বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে ”একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয় কি তার ধর্মীয়, জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অপ্রয়োজনীয় করে দেয় ”?
নীতিগতভাবে উত্তরটি হওয়া উচিত – ‘না’।
একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলাদেশি, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা কোনো নির্দিষ্ট জাতিসত্তার সদস্য হতে পারেন। এগুলো পরস্পরবিরোধী পরিচয় নয়। বরং আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো নাগরিকের বহুমাত্রিক পরিচয়কে স্বীকার করে তার অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে এমন বক্তব্য এসেছে যে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে দেশে কেউ ‘সংখ্যালঘু’ নন এবং ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রের কাছে মুখ্য হওয়া উচিত নয়। বক্তব্যটির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ‘সমঅধিকার ও নাগরিক সমতার ধারণা প্রতিষ্ঠা’ নিশ্চয়ই ইতিবাচক। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়: আইনি অর্থে সবাই সমান হওয়া এবং বাস্তব জীবনে সবাই সমান অবস্থানে থাকা কি একই বিষয়?
বাস্তবতা বলছে, দুটো এক নয়।
নাগরিকত্ব ও সামাজিক পরিচয় – দুটি ভিন্ন স্তর
রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের মৌলিক পরিচয় অবশ্যই তার নাগরিকত্ব। আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তা বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কারও নাগরিক অধিকার কমে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু নাগরিকত্ব কোনো মানুষের একমাত্র পরিচয় নয়।
একজন মানুষ তার ধর্ম পালন করেন, ভাষায় কথা বলেন, নির্দিষ্ট সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ করেন, কোনো জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করেন। এসব পরিচয় মুছে দিয়ে নাগরিক সমতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
বরং বিপরীতটি সত্য রাষ্ট্র যত বেশি মানুষের বৈচিত্র্যকে স্বীকার করবে, তত বেশি বিশ্বাসযোগ্যভাবে সে সমতার কথা বলতে পারবে।
‘সবাই বাংলাদেশি’ – এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্য। কিন্তু ‘সবাই শুধু বাংলাদেশি’ এটি একটি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য, যা মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সংকুচিত করতে পারে।
‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি কি বৈষম্য তৈরি করে, নাকি বৈষম্য শনাক্ত করে?
এখানে বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি।
শব্দটির একটি পরিসংখ্যানগত অর্থ আছে; যে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্থে এর তাৎপর্য আরও গভীর। কোনো জনগোষ্ঠী সংখ্যায় কম হলে তার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক প্রভাব, নিরাপত্তাবোধ কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদে প্রবেশের সুযোগ সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর তুলনায় ভিন্ন হতে পারে।
তাই কাউকে সংখ্যালঘু বলা মানেই তাকে দুর্বল বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলা নয়।
বরং অনেক ক্ষেত্রে ‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়টি প্রয়োজন হয় বৈষম্য শনাক্ত করার জন্য।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হয়, তাদের উপাসনালয় বারবার আক্রান্ত হয়, ভূমি নিয়ে বিরোধে তারা দুর্বল অবস্থানে থাকে অথবা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে তারা পিছিয়ে থাকে – তাহলে সেই বাস্তবতা পরিমাপ করার জন্য তাদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে আলাদা তথ্য প্রয়োজন।
পরিচয়ের নাম বাদ দিলে সমস্যার পরিমাপ সহজ হয় না; বরং কঠিন হয়ে যায়।
সমতা মানে সবাইকে একই কথা বলা নয়
রাষ্ট্রীয় সমতার ধারণা নিয়েও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
সমতা মানে প্রত্যেক নাগরিককে একই কথা বলা নয়। বরং যাদের বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষা ও সুযোগ নিশ্চিত করাও সমতার অংশ।
দুইজন মানুষ যদি একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু না করেন, তাহলে দুজনকে একই দূরত্ব হাঁটতে বলা ন্যায্যতার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয় না।
একজন সংখ্যাগুরু নাগরিকের জন্য যে বিষয়টি স্বাভাবিক, একজন সংখ্যালঘু নাগরিকের জন্য সেটি হয়তো নিরাপত্তার প্রশ্ন। কারও কাছে ধর্মীয় উৎসব কেবল উৎসব; অন্য কারও কাছে সেই উৎসব নির্বিঘ্নে পালন করতে পারাটাই রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা।
এই পার্থক্য অস্বীকার করলে ‘সমতা’ একটি প্রশাসনিক স্লোগানে পরিণত হতে পারে।
নিরাপত্তার প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয় নিয়ে বিতর্কের শেষ পর্যন্ত আসল প্রশ্নটি হওয়া উচিত নিরাপত্তা।
একজন নাগরিক কি নিজের ধর্ম পালন করতে গিয়ে ভয় পান?
নিজের উপাসনালয়ে যেতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন?
নিজের জমি বা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে পারেন?
কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে তিনি কি জানেন যে রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করবে?
