বিশেষ বিশ্লেষণ
গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির একটা সভা হলো, আর তার পরদিনই বাজারে খবর ছড়াল; নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে। এই সিদ্ধান্ত ছয় বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নীতি সুদহার কমানোর ঘটনা। সংখ্যাটা দেখতে ছোট, মাত্র অর্ধেক শতাংশ পয়েন্ট, কিন্তু এই একটা সিদ্ধান্তের জেরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের চিত্র বদলে গেল রাতারাতি। প্রশ্ন হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা কাগজে লেখা সংখ্যা বদলালে হাজার হাজার কোটি টাকার শেয়ারবাজারে কেন এত নড়াচড়া হয়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটা সহজ অথচ প্রায় সবাই এড়িয়ে যাওয়া চেইনের ভেতরে; সুদহার, ঋণের খরচ, কোম্পানির মুনাফা আর শেয়ারের ভ্যালুয়েশন, এই চারটা জিনিস একে অপরের সঙ্গে বাঁধা।
সুদ কমলে শেয়ারের দাম বাড়ার কথা কেন
অর্থনীতির একটা প্রমাণিত নিয়ম আছে, যেটাকে বলা হয় ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো বা মূল্য-নির্ধারণী নীতি। কোনো কোম্পানির শেয়ারের আজকের দাম আসলে তার ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মুনাফার বর্তমান মূল্য, আর সেই বর্তমান মূল্য বের করার জন্য একটা ডিসকাউন্ট রেট ব্যবহার করা হয়। এই ডিসকাউন্ট রেটের সঙ্গে বাজারের সুদহারের সরাসরি সম্পর্ক; সুদহার কমলে ডিসকাউন্ট রেটও কমে, আর গাণিতিকভাবে তখন একই পরিমাণ ভবিষ্যৎ মুনাফার আজকের মূল্য বেড়ে যায়। এটা কোনো অনুমান নয়, বরং অর্থনীতির ভ্যালুয়েশন তত্ত্বের ভিত্তি, যা প্রায় প্রতিটি ফিনান্স পাঠ্যবইয়ে পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি আরেকটা সরল বাস্তবতাও কাজ করে, ব্যাংকের সুদহার কমলে কোম্পানিগুলোর ঋণের কিস্তি কমে, ফলে তাদের নিট মুনাফা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। দুটো পথ মিলিয়েই বাজার আশা করে, সুদ কমলে শেয়ারের দাম বাড়বে। কিন্তু বাস্তব বাজার কখনোই পাঠ্যবইয়ের মতো নিখুঁতভাবে চলে না, আর সেটাই এই ঘটনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।
বাস্তবে যা ঘটেছিল ঢাকার বাজারে
সিদ্ধান্তের পরদিন, ২ আগস্ট, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সকালে মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৫,৯০০ পয়েন্টের ঘর ছুঁয়ে ফেলেছিল, কিন্তু দিনশেষে তা নেমে এসে মাত্র শূন্য দশমিক ২ পয়েন্ট বেড়ে বন্ধ হয় ৫,৮৯৬ পয়েন্টে, যদিও লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এরপর ৩ আগস্ট সকালে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একরকম উচ্ছ্বাস দেখা যায়; মিউচুয়াল ফান্ড খাত সবচেয়ে বেশি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ মুনাফা এনে দেয়, সঙ্গে পাট ও সেবা খাতও ভালো করে। এখানেই গল্পের মোড় ঘোরে। সেই একই দিনে সিমেন্ট, লাইফ ইন্স্যুরেন্স আর ব্যাংকিং খাত পড়ে যায়, আর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো বড় ব্যাংকগুলোর শেয়ার সূচককে নিচে টেনে ধরে। যে খাতটার সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা ছিল, সেই ব্যাংকিং খাতই বাজারে পিছিয়ে পড়ল; এই বৈপরীত্যটাই বলে দেয়, তত্ত্ব আর বাস্তবতার মধ্যে কোথাও একটা ফাঁক আছে।
যেখানে তত্ত্ব হোঁচট খায়
