তথ্য গোপন করে একাধিক রিট করার অভিযোগে এক নারী আইনজীবী ও এক রিট আবেদনকারীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করার আদেশকে কেন্দ্র করে আপিল বিভাগে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুনানির একপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের একটি মন্তব্যকে ‘আদালত অবমাননার শামিল’ উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এজলাস ত্যাগ করেন। পরে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরাও এজলাস ছাড়েন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আপিল বিভাগে এ ঘটনা ঘটে।
অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটির সূত্রপাত ২০১৩ সালে একটি কাজী নিয়োগকে কেন্দ্র করে। ওই বিষয়ে একই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদনকারী পাঁচটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। কিন্তু পরবর্তী রিটগুলোতে আগের মামলার তথ্য ও প্রত্যাখ্যাত আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি বলে আদালতে অভিযোগ ওঠে।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রুলস অনুযায়ী, কোনো বিষয়ে আগে মামলা দায়ের হয়ে তা খারিজ হলে পরবর্তী মামলায় আগের মামলার বিষয়বস্তু উল্লেখ করতে হয় এবং নতুন cause of action থাকতে হয়—অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে এমন আইনি ব্যাখ্যা উঠে আসে।
কাজলের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত মনে করেছে, আগের মামলার তথ্য গোপন করে পরবর্তী রিট দায়েরের মাধ্যমে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। এমনকি তাঁর বক্তব্যে, বিষয়টিকে ‘সিরিয়াস ফ্রড’ এবং আদালতের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আপিল বিভাগ নারী আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে আরও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার অর্থ সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিম্ন আদালতেও একই নারী আইনজীবী পরিচালনা করেছেন এবং এসব মামলায় সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ছিলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালেই আপিল বিভাগ জরিমানার আদেশ দেন। তখন ওই নারী আইনজীবী তাঁর পাশে বসে আদেশ শুনছিলেন। খোকন তখন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। আদেশের পর ওই আইনজীবী তাঁকে বলেন, ‘খোকন ভাই আমাকে কী বিপদে ফেলল!’
এর কয়েক ঘণ্টা পর দুপুর আনুমানিক ১২টা ৩৫ মিনিটে বিষয়টি নতুন মোড় নেয়।
কাজল বলেন, জরিমানার আদেশ নিয়ে ব্যারিস্টার খোকন আপিল বিভাগের সামনে কথা বললে প্রধান বিচারপতি তাঁকে জানান, আদালত সবকিছু বিবেচনা করেই আদেশ দিয়েছেন এবং সেই আদেশ পরিবর্তন করা হবে না।
এরপরই, অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যারিস্টার খোকন বলেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’
এই মন্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি সত্যিই এমন কথা বোঝাতে চেয়েছেন কি না। পরে একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি হলে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, এ ধরনের বক্তব্য ‘অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল’।
এরপর প্রধান বিচারপতি বলেন, এমন বক্তব্যের পর তিনি ওই দিনের আদালতের কার্যক্রমে আর অংশ নেবেন না। এ কথা বলে তিনি এজলাস ত্যাগ করেন। পরে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরাও এজলাস ছাড়েন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
বিরোধের সূত্র কোথায়
পুরো ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছে একই বিষয়ে একাধিক রিট দায়ের এবং আগের মামলার তথ্য পরবর্তী মামলায় প্রকাশ না করার অভিযোগ।
আদালতে কোনো পক্ষ পূর্ববর্তী মামলা বা আদেশের তথ্য গোপন করলে সেটি কতটা গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হবে—এই প্রশ্নটি এ ঘটনার আইনি দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে একই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক রিট করা হলে এবং আগের মামলার ফলাফল পরবর্তী মামলায় প্রকাশ করা না হলে আদালতের কাছে মামলার প্রকৃত ইতিহাস উপস্থাপিত হয়েছে কি না, সেটি বিচার্য হয়ে ওঠে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, আপিল বিভাগ এই কারণেই বিষয়টিকে গুরুতর হিসেবে দেখেছে এবং জরিমানার আদেশ দিয়েছে।
তবে জরিমানার আদেশের পূর্ণাঙ্গ লিখিত কারণ, আদালত কোন নির্দিষ্ট বিধান বা আইনি নীতির ভিত্তিতে ‘ফ্রড’ হিসেবে বিষয়টি বিবেচনা করেছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বা রিট আবেদনকারীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে আদালতের পূর্ণাঙ্গ আদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আদালত ও বারের সম্পর্কও সামনে
ঘটনাটি শুধু একটি মামলার জরিমানা বা একটি মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের অভিভাবক হিসেবে প্রধান বিচারপতির প্রতি তাঁদের একটি বিশেষ দায়িত্ববোধ রয়েছে। আদালতে বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে মতবিরোধ বা তর্ক হতে পারে, এমনকি বিচারকের পক্ষ থেকে আইনজীবীদের ভর্ৎসনাও আসতে পারে। কিন্তু তাঁর মতে, সেই বিরোধ নির্দিষ্ট মামলা বা আদালতের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
তিনি বলেন, বিচারক ও আইনজীবী—উভয়েরই রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে এবং সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শালীনতা ও পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখা জরুরি।
আপিল বিভাগে মঙ্গলবারের ঘটনাটি তাই একটি নির্দিষ্ট মামলার আদেশ ঘিরে বিরোধের পাশাপাশি বিচার বিভাগ ও আইনজীবী সমাজের সম্পর্ক, আদালতের মর্যাদা এবং আদালত অবমাননার সীমারেখা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে দিনের শেষ পর্যন্ত ঘটনার বিভিন্ন অংশের যে বিবরণ সামনে এসেছে, তার একটি বড় অংশ অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যনির্ভর। আদালতের আনুষ্ঠানিক কার্যবিবরণী বা পূর্ণাঙ্গ আদেশে ঘটনার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দিকগুলো কীভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

