বিশেষ বিশ্লেষণ
গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। দাবিটা সহজ, কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধনীতে যেন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নিজেদের শেয়ার নিজেরাই কিনে নেওয়ার আইনি সুযোগ দেওয়া হয়, যাকে বিশ্বজুড়ে বলা হয় শেয়ার বাইব্যাক। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক যে সময় ঢাকায় এই আলোচনা হচ্ছে, সেই একই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপল তাদের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ফিরিয়ে দিয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাইব্যাক প্রোগ্রামগুলোর একটি; ২০২৪ সালে ১১০ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২৫ সালে আরও ১০০ বিলিয়ন ডলার। একদিকে একটা বাজার যেখানে এই হাতিয়ারটাই বৈধ নয়, অন্যদিকে একটা বাজার যেখানে এটাই কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র। এই বৈপরীত্যটাই প্রশ্ন তোলে, বাইব্যাক জিনিসটা আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করে? সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের, নাকি কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের?
প্রথমে অঙ্কটা বুঝে নেওয়া যাক, কারণ বাইব্যাকের পুরো গল্পটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা সাধারণ ভগ্নাংশের ওপর। ধরা যাক একটা কোম্পানির বকেয়া শেয়ার সংখ্যা ১০০ কোটি, আর বার্ষিক মুনাফা ১,০০০ কোটি টাকা। তাহলে ইপিএস বা শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়ায় ১০ টাকা। এখন কোম্পানি যদি বাজার থেকে ১০ কোটি শেয়ার কিনে নিয়ে বাতিল করে দেয়, বকেয়া শেয়ার নেমে আসে ৯০ কোটিতে। মুনাফা একই থাকলেও ইপিএস বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১.১১ টাকায়। কোম্পানি এক টাকাও বেশি আয় করেনি, কিন্তু কাগজে-কলমে প্রতিটা শেয়ারের পেছনে আয়ের ভাগ বেড়ে গেছে। যে বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করেননি, তাঁর মালিকানার অনুপাতও বেড়ে যায়। ১০ কোটি বকেয়া শেয়ারের মধ্যে ১ লাখ শেয়ারের মালিক ছিলেন ০.১ শতাংশের অংশীদার, বকেয়া শেয়ার ৮ কোটিতে নামলে তিনি না কিছু কিনে, না বিক্রি করেই হয়ে যান ০.১২৫ শতাংশের মালিক। এই জায়গাতেই বাইব্যাকের আসল আকর্ষণ; শেয়ারহোল্ডারকে হাতে টাকা না দিয়েও তাঁর মালিকানার মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া যায়।
ইপিএস বাড়ে ঠিকই, কিন্তু কোম্পানি কি আসলেই বড় হলো?
এখানেই একটা সতর্কতার জায়গা আছে, যেটা অনেক বিনিয়োগকারী খেয়াল করেন না। ইপিএস বাড়াটা একটা যান্ত্রিক হিসাব; হর কমলে ভাগফল বাড়বেই, তাতে কোম্পানির ব্যবসা সত্যিই ভালো করছে কি না তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই। একই যুক্তিতে রিটার্ন অন ইকুইটি বা রিটার্ন অন ইনভেস্টেড ক্যাপিটালের মতো অনুপাতগুলোও বাইব্যাকের পর বেড়ে যায়, কারণ কোম্পানির ইকুইটি বা মূলধনের ভিত্তি ছোট হয়ে যায়, অথচ আয় একই থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল স্কুলের করপোরেট গভর্ন্যান্স ফোরামে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাইব্যাক তখনই প্রকৃত অর্থে মূল্য তৈরি করে যখন সেটা ইপিএসের একটা স্থায়ী প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেয়; নইলে সংখ্যাটা সুন্দর দেখায়, কিন্তু ভেতরের গল্পটা ফাঁপা থেকে যায়। তাই কোনো কোম্পানি যখন বাইব্যাক ঘোষণা করে, প্রশ্ন করা উচিত, তারা কি নিজেদের শেয়ারকে সত্যিই কম মূল্যায়িত মনে করছে, নাকি স্রেফ একটা প্রান্তিকের রিপোর্ট কার্ড সুন্দর করতে চাইছে?
টাকাটা আসলে যাচ্ছে কোথায়?
