বিশেষ বিশ্লেষণ
গত জুন মাসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি তাদের ২০২৫ সালের হিসাব প্রকাশ করেছিল ১৩৬ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়ে। কাগজে-কলমে এটা একটা স্বাভাবিক, বরং স্বস্তিদায়ক খবর। কিন্তু নিরীক্ষক মাহফেল হক অ্যান্ড কোং একই হিসাবের সঙ্গে যে পর্যবেক্ষণ জুড়ে দিয়েছিলেন, তাতে দেখা যায় ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। নিয়ম মেনে পুরো প্রভিশন রাখলে ব্যাংকটির প্রকৃত লোকসান দাঁড়াত প্রায় ৮৪ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা, আর মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত নেমে যেত গভীর ঋণাত্মক অঞ্চলে। যেখানে নিয়ন্ত্রক ছাড়ের সুবাদে দেখানো হয়েছিল মাত্র ৬.৪২ শতাংশ। এই একটা উদাহরণই বুঝিয়ে দেয়, কেন শুধু “মুনাফা হয়েছে” শুনে কোনো ব্যাংককে ভালো বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। একটা ব্যাংক আসলে কতটা সুস্থ, সেটা বোঝার জন্য আরও কিছু সংখ্যার দিকে তাকাতে হয়। খেলাপি ঋণের হার, মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত, সম্পদ ও ইকুইটির উপর মুনাফার হার এবং প্রভিশন সংরক্ষণের অবস্থা। এই লেখায় ঠিক এই চারটি সূচক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য দিয়ে, সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা থাকল।
কমল বললেই কি সংকট মিটে গেল?
খেলাপি ঋণ বা এনপিএল আসলে সবচেয়ে পরিচিত সূচক। মোট বিতরণ করা ঋণের কত অংশ নির্দিষ্ট সময় ধরে ফেরত আসছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই হার ছিল ২০.২০ শতাংশ, ২০২৫ সালের মার্চে বেড়ে হয় ২৪.১৩ শতাংশ, আর সেপ্টেম্বরে তা রেকর্ড ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়; টাকার অঙ্কে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এরপর ডিসেম্বর ২০২৫ নাগাদ হারটা নেমে আসে ৩০.৬০ শতাংশে। শুনতে ভালো খবর মনে হলেও, কারণটা মোটেও ঋণ আদায় বেড়ে যাওয়া নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন এক ছাড় দিয়েছিল, যেখানে খেলাপি ঋণ মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই পুনঃতফসিল করে হিসাব থেকে সরিয়ে ফেলা যাচ্ছিল। ফল যা হওয়ার তাই হলো, ২০২৬ সালের মার্চে হারটা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৩২.২৬ শতাংশে, অর্থাৎ মোট ১৮ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকাই তখন খেলাপি। এখান থেকে একটা শিক্ষা পাওয়া যায়, কোনো অনুপাত একবার কমতে দেখলেই স্বস্তি পাওয়া ঠিক নয়; কমার পেছনের কারণটাও যাচাই করা দরকার।
সংখ্যাটাকে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে পাশাপাশি রাখলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়। সার্ক অঞ্চলে ভারতের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২.২ শতাংশ, ভুটানে ৪.৫, মালদ্বীপে ৫.৫, নেপালে ৫.৬, পাকিস্তানে ৫.৮ আর শ্রীলঙ্কায় ৬.৫ শতাংশ। বাংলাদেশের হার প্রতিবেশীদের চেয়ে ছয় থেকে পনেরো গুণ বেশি, আর বৈশ্বিক তালিকায় যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের (৩৭.৩৫ শতাংশ) পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এখানে আরেকটা বিতর্কও সামনে এসেছে; চলতি বছরের জুনে গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, পুনঃতফসিল ও অবলোপনসহ প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ মোট ঋণের ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই হিসাবকে পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দেয়, তাদের নিরীক্ষিত ও চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রকৃত হার ৩০.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ সংকীর্ণ অর্থে “খেলাপি” আর বৃহত্তর অর্থে “সমস্যাগ্রস্ত” ঋণের সংজ্ঞায় ফারাক আছে। আর একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো নিয়ন্ত্রকের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনকেই মূল ভিত্তি ধরা, পাশাপাশি বিকল্প হিসাবগুলোকে সতর্কতার সংকেত হিসেবে মনে রাখা।
