আপনি কি কখনো ভেবেছেন, একজন বিদেশি উদ্যোক্তা ঢাকায় এসে জমি ঘুরে দেখে, বৈঠক করে, হাসিমুখে ছবি তুলে ফিরে গেলে সেটা হিসাবে কীভাবে ওঠে? বাংলাদেশে অনেক সময় সেটা দেখা হয় “বিনিয়োগ আগ্রহ” হিসেবে। তারপর কয়েক মাস পর দেখা যায়, কারখানাটা বসছে অন্য কোনো দেশে। সুবিধা হলো, এখন পরিসংখ্যান আসল চিত্রটা দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে প্রায় ১৭৭ কোটি ডলার। আগের বছরের প্রায় ১২৭ কোটি ডলারের চেয়ে তা ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। আঙ্কটাড একে কঠিন কয়েক বছরের পর পুনরুদ্ধার বলেছে, আর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম গ্রহীতা। খবরটা ভালো, সন্দেহ নেই। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে: যাঁরা আসতে চান, তাঁদের কতজন সত্যিই আসেন?
গোনা হয় প্রস্তাব, কিন্তু কারখানা গড়ে ওঠে অন্য হিসাবে
বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রথম ধাপ বিডার নিবন্ধন, আর নিবন্ধিত প্রস্তাবই বিনিয়োগ আগ্রহের সবচেয়ে চেনা মাপকাঠি। ২০২৩ থেকে ২৪ অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত বেসরকারি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মূল্য ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। ২০২৪ থেকে ২৫ অর্থবছরে তা নেমেছে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকায়, অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিবন্ধিত প্রকল্প ১৬১টি, মূল্য ১৪ হাজার ২২ কোটি টাকা। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী চীন থেকে নিবন্ধিত প্রস্তাব কমেছে ৮৯ শতাংশ, আর একই সময়ে চীন থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। কাতার থেকে কোনো নতুন প্রস্তাবই আসেনি। বিদেশ সফর, সম্মেলন আর সেমিনার হয়েছে বিস্তর, কিন্তু সেই উৎসাহ বাস্তব বিনিয়োগে গড়ায়নি বলেই ওই প্রতিবেদনের মূল্যায়ন। ঘাটতিটা বিডা নিজেও স্বীকার করছে। টিবিএসের সাক্ষাৎকারে সংস্থাটির তৎকালীন নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের শেষে দায়িত্ব নিয়ে তিনি রোডশো আর সম্মেলনের সেরা ১০ কোম্পানির একটা তালিকা চেয়েছিলেন। সেরকম কোনো তালিকাই ছিল না, ফলো আপও হয়নি। তাঁর ভাষ্য, বছরের পর বছর প্রথম আগ্রহকেই ফল ধরে নেওয়া হয়েছে, বিনিয়োগকারীকে সিদ্ধান্ত পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়ার কাজটা কেউ করেনি। বিডার নিজস্ব দাবি অবশ্য ভিন্ন সুরের। তাদের হিসাবে ২০২৩ থেকে ২৪ অর্থবছরের বিদেশি প্রস্তাবের প্রায় ৫২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, আর যাচাই কড়া করার পর পরের বছর বাস্তবায়ন ছিল প্রস্তাবের প্রায় ১৪৪ শতাংশ। এটি সংস্থাটির নিজের বিবৃতি, স্বাধীন উৎসে আমি এর যাচাই পাইনি। তবে হিসাব যা-ই হোক, একটা বিষয় পরিষ্কার: প্রস্তাবের অঙ্ক দিয়ে বিনিয়োগের স্বাস্থ্য মাপা যায় না।
১৭৭ কোটি ডলারের ভেতরে ঢুকলে কী দেখা যায়
এফডিআই আসলে তিন ধরনের অর্থের যোগফল: বিদেশি বিনিয়োগকারীর কেনা শেয়ারমূলধন, বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির মুনাফার যে অংশ ব্যবসায়ই থেকে যায় (পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়), আর মূল কোম্পানির কাছ থেকে শাখা কোম্পানির নেওয়া ঋণ। আঙ্কটাডের সংজ্ঞায় তিনটিই এফডিআই। তবে ওইসিডি বলছে, নতুন বিনিয়োগের সংকেত হিসেবে সাধারণত শেয়ারমূলধনকেই ধরা হয়, কারণ নতুন কারখানা বা অধিগ্রহণ সাধারণত সেই পথেই আসে। বিডার প্রকাশিত সংখ্যা ধরে হিসাব করলে ২০২৫ সালের এফডিআইয়ের মধ্যে শেয়ারমূলধন ৫৫ কোটি ৪৬ লাখ ডলার (প্রায় ৩১ শতাংশ), পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ৪৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার (প্রায় ২৫ শতাংশ), আর মূল কোম্পানির ঋণ ৭৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার (প্রায় ৪৪ শতাংশ)। আরও মজার হিসাবটা বৃদ্ধির অংশে। আগের বছরের চেয়ে মোট এফডিআই বেড়েছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। আমার গণনায় এর ৩৩ কোটি ডলারের কিছু বেশি এসেছে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় থেকে, প্রায় ১৬ কোটি ডলার মূল কোম্পানির ঋণ থেকে, আর শেয়ারমূলধন বেড়েছে মাত্র ১ কোটি ডলারের মতো, যা মোট বৃদ্ধির প্রায় ২ শতাংশ। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও ডেইলি স্টারকে বলেছেন, ঋণের বৃদ্ধি মূলত বিদ্যমান কার্যক্রমে মূল কোম্পানির অর্থায়ন, নতুন বিনিয়োগ নয়। ন্যায্যভাবে বললে, বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলো মুনাফা দেশে রেখে দিচ্ছে, এটাও আস্থার একটা লক্ষণ। বিডা এবং আঙ্কটাড দুই পক্ষই সেটাই বলেছে। কিন্তু নতুন কারখানার সঙ্গে যে অর্থের সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, সেই শেয়ারমূলধন প্রায় স্থির রয়ে গেছে।
৫৭ শতাংশ আগ্রহী কোম্পানি, তবু ব্যবধান এত বড় কেন
জাপানি কোম্পানির উদাহরণটা এখানে খুব কাজের। জেট্রোর ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের জরিপে বাংলাদেশে কর্মরত জাপানি কোম্পানির প্রায় ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ আগামী এক থেকে দুই বছরে কার্যক্রম বাড়াতে চেয়েছে। এটি ভিয়েতনামের সমান এবং বৈশ্বিক গড় ৪৫ শতাংশের ওপরে। বড় সুবিধা হিসেবে তারা দেখেছে কম শ্রমব্যয়, বাজারের আকার, প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আর ভাষাগত বাধা কম থাকা। অথচ ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ প্রায় ৩৫ কোটি ডলার, ভিয়েতনামে তা ৭৯ বিলিয়ন ডলার। জেট্রোর কর্মকর্তারা অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন, বহুজাতিক জাপানি কোম্পানি অনেক সময় সিঙ্গাপুর বা সুইজারল্যান্ডের মতো তৃতীয় দেশ হয়ে বিনিয়োগ করে, তাই সরকারি হিসাবে পুরো ছবি ওঠে না। তবু ব্যবধানটা বড়। একই জরিপে জাপানি কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিতিশীলতাকে (৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ) এবং কর প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে (৮১ দশমিক ৫ শতাংশ) প্রধান ঝুঁকি বলেছে। নীতির অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক বিলম্ব ও দুর্বল আইনি কাঠামোকে ঝুঁকি বলেছে প্রতিটির ক্ষেত্রে ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ। মনে রাখা দরকার, জরিপটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে হয়েছে এবং বাংলাদেশ থেকে সাড়া দেওয়া কোম্পানির সংখ্যা তুলনামূলক কম, তাই একে চূড়ান্ত রায় নয়, দিকনির্দেশক হিসেবে দেখাই ভালো। এই ধাঁধার একটা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেয় জন ডানিংয়ের ওএলআই কাঠামো। এতে বলা হয়, কোনো কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ করে তখনই, যখন তার নিজের কিছু শক্তি থাকে (প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড, ব্যবস্থাপনা), সেই শক্তি কাজে লাগানোর মতো অবস্থানগত সুবিধা ওই দেশে মেলে, আর নিজে সরাসরি করাটা লাইসেন্স দেওয়ার চেয়ে লাভজনক হয়। অবস্থানগত সুবিধা বলতে শুধু সস্তা শ্রম নয়, ধরা হয় বাজারের আকার, অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক মান আর সামষ্টিক স্থিতিশীলতাও। আমার পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের শ্রমব্যয় ও বাজারের দিকটা শক্ত, কিন্তু অবকাঠামো, প্রশাসনিক গতি আর নীতির ধারাবাহিকতার দিকটা দুর্বল। ফলে আগ্রহ তৈরি হয়, কিন্তু সিদ্ধান্তের শেষ ধাপে গিয়ে হিসাব মেলে না।