এই ফাঁকটা বোঝার জন্য ব্যাংকের ব্যবসার মডেলটা মাথায় রাখা দরকার। ব্যাংক আসলে টাকা ধার দেয় আর জমা রাখে; এই দুইয়ের সুদহারের পার্থক্য বা স্প্রেড থেকেই তাদের মুনাফা আসে। নীতি সুদহার কমলে বাজারে সুদের হার সামগ্রিকভাবে নিচের দিকে চাপ খায়, আর তাতে ব্যাংকের নিট সুদ মার্জিন বা এনআইএম সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়; বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ ব্যাংক আগে থেকেই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে যে ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে, যেখানে বাস্তবে এই ব্যবধান ইতিমধ্যে ৪ দশমিক ৬৬ থেকে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। অর্থাৎ যে নিয়মটা সাধারণ শেয়ারের জন্য মুনাফা বাড়ানোর কথা, সেই একই নিয়ম ব্যাংকের জন্য মার্জিন কমানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই আমার পর্যবেক্ষণ হলো, সুদহার কমার প্রভাব সব খাতে সমান নয়, বরং যেসব কোম্পানির ব্যবসা ঋণনির্ভর কিন্তু মুনাফা সুদ থেকে আসে না, তারাই এই চেইনের আসল সুবিধাভোগী, ব্যাংকের মতো সুদনির্ভর প্রতিষ্ঠান নয়। এটা কোনো ব্যক্তিগত অনুমান নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের নিট সুদ মার্জিন সংক্রান্ত হিসাবরক্ষণ নীতিরই সরাসরি ফলাফল।
উচ্ছ্বাস কেন বেশিদিন টেকেনি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কী হলো। সুদহার কমার প্রায় একমাস পর, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাজারের চিত্র দেখলে বোঝা যায় আগস্টের সেই উচ্ছ্বাস স্থায়ী হয়নি। ৬ সেপ্টেম্বর ডিএসইএক্স একদিনেই ১০৩ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৫,৫৫৮ দশমিক ৪৫ পয়েন্টে নেমে আসে, আর সেদিন এনবিএফআই খাতে সবচেয়ে বেশি ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ধস নামে। এর কারণ খুঁজতে গেলে মুদ্রানীতির সংক্রমণ প্রক্রিয়া বা ট্রান্সমিশন মেকানিজম নামের একটা প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক নীতির কথা বলতেই হয়; নীতি সুদহার কমলেই ব্যাংকের বাস্তব ঋণের সুদহার সঙ্গে সঙ্গে কমে না, বরং তা কমতে সময় লাগে কয়েক মাস, কখনো কয়েক প্রান্তিক। বাস্তবেও তাই দেখা গেছে, রেপো রেট কমার পরও জুলাই মাসে ব্যবসায়ীদের একাংশকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ নিতে হয়েছে, আর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মে মাসে নেমে যায় দুই দশকের সর্বনিম্ন প্রায় ৫ শতাংশে। মূল্যস্ফীতিও তখনও লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশের অনেক ওপরে, প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, যার মানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেও খুব বেশি আক্রমণাত্মকভাবে সুদহার কমাতে পারছিল না। শেয়ারবাজার প্রথম দিনে যে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটা মূলত প্রত্যাশা আর মনস্তত্ত্বের খেলা; প্রকৃত মুনাফা বাড়ার প্রমাণ প্রান্তিক আয় প্রতিবেদনে আসতে অনেক বেশি সময় লাগে। তাই প্রথম দিনের উল্লম্ফন যতটা না বাস্তব উন্নতির প্রতিফলন, তার চেয়ে বেশি একটা ইতিবাচক সংকেতের প্রতি বাজারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।
সব মিলিয়ে যে শিক্ষাটা বের হয়ে আসে, তা হলো, সুদহার কমা শেয়ারবাজারের জন্য একটা প্রয়োজনীয় শর্ত হতে পারে, কিন্তু একমাত্র বা যথেষ্ট শর্ত নয়। যে বিনিয়োগকারী শুধু নীতি সুদহার কমার খবর দেখেই শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আসলে চেইনের প্রথম ধাপটাই দেখছেন, শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছাননি। প্রকৃত অর্থে লাভবান হতে হলে নজর রাখতে হবে দ্বিতীয় স্তরের তথ্যের দিকে; ব্যাংকের বাস্তব ঋণের সুদহার আদৌ কমছে কি না, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে কি না, আর কোম্পানিগুলোর প্রান্তিক আয়ের প্রতিবেদনে তার প্রতিফলন পড়ছে কি না। সুদহার কমার দিনে যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, সেটা গল্পের শুরু মাত্র; আসল পরীক্ষা হয় তার কয়েক মাস পর, যখন সংখ্যাগুলো সত্যিই বদলাতে শুরু করে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

