বিশেষ প্রতিবেদন
ধরুন একটা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল, তার কারখানা-জমি-মেশিন সব নিলামে উঠল। সেই বিক্রির টাকা থেকে ব্যাংক তার ঋণ চাইছে, কর্মীরা চাইছেন বকেয়া বেতন, সরকার চাইছে বকেয়া কর, সাপ্লায়াররা চাইছেন পণ্যের দাম, আর শেয়ারহোল্ডাররা চাইছেন তাদের বিনিয়োগের কিছু অংশ ফেরত। সমস্যা হলো, বিক্রি হওয়া সম্পদ প্রায় সময়ই এত টাকা তুলতে পারে না যে সবাইকে পুরো পাওনা মিটিয়ে দেওয়া যায়। তখনই কাজে আসে একটা নির্দিষ্ট সিরিয়াল বা অগ্রাধিকারের ক্রম, যা ঠিক করে দেয় কে আগে পাবে, কে পরে, আর কে হয়তো কিছুই পাবে না। এই ক্রমটা কোনো নির্বিচার সিদ্ধান্ত নয়; এটা নিয়মে বাঁধা, এবং এই নিয়মটা বুঝতে পারলে আপনি বুঝবেন কেন ব্যাংক ঋণ দেওয়ার আগে জমি বন্ধক চায়, কেন সাপ্লায়াররা বড় অঙ্কের বাকিতে মাল দিতে ভয় পান, আর কেন শেয়ারে বিনিয়োগ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরনের বিনিয়োগ বলে গণ্য হয়।
জামানত যার হাতে, লাইনের সামনে সে
দেউলিয়াত্বের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বুনিয়াদি ভাগটা হলো জামানতি (সিকিউরড) আর অজামানতি (আনসিকিউরড) পাওনাদারের মধ্যে। যে ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান কোনো নির্দিষ্ট সম্পদ, জমি, কারখানা, যন্ত্রপাতি বন্ধক রেখে ঋণ দিয়েছে, সেই সম্পদটার ওপর তার একটা আইনি দাবি (লিয়েন) তৈরি হয়ে যায়। কোম্পানি দেউলিয়া হলেও সেই নির্দিষ্ট সম্পদ কার্যত ওই ঋণদাতার নামেই বাঁধা থাকে; লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তিনি সেটা বিক্রি করে নিজের পাওনা তুলে নেওয়ার অধিকার রাখেন। এখানেই ব্যাংক ঋণ আর সাধারণ বাকির মধ্যে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়; সাপ্লায়ার যখন বাকিতে মাল দেন, তার হাতে কোনো নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর দাবি থাকে না, তিনি কোম্পানির সাধারণ বিশ্বাসের ওপর ভর করেই ব্যবসা করেন। তাই যেকোনো দেউলিয়া প্রক্রিয়ায় প্রথম নিয়মটাই হলো, জামানতি ঋণদাতা তার বাঁধা সম্পদ থেকে আগে পাওনা তুলবেন, আর বাকি যা থাকবে তা নিয়ে বাকিরা লড়বেন।
জামানতি ঋণদাতার হিসাব মেটার পর যে সাধারণ (ফ্রি) সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, সেখান থেকে প্রথমেই কাটা যায় লিকুইডেশনের নিজস্ব খরচ; লিকুইডেটরের ফি, আইনি ব্যয়, প্রশাসনিক খরচ। এরপর আসে একটা বিশেষ শ্রেণি, যাকে বলা হয় প্রেফারেনশিয়াল বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পাওনাদার। বাংলাদেশে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৩২৫ ধারায় এই শ্রেণিটা নির্দিষ্ট করা আছে, সরকারের বকেয়া কর ও রাজস্ব, কর্মীদের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার (সাধারণত উইন্ডিং-আপ আদেশের আগের নির্দিষ্ট মাসগুলোর) বেতন-মজুরি, ছুটির পাওনা, প্রভিডেন্ট ফান্ড-গ্র্যাচুইটির মতো কর্মী-কল্যাণ তহবিলের বকেয়া; এই সবগুলো একসঙ্গে, সমান পর্যায়ে বিবেচিত হয় এবং সাধারণ অজামানতি পাওনাদারের আগে পরিশোধ করতে হয়। এই বিন্যাসটা কোনো বাংলাদেশি উদ্ভাবন নয়; এর শিকড় ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ কোম্পানি আইনে, যেখানে ধারণা করা হয়েছিল, একজন শ্রমিক যিনি প্রতি মাসের বেতনের ওপর সংসার চালান, তাকে একজন বড় প্রাতিষ্ঠানিক পাওনাদারের চেয়ে বাড়তি সুরক্ষা দেওয়া উচিত, কারণ শ্রমিকের পক্ষে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই যেমনটা একটা ব্যাংকের থাকে।
