বিশেষ বিশ্লেষণ
ঢাকার এক স্কুলছাত্র, সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে দেশ ছাড়েন উচ্চশিক্ষার জন্য। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক আর পিএইচডি করার পর তিনি জিই হেলথকেয়ারে যোগ দেন, এরপর ২০১১ সালে হয়ে যান মেডট্রনিকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী; দেড়শোর বেশি দেশে কার্যক্রম চালানো, প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার রাজস্বের এক মেডিকেল টেকনোলজি জায়ান্টের সর্বোচ্চ পদে। পরে তিনি বসেন ইন্টেলের বোর্ড চেয়ারম্যানের চেয়ারেও। এই মানুষটির নাম ওমর ইসহাক, জন্ম ঢাকায়। তাঁর গল্পটা এখানে এত বিস্তারিত বলার একটাই কারণ, এটা প্রমাণ করে দেয় যে সমস্যাটা প্রতিভার নয়। প্রশ্নটা তাহলে অন্য জায়গায়: কেন এই মেধা দেশের মাটিতে বেড়ে উঠে বিশ্বমানের নেতৃত্বে পৌঁছাতে পারল না, বরং পৌঁছাল দেশ ছাড়ার পরই? প্রতি কয়েক বছর পরপর যখন সুন্দর পিচাই বা সত্য নাদেলার মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত সিইওদের নাম আলোচনায় আসে, তখন আমাদের মধ্যেও এই প্রশ্নটা ঘুরেফিরে আসে, আমরা কেন পারলাম না। উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ব্যাখ্যাগুলো যতটা প্রচলিত, বাস্তবতা ততটা সরল নয়।
ইংরেজি নয়, আসল বাধাটা অন্য জায়গায়
আড্ডায় বা টকশোতে সবচেয়ে সহজ যে ব্যাখ্যাটা শোনা যায়, তা হলো, আমরা ইংরেজিতে দুর্বল, তাই গ্লোবাল কর্পোরেট জগতে টিকতে পারি না। কিন্তু সংখ্যাগুলো এই ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। এডুকেশন ফার্স্টের ২০২৫ সালের ইংলিশ প্রোফিসিয়েন্সি ইনডেক্সে ১২৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৫০৬, যা “মডারেট” মানের মধ্যে পড়ে; অথচ ভারতের স্কোর ৪৮৪, যা তার চেয়ে নিচে, “লো” মানের ঘরে। অর্থাৎ যে ভাষাগত দক্ষতাকে আমরা নিজেদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা মনে করি, সেই একই মাপকাঠিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে। তাহলে ভারত থেকে একের পর এক গ্লোবাল সিইও বের হওয়ার পেছনে ভাষা কোনো নির্ণায়ক ফ্যাক্টর নয়; বরং সেই ব্যাখ্যাটা একটা আরামদায়ক অজুহাত, যা আসল কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে রাখে।
যে বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বকে বিশ্বাস করাতে পারেনি
আসল পার্থক্যটা তৈরি হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতায়। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৬-এ বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বিশ্বে ৫৮৪, বুয়েটের অবস্থান ৭৬১-৭৭০ ব্র্যাকেটে। কোনো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানই শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যে নেই, অথচ এর আগের একটি র্যাংকিং চক্রেই ভারতের আটটি ও পাকিস্তানের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল। এই ব্যবধানটা স্রেফ মর্যাদার প্রশ্ন নয়, এটা সরাসরি ক্যারিয়ারের সঙ্গে যুক্ত। আইআইটি বা আইআইএমের ডিগ্রি দেখলে গোল্ডম্যান স্যাকস কিংবা গুগলের নিয়োগকর্তা সঙ্গে সঙ্গে একটা মানদণ্ড বুঝে নেন, একাই গোল্ডম্যান স্যাকসে আইআইএম বেঙ্গালুরুর ৭৮ জন ও আইআইএম কলকাতার ৭৪ জন প্রাক্তন ছাত্র এমবিএ পাশ করে কাজ করছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দশকের পর দশক ধরে একটা বিশ্বাসযোগ্য “ট্যালেন্ট সাপ্লাই চেইন” তৈরি করেছে, যা বৈশ্বিক নিয়োগকর্তাদের চোখে একটা ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। তার ওপর আইআইএমের একটা এমবিএর খরচ পড়ে মোটামুটি ২৯ থেকে ৩৩ হাজার ডলার, যেখানে হার্ভার্ড বা হোয়ার্টনে সেই খরচ দুই লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়, ফলে সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে পরে বিদেশে গিয়ে সেটা পালিশ করার একটা বাস্তবসম্মত পথ তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ দেশের সেরা ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও তার এমন বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বা ব্র্যান্ড-স্বীকৃতি এখনো তৈরি হয়নি।
পারিবারিক মালিকানার সিলিং
