বিশেষ বিশ্লেষণ
আপনার ব্যাংক হিসাবে জমানো টাকাটা যদি একদিন ব্যাংক ফেরত দিতে না পারে, তাহলে কেমন লাগবে? এই প্রশ্নটা আজ আর কল্পনার বিষয় নয়, বাংলাদেশের লাখো আমানতকারীর কাছে এটা রোজকার বাস্তবতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। জুন শেষে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ দেওয়ার ক্ষমতার ওপরও চাপ বাড়ছে। মানে দেশের ব্যাংকগুলো যে টাকা বিতরণ করেছে, তার প্রতি তিন টাকার একটা টাকাই আর ফেরত আসছে না। এই সংখ্যাটা শুধু কাগজের হিসাব নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো সাধারণ মানুষের গচ্ছিত অর্থের ঝুঁকি।
টাকাগুলো গেল কোথায়?
এই সংকট হুট করে তৈরি হয়নি। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, মার্চ ২০২৬ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, আর জুনে এসে তা ছাড়িয়ে যায় ছয় লাখ কোটির ঘর। প্রতি তিন মাসে গড়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা করে যোগ হচ্ছে এই তালিকায়। আরও উদ্বেগের বিষয়, যেসব ঋণ এখনো খেলাপি হয়নি কিন্তু ঝুঁকিতে আছে, তথাকথিত স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট বা এসএমএ, তার পরিমাণও লাফিয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে এই ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১২০ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা অর্থাৎ মাত্র তিন মাসেই প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা নতুন করে ঝুঁকিতে ঢুকেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই এসএমএ ঋণের বড় অংশই আগামী কয়েক প্রান্তিকে সরাসরি খেলাপির খাতায় নাম লেখাবে, অর্থাৎ সংকট এখনই তলানিতে ঠেকেনি।
এখন প্রশ্ন হলো, একটা ঋণ খেলাপি হলে ক্ষতিটা ঠিক কোথায়? সহজ ভাষায় বললে, ব্যাংক যখন কাউকে ঋণ দেয়, সেটা আসলে আপনার-আমার মতো আমানতকারীদেরই টাকা। ঋণ ফেরত না এলে ব্যাংককে সেই ক্ষতি পোষাতে বাধ্যতামূলকভাবে “প্রভিশনিং” বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। এই টাকাটা ব্যাংকের মুনাফা থেকে কেটে রাখা হয়, ফলে ব্যাংকের মূলধন ক্ষয়ে যায়। মূলধন কমে গেলে ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার সামর্থ্য কমে, তখন প্রকৃত ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা যিনি সময়মতো ঋণ শোধ করেন, তিনিও ঋণ পান না বা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এভাবেই একটা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঋণখেলাপি হওয়ার মাশুল ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে; বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়, প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়। এই কারণেই খেলাপি ঋণকে শুধু “ব্যাংকের সমস্যা” না ভেবে জাতীয় অর্থনীতির সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত।
একটা গোষ্ঠী যেভাবে ব্যাংক খালি করে দিল
খেলাপি ঋণের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে নামটা এসেছে, তা হলো এস আলম গ্রুপ। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রামভিত্তিক এই শিল্পগোষ্ঠী শুধু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকেই নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নিয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এস আলম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নামে-বেনামে ও প্রভাব বিস্তার করে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে, যার মধ্যে প্রত্যক্ষ অর্থের পরিমাণ ৮৫ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা এবং পরোক্ষ অনিয়মিত সুবিধা ২০ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। দুদকের পরবর্তী গোয়েন্দা অনুসন্ধানে এই অঙ্ক আরও বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ২৫৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে, যার অধিকাংশই বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, এক্সিম ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ চারটি ব্যাংক মিলিয়ে এই লুটের মোট পরিমাণ প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা ছুঁয়েছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। এখানে একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার, তদন্ত এখনো চলমান বলে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অঙ্কে কিছুটা তারতম্য দেখা যায়; পাঠক হয়তো ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা শুনে থাকবেন, যেমন সোয়া লাখ কোটির মতো হিসাবও গণমাধ্যমে এসেছে। এই তারতম্যটাই আসলে সংকটের আরেকটা দিক তুলে ধরে; দুর্নীতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করাই যেখানে কঠিন, সেখানে তা উদ্ধার করা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।
