অবকাঠামো এবং সংকটের সময় দায়িত্ব বণ্টন আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে এ বিষয়ে সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসম্পন্ন প্রধান তথ্যনিরাপত্তা কর্মকর্তা বা সিআইএসও থাকা প্রয়োজন। তিনি যেন কেবল প্রযুক্তি বিভাগের কাছে নয়, সরাসরি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি বা বোর্ডের কাছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা, দুর্বলতা পরীক্ষা এবং তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
সাইবার অপরাধীরা যখন দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করছে, তখন প্রচলিত নিয়মভিত্তিক নিরাপত্তার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
গ্রাহকের স্বাভাবিক লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করা গেলে প্রতারণামূলক লেনদেন দ্রুত আটকে দেওয়া সম্ভব। হঠাৎ অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর, অস্বাভাবিক স্থান বা যন্ত্র থেকে হিসাব ব্যবহারের মতো আচরণ তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যেতে পারে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালের একটি আইএমএফ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই যেমন সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি একই প্রযুক্তি আক্রমণের গতি ও বিস্তার বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এআই ব্যবহারের সঙ্গে শক্তিশালী শাসন, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতির বিস্তার সীমিত রাখার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ব্যাংকের নিরাপত্তা যত শক্তিশালীই হোক, গ্রাহক যদি প্রতারকের হাতে পিন, পাসওয়ার্ড বা এককালীন পাসওয়ার্ড তুলে দেন, তাহলে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই ব্যাপক ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচি প্রয়োজন।
গ্রাহকদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনো ফোন করে গোপন পিন, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চাইবে না। সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ করা এবং অপরিচিত ব্যক্তিকে তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
একই সঙ্গে প্রতারণামূলক এসএমএস মোকাবিলায় টেলিযোগাযোগ অপারেটর, ব্যাংক, এমএফএস প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতারণার পর দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, সন্দেহজনক হিসাব শনাক্ত এবং সম্ভব হলে অর্থ স্থানান্তর স্থগিত করার ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি-
.সাইবার নিরাপত্তাকে বোর্ড ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সরাসরি দায়িত্বের আওতায় আনা
.পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক সাইবার নিরাপত্তা বাজেট নিশ্চিত করা
.দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা জনবল তৈরি ও ধরে রাখা
.সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা
.এআই ও যন্ত্রশিক্ষাভিত্তিক অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তকরণ বাড়ানো
.পুরোনো লিগ্যাসি প্রযুক্তি ধাপে ধাপে আধুনিকায়ন করা
.তৃতীয় পক্ষ ও সরবরাহ-শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করা
.গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপদ ব্যাকআপ ও দ্রুত পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা রাখা
.নিয়মিত সাইবার হামলা মোকাবিলার মহড়া পরিচালনা করা
.গ্রাহকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো;
.প্রতারণামূলক এসএমএস ও ভুয়া লিংক মোকাবিলায় জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা
.এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবায়নে শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মতি নয়, কার্যকর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তির অগ্রগতিকে থামিয়ে রেখে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বিকাশ সম্ভব নয়। আবার নিরাপত্তার দুর্বলতা রেখে দ্রুত ডিজিটালাইজেশনও টেকসই হতে পারে না। তাই এখন প্রয়োজন ডিজিটাল লেনদেনের গতি কমানো নয়, বরং তার সঙ্গে সমানতালে নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের নতুন সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন। কিন্তু কোনো নীতিমালা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়।
সাইবার নিরাপত্তা এখন আর শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের বিষয় নয়; এটি গ্রাহকের অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকের সুনাম এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখাচ্ছে, সাইবার হামলার প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই নিরাপত্তায় বিনিয়োগকে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে না দেখে আর্থিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। শক্তিশালী প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং কার্যকর পুনরুদ্ধার—এই চার সক্ষমতার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা। প্রযুক্তির যুগে ব্যাংক জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও ঝুঁকি ও ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর সেই সক্ষমতাই হবে স্মার্ট বাংলাদেশের আর্থিক খাতের প্রকৃত নিরাপত্তার পরীক্ষা

