বিশেষ বিশ্লেষণ
রোববার রাত ১২টার পর থেকে দেশের বাজারে ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে লিটার প্রতি ১৩৫ টাকা, আগে যা ছিল ১১৫ টাকা। এক ধাক্কায় ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া এই দাম দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্য, আর শতাংশের হিসাবে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২২ সালের আগস্টে ইউক্রেন যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় দাম সমন্বয়। সঙ্গে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দামও বেড়েছে সমান হারে। সংখ্যাটা শুনতে ছোট মনে হলেও এর আসল ধাক্কা লাগবে এমন এক জায়গায়, যেখানে হিসাব সবচেয়ে টাইট; কৃষকের ক্ষেতে। কারণ এই মুহূর্তে দেশের কৃষক আমন ধান তুলছেন, আর নভেম্বর থেকে শুরু হবে বোরোর বীজতলা তৈরির কাজ। অর্থাৎ যে সময়ে বাড়তি খরচের ধাক্কা সবচেয়ে কম দরকার ছিল, ঠিক সেই সময়েই এলো এই সিদ্ধান্ত।
কেন ডিজেলের দামেই এত কাঁপন ওঠে কৃষিতে
বাংলাদেশের কৃষি এখনো মূলত ডিজেল নির্ভর একটা যন্ত্র–ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। দেশে ২১ লাখের বেশি কৃষিযন্ত্র আছে, যার মধ্যে ৩ লাখ ৮০ হাজার পাওয়ার টিলার আর ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত সেচপাম্প। দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সেচ ব্যবস্থাই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এই যন্ত্রগুলোই মূলত চলে শুষ্ক মৌসুমের বোরো ধান আবাদে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাবে কৃষিযন্ত্রে বছরে প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন ডিজেল খরচ হয়, যা দেশের বার্ষিক জ্বালানি ব্যবহারের ১৫ শতাংশের বেশি। আর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, বোরো উৎপাদনের মোট খরচের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই যায় শুধু সেচ বাবদ। তাই ডিজেলের দাম বাড়া মানে সরাসরি ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় খরচের জায়গাটায় আঘাত লাগা, এটা কোনো পরোক্ষ প্রভাব নয়, একদম সরাসরি হিসাব।
যে অর্থনৈতিক ফাঁদে পড়েছেন কৃষক
এখানেই লুকিয়ে আছে আসল সমস্যাটা, যেটা শুধু “খরচ বেড়েছে” বললে বোঝা যায় না। কৃষক তার উৎপাদন খরচ বাড়লেই সেটা ধানের দামে যোগ করে দিতে পারেন না কারণ ধানের দাম নির্ধারণ হয় বাজারে চাহিদা–জোগানের ভিত্তিতে, আমদানির বিকল্প থাকা অবস্থায়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্যই বলছে, গত মঙ্গলবার ঢাকার খুচরা বাজারে মোটা চাল বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি ৫০–৫৫ টাকায়, এক বছর আগে যা ছিল ৫৫–৬০ টাকা। অর্থাৎ চালের দাম বরং কমেছে, অথচ উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অর্থনীতিতে একে বলে “কস্ট–প্রাইস স্কুইজ” যেখানে উৎপাদক একদিকে বাড়তি খরচের চাপে পড়েন, অন্যদিকে বিক্রয়মূল্য বাড়ানোর সুযোগ পান না, কারণ তিনি বাজারে মূল্য নির্ধারক নন, মূল্য গ্রহীতা মাত্র। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়, কারণ স্বল্প মেয়াদে সরবরাহ সহজে কমানো বা বাড়ানো যায় না। জমি প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত তো মাসখানেক আগেই নিতে হয়। ফলে বাড়তি খরচের পুরো বোঝাটা গিয়ে পড়ে কৃষকের নিজের লাভের অংশে।
একা ডিজেল নয়, একসঙ্গে অনেকগুলো ধাক্কা
সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ এই মূল্যবৃদ্ধি একা আসেনি। দেশের বিভিন্ন জেলায় এখন সার সংকট চলছে, আর গত দুই বোরো মৌসুমে অনেক কৃষক ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর কৃষক বাবলু মোল্লা যেমন বলছেন, “বোরো চাষে ব্যাপক সেচ প্রয়োজন হয়। হঠাৎ ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। অথচ গত দুই মৌসুম ধরে আমরা ধানের ন্যায্য দাম পাই না।” রংপুরের কাউনিয়ার কৃষক আমজাদ হোসেন বলছেন, ধানের দাম না বাড়লে ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে তাদের লোকসান গুনতে হবে। এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ; জাতীয় মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের অনেক ওপরে, আর গত চার বছরের বেশি সময় ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার জীবনযাত্রার খরচের তুলনায় পিছিয়ে আছে বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। অর্থাৎ কৃষক একা নন, প্রায় গোটা অর্থনীতিই একসঙ্গে একাধিক চাপের মুখে।
রেশ ছড়াচ্ছে পরিবহন থেকে সবজির বাজার পর্যন্ত
