রাজধানীর রাস্তায় ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা যেন এখন প্রাণঘাতী এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশায় বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ পেছন থেকে এসে ব্যাগে টান দেওয়া, আর সেই টানেই সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হওয়া— এমন ঘটনায় গত ছয় মাসে অন্তত তিনজন নারীর মৃত্যু হয়েছে।
সবশেষ শিকার হয়েছেন বগুড়ার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। জীবনের বেশিরভাগ সময় শিশুদের পড়িয়েই কাটিয়েছেন যিনি, চোখের চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন গত শনিবার ভোরে। সংসদ ভবন এলাকায় রিকশায় বসা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তাঁর ব্যাগে টান দিলে তিনি রাস্তায় ছিটকে পড়েন এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগেও একই কৌশলে প্রাণ হারিয়েছেন উত্তরার এক নারী এবং একটি ওষুধ কোম্পানির এক নারী কর্মকর্তা। শেষোক্ত ঘটনাটি ঘটেছিল গত জুনে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। ঈদের ছুটি শেষে মেয়েকে নিয়ে দিনাজপুর থেকে ফেরার পথে বাস থেকে নেমে রিকশায় ওঠার পরপরই মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ টেনে নেয়। সড়কে পড়ে মাথায় আঘাত পাওয়া ওই নারী পাঁচ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পরও বেশ কয়েকদিন পুলিশের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পৌঁছায়নি— এলাকার থানা পুলিশও প্রথমদিকে এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিল না। প্রায় সপ্তাহখানেক পর মামলা হয় এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শুধু ব্যাগ টেনে নেওয়ার ঘটনাই নয়, রাজধানীতে অস্ত্র দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। গত রোববার দুপুরে ধানমন্ডি লেক এলাকায় ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা তুলে যাওয়ার পথে তিনজন ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে অস্ত্র দেখিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভুক্তভোগী তাদের পিছু নিলে একজন মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন এবং স্থানীয়দের হাতে অস্ত্রসহ আটক হন। পরে পুলিশ আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশি পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে দেড়শর কাছাকাছি, আর ডাকাতির মামলা মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি। তবে এই সংখ্যা আসল চিত্রের প্রতিফলন নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই থানায় যান না, আবার গেলেও মামলার বদলে সাধারণ ডায়েরি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ব্যাপকভাবে।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে ঘটে যাওয়া বাইশটি আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় সরাসরি আক্রান্ত হয়েছেন ছাব্বিশ জন— যাঁদের অধিকাংশই পুরুষ, নারী মাত্র ছয়জন। তবে সংখ্যায় কম হলেও পরিণতির দিক থেকে নারীদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ— চারটি প্রাণহানির ঘটনার তিনটিতেই শিকার হয়েছেন নারী। বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, অন্তত সাতটি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা যানবাহনে ছিলেন, দুটি ঘটনা ঘটেছে চলন্ত ট্রেনে এবং কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছেন গন্তব্যে পৌঁছে বাহন থেকে নামার পরপরই।
মোহাম্মদপুরের একটি এলাকায় গত মে মাসে এক কলেজছাত্রকে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়, যার পুরো ঘটনা সিসিটিভিতে ধরাও পড়ে। অথচ থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বিষয়টিকে মোবাইল হারানোর সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভুক্ত করে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীর অভিভাবক। গত ছয় মাসে ছিনতাইয়ের শিকার সাতজনের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে— চারজন থানায় যাননি, বাকি তিনজন গেলেও তাঁদের মামলার বদলে জিডি করানো হয়েছে। এমনই একজন গত আগস্টে মৌচাক এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে থানায় গেলে তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার ঘটনাকেও নথিতে তোলা হয় সাধারণ হারিয়ে যাওয়া হিসেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেওয়া জিনিস যদি নথিতে হারানো হিসেবে লেখা হয়, তাহলে ছিনতাইয়ের প্রকৃত পরিসংখ্যানই আড়ালে থেকে যায়।
আগে ছিনতাই মূলত রাতের অন্ধকার বা জনশূন্য এলাকাকেন্দ্রিক হলেও এখন তার ধরন বদলেছে। বিশ্লেষণ করা বাইশটি ঘটনার মধ্যে ভোর থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত ঘটেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটনা, আর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘটেছে আরও বেশি— প্রায় ছত্রিশ শতাংশ। অর্থাৎ এই দুই সময়েই ঘটছে মোট ঘটনার প্রায় সত্তর শতাংশ। সকালের ঘটনায় মূল লক্ষ্য থাকে যানবাহনে থাকা যাত্রী বা নগদ টাকা বহনকারীরা, আর সন্ধ্যা-রাতের ঘটনায় বেশি দেখা যায় অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো বা আঘাত করে সম্পদ কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিশ্লেষণ করা ঘটনাগুলোর প্রায় পৌনে আশি শতাংশেই ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বা প্রদর্শনের প্রমাণ মিলেছে। ছুরি, চাপাতি, ব্লেড থেকে শুরু করে পিস্তল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন ঘটনায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজনের বদলে দুই থেকে চারজন মিলে সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাই ঘটাচ্ছে, কোনো কোনো ঘটনায় জড়িতের সংখ্যা ছয়-সাতজন পর্যন্তও পাওয়া গেছে।
মামলা না নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কোনো ভুক্তভোগী এজাহার নিয়ে থানায় এলে মামলা না নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ছিনতাইকারীরা মূলত নির্দিষ্ট সময় ও স্থান বেছে নিয়ে অপরাধ করছে, বিশেষত তুলনামূলক ফাঁকা এলাকায় বাহন থেকে নামার পরের মুহূর্তগুলোকে টার্গেট করছে তারা। রাজধানীজুড়ে বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রায় নব্বইটি চেকপোস্ট এবং প্রতিটি থানায় একাধিক নিয়মিত টহল দল সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার সংক্রান্ত একজন উপদেষ্টা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর সময়ের তুলনায় হত্যা মামলার সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও চুরি ও ছিনতাইয়ের মামলা কমেছে। তিনি স্বীকার করেন, পুলিশের আত্মবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি, তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যতক্ষণ না নথিভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আসছে এবং প্রতিটি ছিনতাইয়ের ঘটনা যথাযথভাবে মামলা হিসেবে নথিবদ্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ রাজধানীর সড়কে ব্যাগের টানে থেমে যাওয়া জীবনের প্রকৃত সংখ্যা অজানাই থেকে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