অর্থনীতির একটা নিয়ম বলে, অপেক্ষারও দাম আছে
আর একটা প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব আগ্রহ আর বিনিয়োগের ফারাক আরও পরিষ্কার করে। অবিনাশ দীক্ষিত ও রবার্ট পিন্ডাইক তাঁদের “ইনভেস্টমেন্ট আন্ডার আনসার্টেইনটি” বইয়ে (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৪) দেখিয়েছেন, কারখানা বসানোর খরচ একবার করলে ফেরত পাওয়া যায় না, আর সিদ্ধান্তের আগে কোম্পানির হাতে থাকে নতুন তথ্য দেখার জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ। এই সুযোগটা অনেকটা আর্থিক কল অপশনের মতো, বিনিয়োগ করলে অপশনটা ফুরিয়ে যায়। তাই প্রচলিত হিসাব, অর্থাৎ প্রকল্পের মূল্য খরচের চেয়ে বেশি হলেই বিনিয়োগ, এখানে যথেষ্ট নয়। মূল্যকে খরচের ওপর অপেক্ষার মূল্যও ছাড়াতে হয়, আর অনিশ্চয়তা বাড়লে অপেক্ষার মূল্যও বাড়ে। একটু ভাবুন, আপনি বিদেশি বিনিয়োগকারী হলে এখন কী দেখতেন? রাজনৈতিক পালাবদলের পরের সময়, নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন, গ্যাসের অনিশ্চয়তা, আর এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর আবেদন। সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটি এ নিয়ে ৭ অক্টোবর আলোচনা করবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ। এই অনিশ্চয়তার তালিকা থেকেই আমার ব্যাখ্যা: যে অর্থ আগে থেকে চালু কারখানায় ঢোকে, তার ঝুঁকি কম, তাই পুনর্বিনিয়োগ আর মূল কোম্পানির ঋণ বাড়ে। কিন্তু নতুন জমিতে নতুন কারখানা বানানো ফেরানো যায় না এমন সিদ্ধান্ত, সেটা অনেকে পিছিয়ে দেন। এটি তত্ত্বভিত্তিক ব্যাখ্যা, সরকারি উপাত্ত নয়, তবে সংখ্যাগুলো এর সঙ্গে মেলে।
চুলা জ্বলবে তো, এই প্রশ্নের উত্তর কার কাছে
কারখানা বসানোর আগে যেকোনো বিনিয়োগকারীর একটা মৌলিক প্রশ্ন থাকে: গ্যাস আর বিদ্যুৎ পাব তো? অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বাস্তব রূপটা এখন সেখানেই। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী আগস্টে গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমেছিল দিনে প্রায় ১ হাজার ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে, চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০। অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেকের সামান্য বেশি। দুটি এফএসআরইউ দিয়ে সাধারণত প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসে, তখন এসেছিল ৩০০-এর নিচে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ১০ আগস্ট রাত থেকে তাদের ৫৭টি কারখানাই বন্ধ। শিল্প প্রতিনিধিদের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন লিখেছে, হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের ১৭১টি কারখানা উৎপাদন থামিয়েছে। এএফপি সংকটের কারণ হিসেবে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র ও অনুসন্ধানে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি ব্যাহত হওয়ার কথা বলেছে। বিডার রোচি বলছেন, সংকটটা কাঠামোগত: প্রয়োজন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সংকটের আগেও জোগান ছিল প্রায় ৩ হাজার। তাঁর হিসাবে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালে চার থেকে পাঁচ বছর, বিকল্প এফএসআরইউতে অন্তত ১৮ মাস লাগে, আর তৃতীয় এফএসআরইউ আসবে ২০২৮ সালের শুরুতে। তাই নতুন বিনিয়োগকারীদের তিনি সরাসরি বলছেন, এখনই নয়, ১৮ থেকে ২৪ মাস পর পথ আছে, আর আগে গ্যাস পাবে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা। এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি প্রশংসনীয়, কিন্তু অপেক্ষার মূল্যের তত্ত্বে এর মানে দাঁড়ায়, নতুন বিনিয়োগকারীর অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। তবে ভারসাম্যের জন্য জেট্রোর মূল্যায়নটাও বলা দরকার। তাদের কর্মকর্তারা মনে করেন, গ্যাস ও লজিস্টিকসের সমস্যা থাকলেও প্রশাসনিক অদক্ষতা আর নীতির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে আরও বেশি ওজন রাখে। তাঁরা তুলনা টেনেছেন, বাংলাদেশে মন্ত্রণালয় ৪৭টি, জাপানে ১৩টি।