বাইব্যাক মানে কোম্পানির হাতে থাকা নগদ টাকা বাজারে ঢেলে দেওয়া, আর এই সিদ্ধান্তের একটা সুযোগ-ব্যয় বা অপরচুনিটি কস্ট থাকে। যে টাকা শেয়ার কিনতে যাচ্ছে, সেটা গবেষণা-উন্নয়নে, কারখানা সম্প্রসারণে বা কর্মীদের বেতনে ব্যয় হতে পারত। বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশের যুক্তি হলো, যে কোম্পানির হাতে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ কম, নগদ প্রবাহ বেশি, তাদের জন্য বাইব্যাক যুক্তিসঙ্গত। অ্যাপলের কথাই ধরা যাক, গত এক বছরে তাদের মুক্ত নগদ প্রবাহের প্রায় ৭৯ শতাংশ তারা শেয়ার পুনঃক্রয়ে ব্যয় করেছে, কারণ তাদের ব্যবসার আকারে নতুন করে বড় মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন কম। কিন্তু ঋণ করে বাইব্যাক করা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঝুঁকি; তখন কোম্পানির আর্থিক লিভারেজ বেড়ে যায়, আর সেই ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ শেয়ারহোল্ডারদের ঘাড়েই চাপে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালের ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্টের মাধ্যমে বাইব্যাকের ওপর ১ শতাংশ আবগারি কর বসানো হয়েছে, যা কার্যকর হয়েছে ২০২৩ সাল থেকে। এই করের পেছনের যুক্তিটাও এখানেই, ডিভিডেন্ডের তুলনায় বাইব্যাক করের দিক থেকে অনেক বেশি সুবিধাজনক ছিল বলে সরকার একে খানিকটা সমান করার চেষ্টা করেছে।
বোর্ডরুমের ভেতরের হিসাবটা একটু আলাদা
এখানে একটা কথা খোলাখুলি বলা দরকার, যেটা সাধারণত আড়ালে থেকে যায়। অনেক কোম্পানিতে শীর্ষ নির্বাহীদের বোনাস আর দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা সরাসরি ইপিএস বা শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাঁধা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যবিমা কোম্পানি হিউম্যানার একজন সাবেক প্রধান নির্বাহী একটি বছরে কোম্পানির নিট মুনাফা ২১ শতাংশ কমে যাওয়ার পরও একটি বড় বাইব্যাকের কল্যাণে ইপিএস লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়ে ফেলেছিলেন, আর তার ফলে পেয়েছিলেন লাখ ডলারের বোনাস। জেরক্সের এক সাবেক প্রধান নির্বাহীর ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল। একটি বড় বাইব্যাক ঠিক ততটুকু ইপিএস যোগ করেছিল, যতটুকু তাঁর বোনাসের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য দরকার ছিল। এস অ্যান্ড পি ৫০০ কোম্পানিগুলোর ওপর করা এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক কোম্পানি তাদের নির্বাহী প্রণোদনা পরিকল্পনায় শেয়ারপ্রতি অনুপাত ব্যবহার করে, আর এদের সিংহভাগ বাইব্যাকের প্রভাব বাদ দিয়ে বোনাস হিসাব করে না। এর মানে এই নয় যে প্রতিটা বাইব্যাকের পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য থাকে, কিন্তু এটা মনে করিয়ে দেয় যে সিদ্ধান্তটা যাঁরা নেন, তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থও কখনো কখনো একই দিকে হেলে থাকে।
বাংলাদেশে এখনো কেন এই পথ বন্ধ?
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে এই আলোচনা এত দেরিতে কেন। উত্তরটা লুকিয়ে আছে ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৫৮ ধারায়, যা কোনো কোম্পানিকে নিজের শেয়ার নিজে কেনার অনুমতি দেয় না। ফলে যে কোম্পানির হাতে বাড়তি নগদ টাকা আছে, সেই টাকা তাদের রাখতে হয় স্থায়ী আমানত বা অন্য কোম্পানির শেয়ারে, নিজেদের শেয়ার কিনতে পারে না। এমনকি নিজেদের শেয়ারকেই তারা সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ মনে করলেও না। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গত ডিসেম্বরে একটি বিস্তারিত বাইব্যাক কাঠামো জমা দিয়েছিল সংশোধনীর খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য, কিন্তু সেটা চূড়ান্ত খসড়ায় ঠাঁই পায়নি। ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদের মত হলো, কোনো কোম্পানির হাতে বাড়তি নগদ থাকলে আর সম্প্রসারণের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা না থাকলে বাইব্যাকের সুযোগ থাকা উচিত, কারণ শেয়ার সংখ্যা কমলে ইপিএস বেড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীই উপকৃত হন তবে এটা বাধ্যতামূলক না করে ঐচ্ছিক রাখাই ভালো। ভারতে এই ব্যবস্থা ২০১৩ সালের কোম্পানি আইন আর সেবির ২০১৮ সালের বাইব্যাক প্রবিধানের অধীনে সুনির্দিষ্ট সীমা আর কুলিং-অফ পিরিয়ড মেনে পরিচালিত হয়।
আমার নিজের পর্যবেক্ষণ হলো, বাইব্যাক নিজে ভালো বা মন্দ কোনোটাই নয়; এটা একটা নিরপেক্ষ হাতিয়ার, যার ফলাফল নির্ভর করে তিনটে জিনিসের ওপর। প্রথমত, কোম্পানি কোন দামে নিজের শেয়ার কিনছে; কম মূল্যায়িত অবস্থায় কেনা শেয়ারহোল্ডারের পক্ষে যায়, বেশি দামে কেনা শেয়ারহোল্ডারের টাকাই নষ্ট করে। দ্বিতীয়ত, সেই টাকার আসল বিকল্প ব্যবহার কী ছিল, সম্প্রসারণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাইব্যাক বেছে নেওয়া মানে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি বিসর্জন দেওয়া। তৃতীয়ত, সিদ্ধান্তটা কাদের স্বার্থে নেওয়া হচ্ছে, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের নাকি বোনাসের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য। বাংলাদেশে যদি সত্যিই এই বিধান আসে, তাহলে বিএসইসির নজর সবচেয়ে বেশি রাখা উচিত এই তৃতীয় বিষয়টার ওপর, কারণ আইন খোলা রাখলেই যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে স্বচ্ছতা আর সুশাসনের কাঠামোটাও একসঙ্গে গড়ে তুলতে হবে, নইলে যে হাতিয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীর রক্ষাকবচ হওয়ার কথা, সেটাই হয়ে উঠতে পারে পরিচালকদের আরেকটা সুবিধাভোগের পথ।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