মূলধন যখন মাইনাসে নেমে যায়
মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত বা সিএআর বোঝার সহজ উপায় হলো; এটা একটা ব্যাংকের “সঞ্চয়ী বালিশ”, অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হলে যা দিয়ে ধাক্কা সামলানো যায়। বাসেল-৩ কাঠামো অনুসরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম বলছে, প্রতিটি ব্যাংককে ঝুঁকি-সমন্বিত সম্পদের অন্তত ১২.৫০ শতাংশ (মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ) মূলধন হিসেবে রাখতে হবে; আন্তর্জাতিক বাসেল-৩ কাঠামোতেও ন্যূনতম মান ১০ শতাংশ, সঙ্গে আড়াই শতাংশ বাফার। বাস্তবে ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের গড় মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান। তুলনায় ভারতের ব্যাংক খাতের এই হার ১৭.২০ শতাংশ, পাকিস্তানের ২০.৮০ শতাংশ আর শ্রীলঙ্কার ১৯.৪০ শতাংশ। সহজ ভাষায় বললে, প্রয়োজনীয় লোকসান-শোষণ ক্ষমতার চেয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন এখন কম, বরং ঘাটতিতে আছে। অর্থাৎ চিহ্নিত ক্ষতিগুলো পুরোপুরি হিসাবে আনলে সমষ্টিগতভাবে খাতটির নিজস্ব মূলধনই যথেষ্ট নয়। শরিয়াভিত্তিক দশটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের অবস্থা আরও কঠিন, এদের মধ্যে মাত্র তিনটি ন্যূনতম কোর ইক্যুইটি টিয়ার-১ মূলধন রাখতে পেরেছে, আর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন ছিল মাত্র ৩ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।
মুনাফার সংখ্যাটা তাহলে কী বলছে আসলে?
এবার আসা যাক রিটার্ন অন অ্যাসেট বা আরওএ এবং রিটার্ন অন ইক্যুইটি বা আরওই-তে। আরওএ দেখায় ব্যাংক তার মোট সম্পদ ব্যবহার করে কতটা মুনাফা তুলতে পারছে, আর আরওই দেখায় শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন কেমন। দুটোই মূলত ব্যাংকের দক্ষতা মাপার সূচক, নিছক লাভের টাকার অঙ্ক নয়। ২০২৪ সালে সামগ্রিক ব্যাংক খাতের আরওএ ছিল ধনাত্মক ০.৪৩ শতাংশ আর আরওই ৮.৭০ শতাংশ, মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আরওএ নেমে যায় ঋণাত্মক ৪.৮১ শতাংশে আর আরওই ধসে পড়ে ঋণাত্মক ২৪৩.৯০ শতাংশে; ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ১৯টিই দুই সূচকেই ঋণাত্মক ফল দেখিয়েছে। আগ্রহের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের প্রকৃত পরিচালন মুনাফা ছিল ৩২ হাজার ১০৯ কোটি টাকা; অর্থাৎ মূল ব্যবসা মন্দ চলছিল না। কিন্তু ঋণ ক্ষতির বিপরীতে যে বিশাল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে, তাতে পুরো খাত মিলিয়ে বছরশেষে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার নিট লোকসান। ২০২৪ সালের ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা মুনাফা আর ২০২৩ সালের ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা মুনাফার একেবারে বিপরীত চিত্র। অর্থাৎ ব্যবসা করার ক্ষমতা আর অতীতের জমে থাকা খারাপ ঋণের বোঝা; এই দুটো আলাদা জিনিস, আর আরওএ-আরওই একসঙ্গে দেখলেই বোঝা যায় কোনটা আসলে ঘটছে। শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে চিত্রটা আরও তীব্র। ২০২৪ সালের ধনাত্মক ০.১২ শতাংশ আরওএ ২০২৫ সালে নেমে যায় ঋণাত্মক ২৩.৯০ শতাংশে।