তারপর কী হয়; সারিতে বাকিরা
প্রেফারেনশিয়াল পাওনা মিটে যাওয়ার পর সম্পদ যদি আরও কিছু বেঁচে থাকে, তাহলে সেটা পায় ভাসমান জামানত (ফ্লোটিং চার্জ)-এর ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া পাওনাদাররা অর্থাৎ যাদের জামানত কোনো নির্দিষ্ট সম্পদে বাঁধা নয়, বরং কোম্পানির সামগ্রিক পরিবর্তনশীল সম্পদের ওপর একটা সাধারণ দাবি। এরপর আসে সাধারণ অজামানতি পাওনাদারদের পালা; সাপ্লায়ার, ঠিকাদার, সেবাদাতা, যাদের কোনো বিশেষ সুরক্ষা নেই। এই স্তরে টাকা সাধারণত সবাইকে সমান অনুপাতে (প্রো-রাটা) ভাগ করে দেওয়া হয়; অর্থাৎ অবশিষ্ট সম্পদ দিয়ে মোট দাবির যত শতাংশ মেটানো সম্ভব, প্রত্যেক অজামানতি পাওনাদার ঠিক সেই একই শতাংশ হারে তার পাওনা ফেরত পান; কারও দাবি বড়, কারও ছোট, কিন্তু আনুপাতিক হার সবার জন্য অভিন্ন থাকে। আর সবার শেষে, সব ঋণ-দায় মিটে যাওয়ার পর যদি সত্যিই কিছু উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে যায়, তবেই সেটা যায় শেয়ারহোল্ডারদের হাতে। প্রথমে প্রেফারেন্স শেয়ারহোল্ডার, তারপর সাধারণ শেয়ারহোল্ডার। এখানেই লুকিয়ে আছে কর্পোরেট ফাইন্যান্সের একটা মৌলিক সত্য, শেয়ারহোল্ডার আসলে কোম্পানির “অবশিষ্ট দাবিদার” (রেসিডুয়াল ক্লেইমেন্ট); কোম্পানি ভালো চললে তিনি সবচেয়ে বেশি লাভবান হন, কিন্তু কোম্পানি ডুবলে তিনিই সবার শেষে দাঁড়িয়ে থাকেন, প্রায়ই খালি হাতে। শেয়ারে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেশি বলা হয় মূলত এই কারণেই।
বাংলাদেশে লাইনটা যেখানে ভেঙে যায়
কাগজে-কলমের এই সাজানো সিরিয়াল যতটা পরিষ্কার শোনায়, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঠিক ততটা সরলরৈখিক নয়। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উইন্ডিং-আপ একটা দীর্ঘ, আদালতনির্ভর প্রক্রিয়া, আর ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলো বাস্তবে এই পথে খুব একটা হাঁটে না। তাদের হাতে আছে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩, একটা দ্রুতগতির আইন, যেখানে জামানতসম্পন্ন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান আদালতের অনুমতি ছাড়াই বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তুলে দিতে পারে। ফলে বাস্তবে যা ঘটে তা হলো, কোম্পানি বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংক সবার আগে দৌড়ে গিয়ে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটা বিক্রি করে নিজের পাওনা তুলে নেয়, আর যখন প্রকৃত উইন্ডিং-আপ প্রক্রিয়া শুরু হয়, ততক্ষণে কর্মী-সরকার-সাপ্লায়ারের জন্য প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। অর্থাৎ আইনের বইয়ে যে অগ্রাধিকারের ক্রম লেখা আছে, বাস্তবে ব্যাংক সেই ক্রমের বাইরে গিয়েই এগিয়ে যায়; এটা কোনো অভিযোগ নয়, বরং আইনি কাঠামোর একটা স্বীকৃত ফাঁক, যা নিয়ে দেশের আইনি বিশ্লেষকরাও একমত।
