বিশেষ বিশ্লেষণ
ধার আর দুশ্চিন্তা, বাংলাদেশে এই দুটো শব্দ প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে। আর সেটা অমূলক নয়। এই বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশের বেশি; অর্থাৎ বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো যত টাকা ঋণ দিয়েছে, তার প্রতি তিন টাকার প্রায় এক টাকাই ফেরত আসছে না। বিশ্বের অন্যান্য অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে এই হার এখন বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চদের একটি। এমন পরিসংখ্যান দেখলে যে কারও মনে হবে, ধার করা মানেই বিপদ ডেকে আনা। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া হয়। সমস্যাটা “ঋণ” নামক জিনিসটায় নেই, সমস্যা হলো; সেই ঋণ কোথায় গেল, আর কী কাজে লাগল। একই দেশে, একই সময়ে, একজন উদ্যোক্তা মাত্র ৬-৭ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলছেন, আবার অন্যদিকে হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে সেটা কখনো ফেরতই আসছে না। ফারাকটা কোথায়; চলুন বেপারটা বোঝার চেস্টা করি।
যে সূত্রে ধার করা টাকা নিজেই নিজের সুদ শোধ করে
অর্থনীতিতে একে বলে লিভারেজ অর্থাৎ অন্যের টাকা ব্যবহার করে নিজের রিটার্ন বাড়িয়ে নেওয়ার কৌশল। হিসাবটা আসলে সহজ। ধরুন, একটা বিনিয়োগে ১০ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া যায়। আপনার কাছে ১০০ টাকা থাকলে আপনি ১০ টাকা লাভ করবেন। কিন্তু আপনি যদি নিজের মাত্র ৫০ টাকা লাগিয়ে বাকি ৫০ টাকা ধার করেন, তাহলেও লাভ হবে সেই ১০ টাকাই; কিন্তু এবার সেটা আপনার নিজের বিনিয়োগ করা ৫০ টাকার ওপর হিসাব করলে রিটার্নের হার দাঁড়ায় ২০ শতাংশ (ঋণের খরচ বাদ দিলে কিছুটা কমবে)। শর্ত একটাই; ঋণের সুদ যেন ওই ১০ শতাংশের চেয়ে কম হয়। এটাই আসলে “ভালো ঋণ” আর “খারাপ ঋণ”-এর মধ্যেকার আসল সীমারেখা। ভালো ঋণ এমন কিছুর জন্য নেওয়া হয় যা ভবিষ্যতে আয় বাড়ায় বা সম্পদের মূল্য বাড়ায়; একটা দোকান, একটা মেশিন, একটা প্রশিক্ষণ বা একটা শিক্ষাগত যোগ্যতা। আর খারাপ ঋণ যায় এমন কিছুর পেছনে যা কেনার সঙ্গে সঙ্গেই তার মূল্য কমতে থাকে এবং কোনো আয় তৈরি করে না; বিলাসী কেনাকাটা কিংবা এক ঋণ দিয়ে আরেক ঋণ মেটানো।
তবে শুধু “আয় বাড়বে” ভাবাটাই যথেষ্ট নয়, এখানে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত একটা কঠোর পরীক্ষা আছে, যাকে বলা চলে ক্যাশ ফ্লো টেস্ট। প্রশ্নটা হলো, যে জিনিসের জন্য ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেটা কি নিজে থেকেই এত আয় তৈরি করবে যা দিয়ে কিস্তি শোধ হয়ে যাবে, আর তারপরও হাতে কিছু থেকে যাবে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে সেটা বিনিয়োগ। উত্তর যদি না হয়; শুধু “ভবিষ্যতে দাম বাড়বে” গোছের আশা থাকে; তাহলে সেটা বিনিয়োগ নয়, জুয়া। এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বজুড়ে ঋণদাতারা ঋণ অনুমোদনের আগে ধার-আয় অনুপাত (ডেট-টু-ইনকাম রেশিও) মেপে দেখেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংকগুলো সাধারণত ৪৩ শতাংশের বেশি ধার-আয় অনুপাতকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরে নেয় অর্থাৎ আপনার মাসিক আয়ের ৪৩ শতাংশের বেশি যদি কিস্তি শোধেই চলে যায়, তাহলে সেই ঋণ শোধ করতে না পারার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই নীতি কোনো দেশের আইন নয়, এটা ঝুঁকি বিশ্লেষণের একটা প্রমাণিত সূত্র; যা যেকোনো ঋণগ্রহীতা নিজের জীবনেও প্রয়োগ করতে পারেন।
যে সেলাই মেশিন একটা পরিবারের আয় পাল্টে দেয়