সবশেষে আসে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রশ্ন, যেটা আসলে আগের তিনটা সূচককে একসূত্রে বাঁধে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংককে নিজের মুনাফা থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে রাখতে হয়, যাতে ভবিষ্যতে ওই ঋণ পুরোপুরি ফেরত না এলেও ব্যাংক ধাক্কা সামলাতে পারে। প্রয়োজনীয় প্রভিশনের তুলনায় যা কম রাখা হয়, সেটাই প্রভিশন ঘাটতি আর এই ঘাটতি যত বেশি, ব্যাংকের হিসাবের বইয়ে ঝুঁকি ততটাই লুকিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এই ঘাটতি ২০২৪ সালের জুনে ছিল মাত্র ৩১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা; ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজার ১৩০ কোটি টাকায়; ২০২৫ সালের জুনে রেকর্ড ৩ লাখ ১৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা ছুঁয়ে ফেলে; ডিসেম্বরে কিছুটা কমে ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, আর ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ ফের বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায়। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ সাতটি ব্যাংক; রূপালী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ইউসিবি, ওয়ান ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংক নিয়ন্ত্রক-ছাড়ের সুবিধা নিয়ে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকৃত লোকসান হিসাবের বাইরে রেখে দিয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এখানেই খুলনী প্রশ্নটা দাঁড়ায়, একটা ব্যাংক যদি নিয়ন্ত্রকের সাময়িক ছাড় নিয়ে কাগজে মুনাফা দেখায়, কিন্তু প্রকৃত প্রভিশন রাখলে সেটাই বিশাল লোকসানে পরিণত হয়, তাহলে সেই মুনাফাকে “প্রকৃত” বলা যায় কি?
আসলে এই চারটি সূচক আলাদাভাবে নয়, একসঙ্গে পড়লেই একটা ব্যাংকের প্রকৃত ছবি ফুটে ওঠে। এটাই বাসেল-৩ কাঠামোর মূল দর্শন, যেখানে ন্যূনতম মূলধন নির্ধারণের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত পিলার-৩ প্রকাশনার মাধ্যমে এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে, শুধু নিয়ন্ত্রকের তদারকির জন্য নয়, বরং সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীরাও যেন নিজেরাই যাচাই করতে পারেন। এনপিএল বলে সম্পদের মান কেমন, প্রভিশন ঘাটতি বলে ক্ষতি সততার সঙ্গে স্বীকার করা হচ্ছে কি না, মূলধন পর্যাপ্ততা বলে ধাক্কা সামলানোর সামর্থ্য আছে কি না, আর আরওএ-আরওই বলে ব্যবসাটা আদৌ টেকসই মুনাফা তৈরি করছে কি না। এর মধ্যে একটা সূচক ভালো দেখানো সহজ। কিন্তু চারটাই একসঙ্গে সুস্থ থাকা কঠিন, আর ঠিক এই কারণেই একা মুনাফার অঙ্কের ওপর ভরসা করা বিপজ্জনক। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও বিষয়টা আমলে নিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে বর্তমান নিয়মভিত্তিক প্রভিশনিং পদ্ধতি সরিয়ে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি বা ইসিএল কাঠামো (আইএফআরএস-৯ অনুসারে) চালুর রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সম্পদ-মান পর্যালোচনার (এসেট কোয়ালিটি রিভিউ) পরিকল্পনাও নিয়েছে।
আর যখন এই সূচকগুলো একের পর এক লাল সংকেত দিতে থাকে, নিয়ন্ত্রক নিজেও চুপ করে বসে থাকেনি; তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্প্রতি দেখা গেছে পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক; এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংককে “অকার্যকর” ঘোষণা করে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-তে। অর্থাৎ কোনো ব্যাংকের এই সূচকগুলো যখন বারবার নিয়ন্ত্রক নির্ধারিত সীমার নিচে নামতে থাকে, তখন সেটা শুধু হিসাবরক্ষণের বিষয় থাকে না; আমানতকারীর টাকার নিরাপত্তার প্রশ্নেই রূপ নেয়। তাই পরের বার কোনো ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে “রেকর্ড মুনাফা” শব্দটা চোখে পড়লে, একটু সময় নিয়ে এনপিএল, মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত, আরওএ-আরওই আর প্রভিশন ঘাটতির সংখ্যাগুলোও একবার দেখে নেওয়াই বিচক্ষণতার কাজ কারণ, প্রকৃত সুস্থ ব্যাংক চেনার আসল পরীক্ষা এই চারটে সংখ্যাতেই লুকিয়ে থাকে, শুধু হেডলাইনের মুনাফায় নয়।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