আরও কৌতূহলোদ্দীপক একটা তথ্য হলো, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়াত্ব নিয়ন্ত্রণকারী আলাদা আইন, দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭-এর নিজস্ব পরিশোধ-ক্রমে (৭৫ ধারা) একটা অস্বাভাবিক বিচ্যুতি আছে। স্বাভাবিক নিয়মে সব অজামানতি পাওনাদারকে সমান চোখে দেখা হয়; একে বলে “পারি পাসু” নীতি। কিন্তু এই আইনে প্রশাসনিক খরচ ও সরকারি পাওনার পর, এবং সীমিত অঙ্কের কর্মীর মজুরির পর, “ব্যাংক-ঋণ”কে আলাদা করে সাধারণ অজামানতি পাওনাদারদের অর্থাৎ সাপ্লায়ার, ঠিকাদার ওপরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আইনের চোখেই ব্যাংকিং খাতকে একটা কাঠামোগত সুবিধা দেওয়া আছে, ট্রেড ক্রেডিট দেওয়া ছোট ব্যবসায়ীদের চেয়ে। যদিও ১৯৯৭ সালের এই আইনটি কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রায় ব্যবহারই হয় না বললেই চলে; এটা মূলত ব্যক্তি-দেউলিয়াত্বের জন্যই কাজে লাগে তবু এই একটা ধারা বলে দেয়, বাংলাদেশের আইনি কাঠামোয় “কে আগে পাবে” প্রশ্নের উত্তর সবসময় নিরপেক্ষ নীতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এখানে ব্যাংক ঋণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কেন এখন এই আলোচনা জরুরি
এই পুরো বিষয়টা নিছক তত্ত্বকথা নয়, এটা এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার পৌঁছে গিয়েছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ বলে চিহ্নিত হয়েছিল; পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধায় ডিসেম্বরের মধ্যে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে। এত বড় অঙ্কের ঋণ যখন আদায়যোগ্য থাকে না, তখন দেউলিয়াত্বের কাঠামো কতটা দক্ষ ও ন্যায্য, তার ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলো কতটা টাকা ফেরত পাবে, আর অর্থনীতির বাকি অংশ; কর্মী, সরবরাহকারী, বিনিয়োগকারী কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বাস্তবতা থেকেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির শর্ত হিসেবে বাংলাদেশ সরকার একটা নতুন, একীভূত দেউলিয়া আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার লক্ষ্য হবে দুর্বল কিন্তু সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে সরাসরি লিকুইডেশনে না পাঠিয়ে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া। পাশাপাশি ২০২৫ সালের মে মাসে কার্যকর হওয়া ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশে একটা গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা যুক্ত করা হয়েছে; কোনো পাওনাদার যেন সাধারণ লিকুইডেশনে যা পেতেন তার চেয়ে কম না পান, এই নীতিকে ভিত্তি ধরে দুর্বল ব্যাংক সামলানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে, আর আমানত বিমার সীমাও দ্বিগুণ করে দুই লাখ টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এই পুরো অগ্রাধিকারের সিরিয়ালটা যা শেখায়, তা আইনের পাতার বাইরেও কাজের কথা। এটা বুঝিয়ে দেয় কেন একজন ব্যাংকার ঋণ দেওয়ার আগে জমির দলিল চান, কেন একজন সাপ্লায়ারের উচিত বড় অঙ্কের বাকি বিক্রির আগে লেটার অব ক্রেডিট বা মালিকানা-সংরক্ষণ শর্তের মতো সুরক্ষা রাখা, আর কেন একজন কর্মীর বেতন-ভাতা বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব সবসময় স্বচ্ছ ও সময়মতো নিষ্পত্তি হওয়া উচিত; কারণ কোম্পানি সংকটে পড়লে আইনি সুরক্ষা যতই থাকুক, বাস্তবে লাইনের পেছনে দাঁড়ানো মানুষটার হাতে প্রায়ই কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যে বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনেন, তাকেও এই সত্যটা মাথায় রাখা দরকার, লাভের ভাগ সবার আগে এলেও, ক্ষতির ভাগে তিনিই সবার শেষে। অগ্রাধিকারের এই ক্রমটা তাই কেবল একটা আইনি কৌশল নয়, বরং একটা ঝুঁকি-মানচিত্র, যা প্রতিটি পক্ষকে আগে থেকেই বলে দেয়, সংকটের দিনে তার অবস্থান ঠিক কোথায়।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