এই লুটের পেছনের কৌশলটাও শেখার মতো। ঋণ অনুমোদনের স্বাভাবিক নিয়ম হলো, গ্রাহকের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও জামানত যাচাই করে ঋণসীমা নির্ধারণ করা। কিন্তু ব্যাংক কোম্পানি আইনের এই মৌলিক নীতি উপেক্ষা করে পরিচালনা পর্ষদে নিজেদের লোক বসিয়ে, নামে-বেনামে শতাধিক প্রতিষ্ঠান খুলে, একের পর এক ঋণ অনুমোদন করানো হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদের একটি পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; বিগত সরকারের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাংক লুটপাট হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদ তাতে সহায়তা করেছে, অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক নীরব ছিল। এই তিন পক্ষের মধ্যে একটি অনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যাটা শুধু একজন ঋণগ্রহীতার নয়, বরং তদারকি ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার।
যখন পুরো ব্যাংক খাতই লোকসানে
এই লুটপাটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাবে। দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্মিলিতভাবে লোকসানে পড়েছে সব ব্যাংক; ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা, এরপর এস আলমের মালিকানায় থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩১ হাজার কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। লক্ষ্য করার বিষয়, এই চারটি ব্যাংকই এস আলম গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে ছিল, অর্থাৎ যে গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নিয়েছে, সেই একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোই এখন সবচেয়ে বড় লোকসানের শিকার। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের অবস্থাও কম উদ্বেগজনক নয়। সিপিডির গবেষণা পরিচালকের বরাতে জানা যায়, সম্পদ আকারে দেশের সর্ববৃহৎ ঋণদাতা এই ব্যাংকের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা, আর ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক বিনিয়োগ পোর্টফোলিও বর্তমানে শ্রেণিকৃত বা মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত। এই সংকট এতটাই গভীর যে সদ্য জুন মাসেও তারল্য সংকট মোকাবিলায় ইসলামী ব্যাংককে তিন দিনে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা জরুরি ঋণ দিতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে।
পাঁচটি ব্যাংক এক হয়ে যা দাঁড়াল
এই সামগ্রিক সংকট সামাল দিতেই সরকার সবচেয়ে সাহসী যে পদক্ষেপটা নিয়েছিল, তা হলো একসঙ্গে পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে নতুন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, আর সেই ব্যাংক এখন সত্যি সত্যি পথচলা শুরু করে দিয়েছে। গত বছরের ৯ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে পাঁচ সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে নতুন রাষ্ট্র মালিকানাধীন একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এরপর ৯ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক লেটার অব ইনটেন্ট ইস্যু করে এবং ৩০ নভেম্বর চূড়ান্ত লাইসেন্স অনুমোদন দেয়। দীর্ঘদিন আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে গঠিত হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, যার পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি অংশ এসেছে একটি চমকপ্রদ কৌশলে, বেইল-ইন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমানতকে ‘খ-শ্রেণির’ শেয়ারে রূপান্তর করা হয়েছে। সহজ ভাষায়, বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীর নগদ টাকা এখন আর নগদ নেই, সেটা ব্যাংকের শেয়ারে বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলার স্বীকৃত একটি পদ্ধতি হলেও, এতে আমানতকারীদের স্বল্পমেয়াদি বিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যাংকটি ধাপে ধাপে টাকা তোলার নীতিও চালু করেছিল, আর সেই নীতি ক্রমেই শিথিল হয়েছে। শুরুতে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা তোলার সুযোগ থাকলেও, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, চিকিৎসার প্রয়োজনে গ্রাহকরা এখন ১০ লাখ টাকা পর্যন্তও তুলতে পারবেন, যা বোঝায় ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পথে।
তবে নেতৃত্বের প্রশ্নে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক শুরু থেকেই একধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াকে প্রথম চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হলেও, মাত্র তিন মাসের মাথায়, ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর প্রায় তিন মাস পদটি ফাঁকা থাকার পর ৮ জুন ২০২৬ সরকার নতুন নেতৃত্ব ঠিক করে দেয়, চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির (সাবিনকো) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী শায়রুল হাসান, আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার, যিনি পরবর্তীতে ১৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বেসরকারি খাত থেকে আসা এই দুই