ভিয়েতনামের হিসাবে ব্যবধানটা কোথায়
এবার ভিয়েতনামের দিকে তাকান। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে নিবন্ধিত বিদেশি বিনিয়োগ ৩৮ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, আর বাস্তবে ছাড় হওয়া অর্থ ২৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। আমার গণনায় এটি নিবন্ধিতের প্রায় ৭২ শতাংশ, এবং গত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ। ছাড় হওয়া অর্থের ৮২ দশমিক ৮ শতাংশই গেছে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে, অর্থাৎ কারখানা আর উৎপাদনে। দুই দেশের সংজ্ঞা হুবহু এক নয়, কারণ বাংলাদেশের সংখ্যা নিট এফডিআই আর ভিয়েতনামের সংখ্যা ছাড় হওয়া মূলধন। তবু ব্যবধানের আকারটা বোঝা যায়: ভিয়েতনামের প্রকৃত ছাড় বাংলাদেশের মোট নিট এফডিআইয়ের প্রায় ১৫ থেকে ১৬ গুণ। আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২৬ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত পেয়েছে ৩৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন, বাংলাদেশ ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন। ভিয়েতনামের তথ্যের মূল শিক্ষা হলো, সেখানে নথিভুক্ত প্রতিশ্রুতির বড় অংশ শেষ পর্যন্ত মাঠে নামে এবং সেই রূপান্তরের হারটা মাপা যায়। বাংলাদেশে প্রস্তাব বনাম বাস্তব বিনিয়োগের নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য হিসাব আমি যেসব উৎস দেখেছি, তাতে পাইনি।
সংস্কারের ঘড়ি চলছে, কিন্তু মাপকাঠি কী হবে
সংস্কারের চেষ্টা শুরু হয়েছে, সেটা অস্বীকার করা ঠিক হবে না। জুলাইয়ে সংসদে পাস হওয়া ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ কার্যকর হয়েছে ২০ আগস্ট। বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ মিলে এখন একটি সংস্থা, যার সাংগঠনিক কাঠামো ধাপে ধাপে তৈরি হচ্ছে। বিডা বলছে, ২০২৫ সালের বিনিয়োগ সম্মেলনের পর প্রায় ২০ জন বিনিয়োগকারীর ১৫০ কোটি ডলারের একটি পাইপলাইন গড়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ মাসে ৪০ কোটি ডলার বাস্তবায়িত হয়েছে। আমার গণনায় এটি পাইপলাইনের প্রায় ২৭ শতাংশ। সংখ্যাটা ছোট, কিন্তু এই প্রথম আগ্রহ থেকে বিনিয়োগ পর্যন্ত যাত্রাটা মাপা হচ্ছে, আর আসল কাজটা সেখানেই। জেট্রোর পরামর্শও একই দিকে: নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজার আগে যাঁরা আছেন, তাঁদের সমস্যা মেটান। আমার সিদ্ধান্ত এই যে, বাংলাদেশের প্রশ্ন আর কতজন আগ্রহী তা নয়, প্রশ্ন হলো কতজন শেষ পর্যন্ত উৎপাদনে যান। তাই সাফল্য মাপতে সম্মেলন আর সমঝোতা স্মারকের সংখ্যার বদলে তিনটি জিনিস নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার: নিবন্ধন থেকে উৎপাদনে যেতে কত দিন লাগে, নতুন শেয়ারমূলধনের হার কত, আর প্রস্তাবের কত অংশ বাস্তব হয়। অপেক্ষার মূল্যের তত্ত্ব অনুযায়ী বিনিয়োগকারীকে টানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বাড়তি প্রণোদনা নয়, অনিশ্চয়তা কমানো: গ্যাসের সময়সূচি নিয়ে সৎ তথ্য, নীতির ধারাবাহিকতা আর দ্রুত সেবা। বিডার রোচির ভাষ্যে সিঙ্গাপুরের সাফল্যের পেছনেও কোনো জাদু নেই, আছে একঘেয়ে ধারাবাহিকতা। বিনিয়োগকারীর কাছে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পূর্বানুমানযোগ্যতা।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