তবে সবচেয়ে গভীর বাধাটা লুকিয়ে আছে আমাদের কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের কাঠামোতেই। বাংলাদেশের ব্যাংক, বীমা ও বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মালিকানা কাঠামো নিয়ে করা গবেষণাগুলো একটা অভিন্ন চিত্র দেখায়। নিয়ন্ত্রণকারী পরিবারের হাতে সাধারণত ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ার থাকে, বোর্ডের স্বাধীনতা দুর্বল, আর প্রধান নির্বাহীর পদটাও প্রায় সবসময় পরিবারের ভেতর থেকেই পূরণ হয়। পিডব্লিউসির এক জরিপ বলছে, বাংলাদেশের ৯১ শতাংশ পারিবারিক ব্যবসা পরের প্রজন্মের হাতে মালিকানা তুলে দিতে চায়, অথচ মাত্র ৩১ শতাংশের কাছে কোনো অনানুষ্ঠানিক উত্তরাধিকার পরিকল্পনা আছে, আর সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা প্রায় কারও নেই। এর ফলাফল কী? পেশাদার ব্যবস্থাপকরা কাগজে-কলমে পদোন্নতি পান ঠিকই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শেষমেশ ফিরে যায় মালিকের কাছেই। কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের একটা প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, মালিকানা আর ব্যবস্থাপনা যত স্পষ্টভাবে আলাদা থাকে, পেশাদার নেতৃত্ব তত স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশে ইউনিলিভার, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি বা গ্রামীণফোনের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন পঞ্চাশের বেশি বাংলাদেশি শীর্ষ নির্বাহী পদে বসতে পেরেছেন, কারণ সেখানে মালিকানা বিদেশে, আর ব্যবস্থাপনা এখানকার মেধার হাতে। কিন্তু এই সাফল্যের সীমা একটা জায়গায় গিয়ে থেমে যায়; তাঁরা স্থানীয় শাখার প্রধান হতে পারছেন, বৈশ্বিক সদর দপ্তরের চেয়ারে বসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না, কারণ দেশীয় মালিকানাধীন কোনো কোম্পানিই এখনো সেই বৈশ্বিক স্কেলে পৌঁছায়নি যেখান থেকে একজন বাংলাদেশি ব্যবস্থাপক ফরচুন ৫০০ বোর্ডের নজরে পড়তে পারেন।
আমরা রপ্তানি করছি শ্রম, নেতৃত্ব নয়
এই চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি বাংলাদেশ আসলে বিশ্ববাজারে কী রপ্তানি করছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিলেন স্বল্পদক্ষ, ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ, ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ দক্ষ, আর মাত্র ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ পেশাদার শ্রেণির; অর্থাৎ মোট অভিবাসী শ্রমিকের ৭৭ শতাংশের বেশি পড়েন স্বল্পদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রেণিতে। যেখানে ভারত বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে প্রকৌশলী, এমবিএ আর গবেষক, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবসম্পদ রপ্তানি এখনো নির্মাণশ্রমিক আর গৃহকর্মী। এটা কোনো ছোট করে দেখার বিষয় নয়, রেমিট্যান্সের অর্থনীতিতে এই শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেকটাই তাঁদের ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু যে দেশের মানবসম্পদ রপ্তানির কাঠামোই তৈরি হয়েছে দক্ষতা নয়, সংখ্যা কেন্দ্র করে, সেই দেশ থেকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের একটা বড় স্রোত বের হয়ে আসার কথা নয়; আর বাস্তবে আসছেও না।
তাহলে সমাধানটা কোথায়
এতক্ষণের আলোচনা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট; সমস্যাটা মেধার নয়, কাঠামোর। ওমর ইসহাক একা নন; বহুজাতিক কোম্পানিতে নেতৃত্ব দেওয়া পঞ্চাশের বেশি বাংলাদেশি নির্বাহীর অস্তিত্বই প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশি ব্যবস্থাপকরা বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারেন। আমার নিজের পর্যবেক্ষণ হলো, এখান থেকে এগোনোর পথ তিনটে দিকে যায়। প্রথমত, কর্পোরেট গভর্ন্যান্সে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনাকে সত্যিকার অর্থে আলাদা করতে হবে; স্বাধীন বোর্ড, বাইরের পরিচালক, আর মেধাভিত্তিক পদোন্নতির সংস্কৃতি যেখানে পারিবারিক পরিচয় নয়, দক্ষতাই শেষ কথা বলবে; এটা কোনো নতুন তত্ত্ব নয়, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত গভর্ন্যান্স নীতি। দ্বিতীয়ত, অন্তত একটা বা দুটো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে বৈশ্বিক নিয়োগকর্তারা সেই ডিগ্রিকে বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড হিসেবে চিনবেন, ঠিক যেমন তাঁরা আইআইটি বা আইআইএমকে চেনেন। তৃতীয়ত, জনশক্তি রপ্তানি নীতির একটা অংশকে ঘুরিয়ে দিতে হবে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের দিকে, শুধু সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নয়। যেদিন দেশীয় মালিকানার কোনো কোম্পানি নিজের বোর্ডকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করবে, মেধার ভিত্তিতে একজন পেশাদারকে শীর্ষে বসাবে, আর সেই মানুষটিকে খুঁজে নেবে কোনো ফরচুন ৫০০ কোম্পানির বোর্ড; সেদিনই বোঝা যাবে, বাংলাদেশ তার নিজের মাটিতে বসেই বিশ্বমানের নেতৃত্ব তৈরি করতে শিখে গেছে। ওমর ইসহাকের গল্পটা তখন আর ব্যতিক্রম থাকবে না, হয়ে উঠবে নিয়ম।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