কর্মকর্তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মার্জার-পরবর্তী সাংগঠনিক সমন্বয়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা আর শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পুনর্গঠন। তবে একীভূতকরণ যে এখনো সাবলীল পথে এগোয়নি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) সাম্প্রতিক পদক্ষেপে, ব্যাংক গঠনের চার মাস না যেতেই এসআইবিএলের সাবেক চেয়ারম্যানসহ পাঁচজন পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আলাদা হয়ে পুনরায় স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়ানোর জন্য, যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এস আলম গ্রুপের দখলের আগে ব্যাংকটির ধারাবাহিক লাভজনক অবস্থানের ইতিহাস। যদিও অর্থনীতিবিদরা এই উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন; কারণ সরকারি কোষাগার থেকে নেওয়া বিপুল অর্থ লাভ করে ফেরত দেওয়া একটি এককভাবে দাঁড়ানো ব্যাংকের জন্য সহজ হবে না বলে তাদের আশঙ্কা। অর্থাৎ পাঁচ ব্যাংককে জোড়া লাগানোর কাজ কাগজে-কলমে সম্পন্ন হলেও, বাস্তবে এখনো এই নতুন কাঠামো পুরোপুরি স্থিতিশীল রূপ নেয়নি।
আদায় করতে গিয়েই দেখা যাচ্ছে আসল কঠিন বাস্তবতা
শুধু নতুন ব্যাংক গড়াই যথেষ্ট নয়, আসল চ্যালেঞ্জ হলো লুট হওয়া টাকা ফেরত আনা। আর সেখানেই দেখা যাচ্ছে একটার পর একটা বাধা। ইসলামী ব্যাংক ৫ আগস্টের পর থেকে এস আলম গ্রুপের বন্ধকী সম্পত্তি একের পর এক নিলামে তুলছে, যেমন সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের সম্পত্তি নিলামে তোলা হয়েছে। কিন্তু বারবার নিলাম ডেকেও ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে ঋণ আদায়ে এখন অনেকটা বাধ্য হয়েই অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়েরের পথে হাঁটছে ব্যাংকগুলো, যাতে ঋণের টাকা উদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়াটি আরও দীর্ঘায়িত হয়ে উঠছে। এটাই বাংলাদেশে ঋণ আদায়ের সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যা; আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ, সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা, আর রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মামলা কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত স্তরে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ও ৪৯(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তি তারিখে মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণগুলোর জন্য বিশেষ এক্সিট সুবিধা চালু করা হয়েছে, যা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে, এবং এর ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমার পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নীতিমালার আওতায় খেলাপি গ্রাহক এককালীন মূল ঋণ পরিশোধ করলে আরোপিত ও অনারোপিত সুদের বড় অংশ মওকুফ পেতে পারেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ৪১ ধারার আওতায়। পাশাপাশি সম্প্রতি খেলাপি ঋণ আদায়ের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং আদালতে বিচারাধীন ঋণসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির একটি নতুন নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই দুটো পদক্ষেপ একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, নীতিনির্ধারকরা মামলার দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত আদায়ের পথ খুঁজছেন, তবে সমালোচকদের প্রশ্ন হলো, একই ধরনের এক্সিট সুবিধা বারবার দেওয়া আদতে খেলাপি হওয়াকে “শাস্তিহীন” করে তুলছে কি না।
সব মিলিয়ে যে চিত্রটা দাঁড়ায়, তা হলো বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, আর একদিনে সারবেও না। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মতো উদ্যোগ কাঠামোগতভাবে সঠিক দিকে একটা পদক্ষেপ, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আলাদা আলাদা ধুঁকতে না দিয়ে একটি সবল কাঠামোর মধ্যে এনে সরকারি মূলধন ও বেইল-ইনের মাধ্যমে দাঁড় করানোর চেষ্টা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলার স্বীকৃত পদ্ধতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। কিন্তু এই কাঠামোগত সমাধান তখনই সফল হবে, যখন প্রকৃত অর্থে লুট হওয়া টাকা – নিলাম, মামলা কিংবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করে – ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, কাঠামো গড়ার কাজ যতটা এগিয়েছে, প্রকৃত টাকা আদায়ের কাজ তার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। আগামী কয়েক প্রান্তিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত আদায়ের হার আর আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর গতিই বলে দেবে, এই লুট হওয়া লাখ লাখ কোটি টাকার কতটা আদৌ ফিরে আসবে, আর কতটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও আমানতকারীদেরই বহন করতে হবে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