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই তত্ত্বটা শুধু বইয়ের কথা নয়; এটা প্রমাণিত। ১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নিয়ে বিশ্বজুড়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার একটা বড় অংশই দেখিয়েছে যে জামানতহীন ছোট অঙ্কের ঋণ, যখন সরাসরি আয় তৈরির কাজে; যেমন একটা সেলাই মেশিন, একটা গরু বা একটা ছোট দোকানে ব্যবহৃত হয়, তখন সেই পরিবারের আয়, সঞ্চয় ও সম্পদ প্রকৃতপক্ষে বাড়ে। এই মডেলের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পর্যন্ত এসেছে। আজকের বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতেও এই একই দর্শনের ছাপ স্পষ্ট। যেখানে সাধারণ এসএমই ঋণের সুদহার এখন ১৩.৭৫ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, সেখানে ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পে সুদহার নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশে, আর নারী উদ্যোক্তাদের জন্য তা ৫ থেকে ৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত। এখানেই একটা কৌতূহলোদ্দীপক ফাঁক চোখে পড়ে, এত সুবিধাজনক শর্ত থাকা সত্ত্বেও মোট এসএমই ঋণের মাত্র ৬ শতাংশের কিছু বেশি যাচ্ছে নারী উদ্যোক্তাদের কাছে। অথচ এই অল্প সুদে নেওয়া একটা ছোট ঋণই কারও মাসিক আয়ে এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা বছরের পর বছর ধরে ওই পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে ধরে রাখে। বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ আছে, যেগুলো মিলিয়ে জিডিপির প্রায় ২৪-২৫ শতাংশ অবদান রাখে; সংখ্যাটা বিশাল, কিন্তু ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে তুলনা করলে প্রতিটি উদ্যোগের গড় উৎপাদনক্ষমতা এখনো অনেক পিছিয়ে। এই ফারাকটাই বলে দেয়, ঋণের সহজলভ্যতা নয়; ঋণটা সঠিক জায়গায় পৌঁছানো এবং সঠিকভাবে ব্যবহৃত হওয়াটাই আসল চ্যালেঞ্জ।
তাহলে যে ঋণ দেশটাকেই বিশ্বরেকর্ডে নিয়ে গেল, তার সমস্যাটা কোথায়
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে দেশের ব্যাংক খাত এমন সংকটে পড়ল কেন? উত্তরটা আসলে ওই একই নীতির উল্টো পিঠ। এই বছরের মার্চ নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে; যার একটা বড় কারণ, সরকার নিজেই রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ব্যাপক হারে ধার করছে, ফলে উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ আর দুর্বল আদায় ব্যবস্থার কারণে যে অনিয়মিত ঋণ লুকিয়ে ছিল, তা এখন একসঙ্গে হিসাবের খাতায় উঠে এসেছে। এই পুরো চিত্রটা যদি খেয়াল করেন, দেখবেন, এখানে সমস্যাটা “মানুষ ঋণ নিয়েছে” তা নয়, সমস্যা হলো সেই ঋণ কখনোই ওই ক্যাশ ফ্লো টেস্টের মুখোমুখি হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া ঋণ, সম্পর্কের ভিত্তিতে অনুমোদিত ঋণ, কিংবা ইচ্ছাকৃত খেলাপি; এসবের কোনোটাই আয়-উৎপাদনের হিসাব মিলিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে একই সময়ে একদিকে ৬ শতাংশ সুদে নেওয়া একটা সেলাই মেশিনের ঋণ পরিবারকে স্বাবলম্বী করছে, অন্যদিকে হাজার কোটি টাকার শিল্প ঋণ কোনো উৎপাদন ছাড়াই খেলাপি হয়ে দেশের পুরো ব্যাংক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।
তাহলে পরের বার যখন কোনো ঋণের প্রস্তাব সামনে আসবে; হতে পারে সেটা ব্যবসা বাড়ানোর জন্য, একটা প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য, বা একটা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য; তখন একটাই কাঠামো মাথায় রাখা যথেষ্ট। প্রথমত, এই টাকা যে কাজে লাগবে, সেটা কি ঋণের সুদের হারের চেয়ে বেশি আয় তৈরি করবে? দ্বিতীয়ত, সেই আয় থেকেই কি মাসিক কিস্তি শোধ করে হাতে কিছু বাড়তি থাকবে, নাকি পুরোটাই কিস্তির পেছনে চলে যাবে? তৃতীয়ত, ধরে নিন হিসাব মিলল না; তখন সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে কতটা ক্ষতি সামলানোর সামর্থ্য আছে? এই তিনটে প্রশ্নের সৎ উত্তর যাদের কাছে আছে, তাদের জন্য ঋণ সত্যিই একটা হাতিয়ার, আয় বাড়ানোর, স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার। আর যাদের কাছে নেই, তাদের জন্য প্রতিটি ঋণের কাগজ আসলে ভবিষ্যতের একটা ফাঁদ। ঋণ নিজে ভালো বা মন্দ কিছু নয়; এটা শুধু একটা হাতিয়ার, আর যেকোনো হাতিয়ারের মতোই এর ফল নির্ভর করে কার হাতে, কীভাবে এবং কেন সেটা ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