কোনো হামলার পর অপরাধী রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ছাড় পাবে না – এই বিশ্বাস কি তার আছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তাহলে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাতে পারে। কিন্তু উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে শুধু শব্দ পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
অর্থাৎ পরিচয়ের সংকটের চেয়ে বড় হলো নিরাপত্তার সংকট।
‘সম্প্রীতি’র চেয়ে ‘জবাবদিহি’ বেশি জরুরি
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা প্রায়ই বলা হয়। এটি প্রয়োজনীয় এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক ভাষা। কিন্তু সম্প্রীতি কেবল মানুষের পারস্পরিক সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে তিনটি কাজ করতে হয়।
প্রথমত, বৈষম্য প্রতিরোধ করা।
দ্বিতীয়ত, হামলা বা অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
তৃতীয়ত, এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যাতে কোনো নাগরিক মনে না করেন যে তার পরিচয়ের কারণে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
কারণ একটি সমাজে সম্প্রীতির ছবি যত সুন্দরই হোক, অপরাধের পর যদি বিচার না হয়, তাহলে সেই সম্প্রীতি টেকসই হয় না।
সম্প্রীতির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার।
জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্ন আরও জটিল
ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সামাজিক কাঠামো। তাদের সবাইকে রাষ্ট্রীয় নাগরিক হিসেবে একই পরিচয়ের আওতায় আনা আইনগতভাবে সম্ভব হলেও তাদের স্বতন্ত্র ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অস্বীকার করা রাজনৈতিকভাবে সমস্যাজনক হতে পারে।
এখানে রাষ্ট্রের পরিণত অবস্থান হওয়া উচিত একটি অভিন্ন নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য বৈচিত্র্য মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং বৈচিত্র্যের নিরাপত্তাই জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করে।
রাষ্ট্রের ভাষা কেমন হওয়া উচিত?
রাষ্ট্রের বক্তব্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য দরকার। একদিকে বলা দরকার:
আপনি প্রথমত একজন সমঅধিকারসম্পন্ন বাংলাদেশি নাগরিক।
অন্যদিকে একই সঙ্গে বলা দরকার:
আপনার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা জাতিগত পরিচয় ধারণ করার অধিকারও রাষ্ট্র সমানভাবে রক্ষা করবে।
এই দুটি বক্তব্যের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং দুটিকে একসঙ্গে বলাই আধুনিক নাগরিক রাষ্ট্রের শক্তি।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রথম বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দ্বিতীয়টি অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও বড় শিক্ষা
এই আলোচনার আরেকটি দিক রাজনৈতিক। কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত জনগোষ্ঠীকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্থায়ী ভোটব্যাংক হিসেবে দেখা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। নাগরিকের ভোট তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত; ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ভোটের আচরণ নির্ধারণ করা গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে দুর্বল করে।
কিন্তু ভোটব্যাংক রাজনীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে কোনো সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র সামাজিক সমস্যাকে অস্বীকার করাও সমাধান নয়। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পত্তির অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে স্পষ্ট নীতি গ্রহণ করা।
এখন প্রয়োজন ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ নয়, ‘অধিকারের রাজনীতি’
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভাজন না বাড়িয়ে অধিকারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা।
এর জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি:
1. ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত।
2. উপাসনালয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার নিরাপত্তায় ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থা।
3. হামলা, দখল, অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার।
4. প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বাড়ানো।
5. ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় সম্পর্কিত সরকারি পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার না করে নীতিনির্ধারণে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা।
6. শিক্ষা ও গণমাধ্যমে ভিন্ন ধর্ম, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক ধারণা তৈরি করা।
7. রাষ্ট্রীয় ভাষায় ‘সংখ্যাগুরু বনাম সংখ্যালঘু’ বিভাজনের পরিবর্তে ‘সমঅধিকারসম্পন্ন নাগরিক’ ধারণাকে সামনে আনা-তবে বাস্তব বৈষম্য শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিচয়কে বাদ না দিয়ে।
পরিশেষে একটি রাষ্ট্রের পরিপক্বতা বোঝা যায় সে কতটা জোর দিয়ে বলে ‘আমরা সবাই এক’ তা দিয়ে নয়; বরং সে কতটা নিশ্চিন্তে বলতে পারে আমরা সবাই ভিন্ন, কিন্তু অধিকারে সমান।
জাতীয় পরিচয় মানুষের জন্য একটি অভিন্ন ছাতা হতে পারে। কিন্তু সেই ছাতার নিচে দাঁড়ানো প্রত্যেক মানুষের ইতিহাস, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও পরিচয় একই হবে এমন কোনো প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশি পরিচয়কে শক্তিশালী করার সবচেয়ে ভালো উপায় অন্য পরিচয়গুলোকে দুর্বল করা নয়।
বরং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে একজন হিন্দু নাগরিককে তার হিন্দু পরিচয় নিয়ে নিরাপত্তাহীন হতে হবে না; একজন বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান নাগরিককে নিজের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে ভয় পেতে হবে না; কোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে তার ইতিহাস বিসর্জন দিয়ে নাগরিক মর্যাদা অর্জন করতে হবে না।
কারণ শেষ বিচারে রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত নয়”আপনি নিজেকে কী নামে পরিচয় দেন?”
বরঞ্চ আপনার অধিকার কি বাস্তবে সুরক্ষিত?
এই প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে নাগরিক পরিচয় শক্তিশালী হবে। আর যদি উত্তর না হয়, তাহলে পরিচয়ের শব্দ বদলালেও সংকট থেকে যাবে।
সমতা তাই পরিচয় মুছে ফেলার প্রকল্প নয়।
সমতা হলো পরিচয় যা-ই হোক, রাষ্ট্রের চোখে অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তায় কেউ যেন দ্বিতীয় সারির নাগরিক না হন।