ডিজেলের দামের এই প্রভাব থেমে থাকছে না শুধু খেতে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া ইতিমধ্যে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে, দূরপাল্লার কিছু বাসে ভাড়া বেড়েছে ১০০ টাকা পর্যন্ত। বেনাপোল থেকে ঢাকাগামী ট্রাকভাড়া ২২–২৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩০ হাজার টাকা ছুঁয়েছে, চট্টগ্রামগামী পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া উঠেছে ৩৫–৪০ হাজার টাকায়। রাজশাহীর এক ট্রাকচালক জানিয়েছেন, বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে কৃষিপণ্য পরিবহনে এখন ট্রিপপ্রতি অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা বেশি লাগবে; যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে সবজির খুচরা দামে। অর্থাৎ যে কৃষক নিজে ধানের দাম বাড়াতে পারছেন না, তিনি আবার ভোক্তা হিসেবে বাড়তি দামে সবজি, পরিবহন আর নিত্যপণ্য কিনতে বাধ্য হবেন। এই দ্বিমুখী চাপটাই আসলে সবচেয়ে নিষ্ঠুর।
অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান সরাসরি বলেছেন, এই মুহূর্তে কৃষকদের সহায়তার জন্য প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া জরুরি, না হলে উৎপাদন খরচ বহন করতে না পেরে অনেক কৃষক আবাদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হবেন, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. রোস্তম আলীর পর্যবেক্ষণও একই রকম; কৃষি উপকরণের দামের ওপর কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দামও পান না, তার ওপর জ্বালানির দাম বাড়ায় তারা আরও চাপে পড়বেন। ড. ফাহমিদা খাতুন অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথের কথা তুলে ধরেছেন, রাজস্ব ঘাটতির কারণে দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে সীমিত পথ থাকলেও, জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত উচ্চ আমদানি শুল্ক সাময়িকভাবে কমানো যেত, পাশাপাশি বিপিসির প্রকৃত আমদানি খরচ, পরিচালন ব্যয় ও লোকসানের হিসাব প্রকাশ্যে আনার দাবিও জানিয়েছেন তিনি, যাতে ভোক্তার ওপর চাপ আর সরকারের রাজস্ব চাহিদার মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখা যায়।
একটা আশার জায়গাও আছে
তবে পুরো চিত্রটা শুধু হতাশার নয়। দেশের কিছু এলাকায় সৌরচালিত সেচ পাম্পের পরীক্ষা ইতিমধ্যে আশা দেখাচ্ছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিএডিসির উদ্যোগে বসানো সোলার সেচ পাম্পে কৃষকের সেচ খরচ প্রতি কানিতে ২৫০০–৩০০০ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬০০ টাকায়; প্রায় অর্ধেক। এই পাম্পে ডিজেল বা বিদ্যুৎ কোনোটাই লাগে না, চলে সূর্যের আলোয়। সমস্যা হলো, এই সমাধান এখনো ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ, আর ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত পাম্পকে রাতারাতি সৌরে রূপান্তর করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সরকার যদি সৌর সেচ সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামার সঙ্গে কৃষকের ভাগ্য বাঁধা থাকার এই ঝুঁকিটা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শেষ কথা
এই পুরো পরিস্থিতিটা বিশ্লেষণ করলে একটা সহজ সত্য সামনে আসে, বাংলাদেশের বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ জোগান দেয়, আর সেই বোরোর প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে ডিজেলচালিত সেচের ওপর। অর্থাৎ জ্বালানি নীতি আর খাদ্যনিরাপত্তা নীতি বাংলাদেশে আসলে একই সুতোয় গাঁথা, আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। স্বল্প মেয়াদে কৃষকের হাতে বিকল্প কম বলেই যেকোনো জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির চাপ তার ওপর প্রথমে ও সবচেয়ে বেশি পড়ে; এটা নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা নয়, বরং কৃষিপণ্যের বাজার–কাঠামোর একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য, যা বিশ্বজুড়েই কমবেশি সত্য। কিন্তু ঠিক এই কারণেই লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি বা প্রণোদনার মতো হস্তক্ষেপ এখানে বিলাসিতা নয়, বরং খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখার একটা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী। বোরো মৌসুম শুরুর আগেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলে, আগামী কয়েক মাসে শুধু কৃষকের পকেটেই নয়, দেশের চালের বাজার আর আমদানি ব্যয়েও এর রেশ টের পাওয়া যাবে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

